দেশের সবকটি বিমানবন্দর ও সীমান্ত এলাকা দিয়ে প্রবেশ করছে চোরাচালান পণ্য। উন্নতমানের যন্ত্রপাতি না থাকায় এসব অবৈধ পণ্য শনাক্ত করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে। বিশেষ করে সীমান্ত এলাকায় বেপরোয়া আকার ধারণ করেছে ওরা। সরকারের কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে চোরাচালান ও চোরাকারবারিদের সক্রিয়তার চিত্র। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বিমানবন্দর ও সীমান্ত এলাকায় উন্নতমানের যন্ত্রপাতি বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ইতিমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি), বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। জানা গেছে, এইসব যন্ত্রপাতি কিনতে অন্তত ৭০০ কোটি টাকার মতো খরচ হবে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, যন্ত্রপাতিগুলো স্থাপন করা হলে মাদকসহ অবৈধ পণ্যগুলো সহজেই শনাক্ত করা যাবে। বিমানবন্দর বা সীমান্তে আসামাত্রই এক ধরনের সংকেত দেবে যন্ত্রগুলো। কলম্বিয়া, মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা চোরাকারবারি রোধে এসব যন্ত্র ব্যবহার করে। আগামী এক বছরের মধ্যে যন্ত্রগুলো বসানো হবে বলে আশা করছি। এই জন্য প্রায় ৭০০ কোটি টাকার মতো খরচ হতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, বিমানবন্দরগুলোতে বিশেষ নজরদারি না থাকায় দিনের পর দিন এসব অপকর্ম হয়ে আসছে। তাছাড়া বাংলাদেশ-ভারত ও বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের অন্তত অর্ধশত পয়েন্ট দিয়ে দেশে অবৈধ অস্ত্রসহ নানা চোরাচালানি পণ্য আসছে। বিশেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের রহনপুর, একই এলাকার সোনা মসজিদ, আজমতপুর, বিলভাতিয়া, ঝিনাইদহের মহেশপুরের জুলুলী, সাতক্ষীরার কলারোয়ার তলুইগাছা, যশোরের বেনাপোল, চৌগাছা, রাজশাহীর গোদাগাড়ী, চুয়াডাঙ্গার দর্শনা, সাতক্ষীরার শাকারা, মেহেরপুর, কুমিল্লার বিবিরবাজার, ফেনীর বিলোনিয়া, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া এবং কুষ্টিয়ার সীমান্ত এলাকায় বেপরোয়া হয়ে উঠছে চোরাকারবারিরা। এসব সীমান্তে তল্লাশির যন্ত্রপাতি নেই বললেই চলে। তাছাড়া চোরাকারবারিদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে সুনামগঞ্জের মধ্যনগর সীমান্ত এলাকা। রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে চোরাকারবারিরা সীমান্তের কাঁটাতার অতিক্রম করে ভারত থেকে বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য ও আগ্নেয়াস্ত্রের চালান নিয়ে আসছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তথ্য পেয়েছে। এসব স্থানে যন্ত্রপাতি না থাকায় সহজেই চোরাচালান দ্রব্য বাংলাদেশে চলে আসছে। এমনকি দায়িত্বরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চোরাকারবারিদের কাছ থেকে ‘উপরি’ আদায় করছেন বলে অভিযোগ আছে।
ভারতের সীমান্তবর্তী উত্তর বংশীকুন্ডা ইউনিয়নের আন্তরপুর, মহেষখলা, কাইটাকোনা, কড়ইবাড়ী, গুলগাঁও, রূপনগর ও কান্দাপাড়া, বংশীকু-া দক্ষিণ ইউনিয়নের দাতিয়াপাড়া এলকার কয়েকটি সংঘবদ্ধ পাচারকারী চক্র প্রকাশ্যে এসব কারবার চালাচ্ছে। তাছাড়া মহেষখলা, কাইটাকোনা, কড়ইবাড়ী, আমতলা, ঘিলাগড়া, বাঙ্গালভিটা সীমান্ত এলাকা দিয়ে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার এসব অবৈধ পণ্য ঢুকছে বাংলাদেশে। পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ‘উপরি’ নেওয়ার পেছনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্য ও গণমাধ্যমের কিছু লোক আছে। আর এসবের কারণে যন্ত্রপাতি বসানোর অনুরোধ করা হয়েছে।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, চোরাচালান রোধ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে। বিমানবন্দর ও সীমান্ত এলাকায় কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। অবৈধ পণ্য শনাক্ত করতে উন্নতমানের আরও যন্ত্রপাতি বসানো হবে। তাছাড়া চোরাকারবারিরা ধরা পড়বে।
পুলিশ সূত্র জানায়, সম্প্রতি সরকারের কয়েকটি সংস্থা চোরাচালানের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ জানিয়েছে। বিমানবন্দর ও সীমান্ত এলাকায় শনাক্ত করার যন্ত্রপাতি নেই। এই জন্য দ্রুত সময়ে এসব স্থানে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি না বসালে চোরাকারবারিরা পার পেয়ে যাবে। এসব তথ্য পেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। ইতিমধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটিতে পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, বেবিচক ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের রাখা হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনের আলোকে হযরত শাহজালাল, শাহ আমানত ও ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, রাজশাহী, কক্সবাজার, সৈয়দপুর, যশোর ও বরিশাল বিমানবন্দর ও দেশের সবকটি সীমান্ত এলাকায় বসানো হচ্ছে বিস্ফোরক শনাক্তকরণ যন্ত্র। যাত্রীদের লাগেজ ও যানবাহন তল্লাশি এবং তরল বিস্ফোরক শনাক্ত করতে আলাদা আলাদা যন্ত্র বসানো হচ্ছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ করছে। এসব যন্ত্র বসাতে কত টাকা খরচ হবে তা নিয়েও চলছে হিসাব-নিকাশ।
যেসব যন্ত্র বসানো হবে সেগুলোর নাম প্রায় চূড়ান্ত করা হয়েছে। উড়োজাহাজের হোল্ডে রাখার মতো ভারী ব্যাগ তল্লাশির জন্য ডুয়েল ভিউ এক্স-রে স্ক্যানিং মেশিন, হ্যান্ডব্যাগ তল্লাশির জন্য ডুয়েল ভিউ স্ক্যানিং মেশিন, লিকুইড এক্সপ্লোসিভ ডিটেকশন সিস্টেম (এলইডিএস), আন্ডার ভিইকল স্ক্যানিং সিস্টেম (ইউভিএসএস), ফ্যাপ ব্যারিয়ার গেট উইথ কার্ড রিডার, ব্যারিয়ার গেট উইথ আরএফআইডি কার্ড রিডার, এক্সপ্লোসিভ ডিটেকশন সিস্টেম (ইডিএস) এবং এক্সপ্লোসিভ ট্রেস ডিটেকশন (ইটিডি) যন্ত্র থাকবে। তার মধ্যে ডুয়েল ভিউ এক্স-রে স্ক্যানিং মেশিন ব্যাগের ওপর ও দুই পাশ সব দিক দিয়েই স্ক্যান করতে সক্ষম হবে। এক্সপ্লোসিভ ডিটেকশন সিস্টেম দিয়ে ব্যাগ না খুলেই তল্লাশি করতে পারবেন কর্মকর্তারা। আবার কেউ যদি শরীরে কোনো অবৈধ কিছু রাখেন তাও ধরা যাবে সহজেই। এসব যন্ত্রপাতি আমেরিকা বা লন্ডন থেকে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বেবিচকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাংলাদেশ থেকে সরাসরি ইয়াবা পাচারের সময় বিমানবন্দরে একাধিকবার ধরা পড়ে পাচারকারী চক্রের সদস্যরা। একইসঙ্গে বাংলাদেশ থেকে পার হয়ে গেলে বিদেশেও ধরা পড়ে। আর এই কারণে সরাসরি ইয়াবা পাচার না করে এখন ইয়াবা তৈরির কাঁচামাল পাচারের কৌশল নিচ্ছে পাচারকারী চক্র। ‘মেটাফিটামিন, অ্যামফিটামিন ও সিউডোফিড্রিন ইয়াবা তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার হয়। এই রাসায়নিক সাদা পাউডার অতিরিক্ত মাত্রায় উত্তেজক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এসব উপাদান ব্যবহার করে সহজেই ইয়াবা তৈরি করা যায়। এক কেজি সিউডোফিড্রিন দিয়ে দুই লাখ পিস ইয়াবা তৈরি করা যায়। কাঁচামাল থাকলে ঘরে বসেই ইয়াবা তৈরি করা যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, উন্নতমানের যন্ত্রপাতি না থাকায় এসব উপকরণ শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। আগামী ছয় মাসের মধ্যে বিমানবন্দর ও সীমান্ত এলাকায় নতুন যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হবে বলে আশা করছি।
