যেমন ছিল সোহেল চৌধুরী-দিতির সংসার জীবন !  

আপডেট : ০৯ মে ২০২৪, ০৬:৫৩ পিএম

নতুন মুখের সন্ধানে দিয়ে একইসঙ্গে চলচ্চিত্রে পা রাখেন সোহেল চৌধুরী ও পারভীন সুলতানা দিতি। প্রখ্যাত চিত্রপরিচালক এফ কবীর চৌধুরীর ‘পর্বত’ সিনেমাতে জুটি বেঁধে প্রথম অভিনয় করেন তারা। যদিও দিতির মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম সিনেমা ছিল আজমল হুদা মিঠু পরিচালিত ‘আমিই ওস্তাদ’। সিনেমাটি বেশ সাড়া ফেলে। দিতির অনবদ্য অভিনয় দর্শকদের বেশ নজর কাড়ে এবং দিতিকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

সুদর্শন সোহেল চৌধুরী মূলত রোমান্টিক নায়ক হিসেবে খ্যাতি পান। তার চুলের স্টাইল সে সময়ের তরুণদের মধ্যে কিছুটা জনপ্রিয়তাও পায়। আশির দশকের শেষে তার পোশাকের স্টাইল ও গ্ল্যামার সে সময়ের দর্শককে আকৃষ্ট করতো।

পরের বছর ১৯৮৫ সালে আমজাদ হোসেনের ‘হীরামতি’ সিনেমাতে ফের জুটি বাঁধেন তারা। দিতির বিয়ে পারিবারিকভাবে ঠিক হয়ে ছিল। এই ছবির কাজ শেষ করে ঢাকায় ফিরেই বিয়ের পিঁড়িতে বসার কথা। সেজন্য আর কোনো নতুন ছবির কাজ হাতে নিচ্ছিলেন না তিনি। শুধু বিখ্যাত পরিচালক আমজাদ হোসেনের অনুরোধ ফেলতে পারেননি বলে ‘হীরামতি’ ছবির কাজ করতে রাজি হন। জাফলং ও শ্রীমঙ্গলে চলছিল শুটিং।

শুটিং করতে গিয়েই সোহেল ও দিতি প্রেমে পড়লেন। দিতির বিয়ের তখন মাত্র দিন দশেক বাকি। এরই মধ্যে ঢাকায় ফিরে পালিয়ে সোহেল চৌধুরীর বনানীর বাড়িতে গেলেন তারা। কাজী ডেকে বিয়ে করলেন সোহেল-দিতি। বিয়ের পর তাদের বেশ সুখের সংসার ছিল। সে ঘরে আসে দুই সন্তান, মেয়ে লামিয়া চৌধুরী ও ছেলে শাফায়েত চৌধুরী।

‘হীরামতি’র পর সোহেল-দিতি জুটির পর পর কয়েকটি ছবি মুক্তি পায়। সোহেল-দিতি অভিনীত ‘চিরদিনের সাথী’ ছবিটিও মোটামুটি ব্যবসা সফল হয়| এ ছবির ‘তুমি আমার, আমি তোমার, চিরদিনের সাথী’ গানটি জনপ্রিয়তা পায়। 

সিনেমায় সাফল্য পেলেও তাদের সংসার জীবনে০ সেটা ঘটেনি। তাদের সুখের সংসার টেকেনি বেশিদিন। সুন্দরী, সুঅভিনেত্রী ও সংযত আচরণের অধিকারী দিতির ক্যারিয়ার তরতর করে এগিয়ে গেলেও সোহেল চৌধুরীর ক্যারিয়ার খুব একটা সফল হয়নি। তিনি সুদর্শন ছিলেন তবে তার অভিনয় ছিল মাঝারি মানের। তবে সবচেয়ে বড় কথা হলো সোহেল চৌধুরী ছিলেন খামখেয়ালী প্রকৃতির। কিছুটা রগচটা ও বদমেজাজিও ছিলেন। সঠিক সময়ে শুটিং ফ্লোরে প্রায়ই হাজির হতে পারতেন না, বিশেষ করে ভোরের শিফটে|

পরিচালকদের সঙ্গেও তিনি খুব সংযত আচরণ করতেন না বলে সে সময়ের সিনে পত্রিকাগুলোর সূত্রে জানা যায়। এমনকি তার ‘হীরামতি’ ছবির পরিচালক ও সুহৃদ আমজাদ হোসেনের সঙ্গেও তার সম্পর্কে ভাটা পড়ে বলে সে সময়ের জনপ্রিয় কয়েকটি সিনে পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়। আনন্দবিচিত্রাসহ কয়েকটি পত্রিকায় আমজাদ হোসেন ও সোহেল চৌধুরীর বাদানুবাদের বিস্তারিত খবর প্রকাশিত হয়। মূলত অসংযত আচরণের কারণেই তার ক্যারিয়ার সফল হয়নি। সোহেল চৌধুরী ৩০টিরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন। দিতির সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু করে এবং নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে তাদের বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর সোহেল চৌধুরী কয়েকটি ছবিতে পার্শ্ব-চরিত্রে অভিনয় করেন। কয়েকটি ছবিতে তিনি ছিলেন দ্বিতীয় নায়ক।

এর কয়েক বছর পর মাফিয়া আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সঙ্গে এক ক্লাবে বিতর্ক বাধে সোহেলের। বনানী জামে মসজিদের পাশে আবেদীন টাওয়ারের আট তলায় সুপার ট্রাম্পস ক্লাবে আসামাজিক কার্যকলাপ, নাচ গান, মদ্য পান ও নারী দিয়ে অশ্লীল নাচ হতো। সেখানে আসামাজিক কার্যকলাপকে ঘিরেই মূলত আজিজ মোহাম্মদের সঙ্গে সোহেল চৌধুরীর গোলমাল হয়।

সেই রাতে বনানীর ট্রাম্প ক্লাবে গান বন্ধ করতে বলেছিলেন সোহেল ও তার বন্ধুরা। গান বন্ধ করা নিয়ে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সঙ্গে সোহেলের কথা-কাটাকাটি হয়। সোহেল চৌধুরী একপর্যায়ে আজিজের ওপর ক্ষেপে যান। তখন সোহেলের বন্ধু কালা নাসির গুলি করতে যান আজিজ মোহাম্মদ ভাইকে। এ সময় ক্লাবের বাথরুমে ঢুকে আত্মরক্ষা করেন আজিজ মোহাম্মদ ভাই। এই ট্রাম্প ক্লাবের মালিকানা ছিল বান্টি ও আশীষের। বিরোধের শুরু এখান থেকেই। এ ছাড়া ট্রাম্প ক্লাবের বান্টি ইসলামের সঙ্গে সোহেলের দুই থেকে তিনবার ঝগড়া হয়। পরে তা মিটেও যায়।

তবে আশীষ রায় চৌধুরী ওরফে বোতলের সঙ্গে কথা-কাটাকাটি ও হাতাহাতি হয়। আশীষ চৌধুরীই সোহেল চৌধুরীকে ক্লাব থেকে বের করে দেন। ভবিষ্যতে সোহেলকে ক্লাবে না আসার জন্য হুমকিও দেন। সোহেল চৌধুরীর কারণে ট্রাম্পস ক্লাবের কর্মকাণ্ড ব্যাহত হয়। তারা তখন সোহেল চৌধুরীকে ভয়ভীতি দেখান। ঘটনার দিন অর্থাৎ ১৯৯৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর সোহেল চৌধুরী বনানীর সেই ট্রাম্পস ক্লাবে যেতে চান। তখন তাকে প্রবেশের অনুমতি না দিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

তিনি আবার রাত ৩টায় ট্রাম্পস ক্লাবের সামনে এলে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী আসামিরা পেশাদার খুনি দিয়ে গুলি করে সোহেল চৌধুরীকে হত্যা করান। সন্ত্রাসীরা তাকে দুটি গুলি করলে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

আর এ খুনের ঘটনা সারা দেশে বেশ আলোচনায় আসে। কিন্তু তার পূর্বেই দিতি-সোহেলের ঘর ভেঙেছিল। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত সন্তানদের নিয়ে গুলশানে বসবাস করছিলেন দিতি। তাদের মেয়ে কানাডা থেকে ফিল্ম মেকিং নিয়ে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে ফিরেছেন দেশে। ছেলে দেশের বাইরে পড়াশোনা করছেন। 

সোহেল চৌধুরী মারা যাওয়ার পর চলচ্চিত্র অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চনকে বিয়ে করেন। সে সংসারও টেকেনি। কাঞ্চনের সাথেও তার বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। এই জুটির অভিনয় দারুণ প্রশংসিত হলেও বাস্তবজীবনে তারা প্রাণবন্ত হতে পারেননি। দিতি ২৮ বছরে প্রায় দুইশটির মতো ছবিতে অভিনয় করেছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত