শুক্রবার, ৩১ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

রাবিতে মধ্যরাতে ছাত্রলীগের দুপক্ষের সংঘর্ষ, ভাঙচুর

আপডেট : ১৩ মে ২০২৪, ০৪:৩৯ এএম

গেস্টরুমে বসাকে কেন্দ্র করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) শাখা ছাত্রলীগের দুপক্ষের মধ্যে গত শনিবার গভীর রাতে সংঘর্ষ, দফায় দফায় ধাওয়া-ধাওয়ি ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। রাত সাড়ে ১১টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত এ সংঘর্ষ হয়। এ সময় দফায় দফায় রামদা ও লাঠিসোঁটা হাতে একপক্ষ অন্যপক্ষকে ধাওয়া দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং মাদার বখ্শ হলের মধ্যবর্তী স্থানে দুই পক্ষ অবস্থান নিয়ে পাল্টাপাল্টি এ হামলা চালায়।

এদিকে রাবি ছাত্রলীগের নতুন কমিটি গঠনের কয়েক মাস না যেতেই এমন ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংগঠনটির সাবেক নেতারা। তাদের অভিযোগ, এ ধরনের সংঘাত ঠেকাতে সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বকে দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে হয়। কিন্তু রাবি ছাত্রলীগের বর্তমান সভাপতি-সম্পাদক তাতে ব্যর্থ হচ্ছেন। উল্টো তারা নিজেরাই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছেন।

শনিবার রাতে রাবি ছাত্রলীগ সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বাবু এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হল শাখার সভাপতি নিয়াজ মোর্শেদের অনুসারীরা সংঘর্ষে জড়ায়। অবশ্য সংঘর্ষ চলাকালে রাবি ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক আসাদুল্লা-হিল-গালিবের অনুসারীদেরও সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বাবুর হয়ে হামলা চালাতে দেখা গেছে।

ছাত্রলীগের একাধিক নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শনিবার রাত ১০টার দিকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলের গেস্টরুমে নিয়াজের কয়েকজন কর্মী বসে ছিলেন। এ সময় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হল ছাত্রলীগের সহসভাপতি আতিকুর রহমান ওরফে আতিক কয়েকজন কর্মীকে নিয়ে গেস্টরুমে আসেন। আতিক রাবি ছাত্রলীগ সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বাবুর অনুসারী। আতিক নিয়াজের অনুসারীদের কিছুক্ষণের জন্য সেখান থেকে চলে যেতে বলেন। কিন্তু নিয়াজের অনুসারীরা এতে অস্বীকৃতি জানান। পরে আতিক নিয়াজের মোবাইল ফোনে কল করে তার অনুসারীদের সেখান থেকে যেতে বলেন। কিন্তু নিয়াজ তার অনুসারীরা সেখানেই থাকবে বলে আতিককে জানান। পরক্ষণেই নিয়াজ সেখানে উপস্থিত হন। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা ও উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে আতিক তার অনুসারীদের নিয়ে সেখান থেকে চলে যান।

এ খবর জানাজানি হলে মোস্তাফিজুর রহমান বাবুর অনুসারীরা বিভিন্ন হল থেকে মিছিল নিয়ে সোহরাওয়ার্দী হলের ফটকে অবস্থান নেন। তাদের সঙ্গে আসাদুল্লা-হিল-গালিবের অনুসারীরাও যোগ দেন। সেখানে স্লোগানে স্লোগানে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। একপর্যায়ে নিয়াজ ও তার অনুসারীরা হলের ছাদ থেকে সভাপতির অনুসারীদের ওপর ইটপাটকেল, লাঠিসোঁটা নিক্ষেপ করে হল গেট দখলে নিয়ে তালা দেন। কিছুক্ষণ পর মোস্তাফিজুর রহমান বাবু ও গালিবের অনুসারীরাও পাল্টা আক্রমণ চালায়। এ সময় ছয়টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। তাদের হাতে রামদা ও লাঠিসোঁটাও দেখা গেছে। দফায় দফায় এ সংঘর্ষ চলতে থাকে।

খবর পেয়ে রাত ১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আসাবুল হক, ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম সাউদসহ হল প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। কিছুক্ষণ পর ঘটনাস্থল পর্যবেক্ষণে আসেন সহ-উপাচার্য অধ্যাপক সুলতান-উল-ইসলাম ও অধ্যাপক হুমায়ুন কবীর এবং রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) তারিকুল হাসান। এর মধ্যেও রাত আড়াইটা পর্যন্ত থেমে থেমে দুপক্ষের মধ্যে ধাওয়া চলে। পরে বিশ্ববিদ্যালয় ও হল প্রশাসনের সঙ্গে পুলিশ সদস্যরা সোহরাওয়ার্দী হলের সন্দেহভাজন কক্ষগুলোতে তল্লাশি চালালে রাত পৌনে ৩টার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নতুন কমিটির পর প্রত্যেক হলের সভাপতি-সম্পাদক থাকা সত্ত্বেও নতুন করে ‘দায়িত্বপ্রাপ্ত’ নেতা নির্ধারণ করে দেন রাবি ছাত্রলীগ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক। তবে, এই দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের মেনে নিতে পারেননি হলের বর্তমান সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক, যা নিয়ে হলের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে ‘মৌনযুদ্ধ’ চলছিল রাবি ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতাদের। এরই ফলে তুচ্ছ বাগ্বিতণ্ডা থেকে সংঘর্ষের মতো ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করছেন ছাত্রলীগের বর্তমান ও সাবেক নেতাকর্মীরা।

রাবি ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘যতটুকু শুনলাম ঘটনার সূত্রপাত হলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাকে নিয়ে। একটি হলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক থাকা অবস্থায় কীভাবে ওই হলে নতুন করে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা দেওয়া হয়? এই দায়িত্বপ্রাপ্ত বিষয়টি ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্রে নেই। আমার মনে হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সাংগঠনিক যোগ্যতা আরও বাড়াতে হবে। তারা দূরদর্শিতার পরিচয় রাখতে পারেনি।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রাবি ছাত্রলীগ সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বাবু বলেন, ‘হলের গেস্টরুমে আমার অনুসারীরা সাংগঠনিক কাজ করছিল। তখন ওই হলের সভাপতি নিয়াজ মোর্শেদ এসে আমার অনুসারীদের বের হয়ে যেতে বলে। কিন্তু আমার অনুসারীরা দুই মিনিট সময় চাইলে এ নিয়ে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে নিয়াজ হলে বহিরাগতদের প্রবেশ করিয়ে আমার অনুসারীদের ওপর রেললাইনের পাথর, ইট ও ককটেল নিক্ষেপ করে।’

অন্যপক্ষের নেতা রবি ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সোহরাওয়ার্দী হলের সভাপতি নিয়াজ মোর্শেদ বলেন, ‘গেস্টরুমে বসা নিয়ে প্রথমে একটু বাগ্বিতণ্ডা হয়েছিল। একপর্যায়ে সভাপতির অনুসারীর কয়েকজন এসে গালাগাল করতে থাকে। বিষয়টি অনেক তুচ্ছ ছিল। এই ঘটনা কখনোই এত দূর আসত না। কিন্তু তারা বাড়াবাড়ি করে এত দূর নিয়ে এসেছে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আসাবুল হক বলেন, হল ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাহায্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। বিষয়টি মীমাংসা করার চেষ্টা করা হবে। রামদা নিয়ে মহড়া ও ককটেল বিস্ফোরণের বিষয়টি প্রশাসন খতিয়ে দেখবে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত