মঙ্গলবার, ২৮ মে ২০২৪, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ফের ৬৫০ সুপারনিউমারারি পদের জন্য পুলিশের চিঠি

আপডেট : ১৪ মে ২০২৪, ০৬:৪৯ এএম

নতুন করে পুলিশে সংখ্যাতিরিক্ত (সুপারনিউমারারি) পদ সৃষ্টি করতে আবারও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। ৬৫০ পদে পদোন্নতি দিতে গত ২৮ এপ্রিল এই চিঠি দেওয়া হয়েছে। পদ সৃজনের জন্য ৩৫০ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ৩০০টি এএসপি পদে পদোন্নতি দিতে বলা হয়েছে। এর আগে সুপারনিউমারারি হিসেবে অতিরিক্ত আইজিপি, ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি ও পুলিশ সুপার হিসেবে ৩৬০ পদ চূড়ান্ত করা হলেও ৩০০টি পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। ৭২ অতিরিক্ত ডিআইজিকে ডিআইজি পদে পদোন্নতি দেওয়ার কথা থাকলেও রহস্যজনক কারণে তা দেওয়া হচ্ছে না। এ নিয়ে পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ আর হতাশা। পাশাপাশি নন-ক্যাডার পুলিশ সদস্যদেরও পদোন্নতি না দেওয়ায় ক্ষোভের পরিমাণ বেড়েই চলছে। এ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র সচিব ও আইজিপির সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেছে বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বিশেষ চিঠিও দিয়েছে সংগঠনটি। 

সুপারনিউমারারিতে পদোন্নতি হওয়ার পর র‌্যাঙ্ক ব্যাচ পেলে ভালো কোনো জায়গায় যেতে পারছেন না। একই পদে তারা বহাল থাকছেন। এসব কারণে অনেকের মধ্যে চাপা উত্তেজনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। একই ক্ষোভ রয়েছে পিএলে (প্রমোশন লিস্ট) থাকা ২ হাজার পদোন্নতিবঞ্চিত সাব ইন্সপেক্টর থেকে ইন্সপেক্টরের।

পুলিশ সূত্র জানায়, আগের সুপারনিউমারারির পদ নিয়ে প্রশাসন ক্যাডারে নানা নাটক হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় পদের সংখ্যা কমিয়ে প্রস্তাবনা পাঠায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ ছিল পুলিশ সদর দপ্তর। পরে পদ বাড়াতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানোর পর পদের সংখ্যা বাড়িয়ে তালিকা চূড়ান্ত করে। কিন্তু এমন সময় তালিকা সংযুক্ত ফাইলটি সরকারের হাইকমান্ডের কাছে পাঠানো হয়েছিল, যখন জাতীয় নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসে।

তফসিল ঘোষণা হওয়ায় পদোন্নতির ফাইল চূড়ান্ত হয়নি। নির্বাচনের কয়েক মাস পর সুপারনিউমারারির পদে ৩০০ জনকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। তবে ৭২ জনকে ডিআইজি পদে পদোন্নতি দেওয়ার কথা থাকলেও তা এখনো করা হয়নি। এ নিয়ে অতিরিক্ত ডিআইজিদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে প্রশাসন ক্যাডাররা সাতশোর মতো পদ বাড়িয়ে নিলেও পুলিশের পদ না বাড়ায় ক্ষুব্ধ পুলিশ সদর দপ্তর। গত ২৮ এপ্রিল পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ৬৫০টি সুপারনিউমারারি পদ সৃজন করতে একটি চিঠি পাঠায়। চিঠিতে স্বাক্ষর করেন অতিরিক্ত ডিআইজি (ওঅ্যান্ডএম) ফারুক আহমেদ।

সূত্র জানায়, চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত ৬৫০ জনের পদোন্নতির জন্য সরকারের বার্ষিক অতিরিক্ত খরচ দেখানো হয়েছে ২ কোটি ৭১ লাখ ৮৭ হাজার ৮৭৭ টাকা। ১ হাজার ৬৫৪টি পিএএলভুক্ত পরিদর্শকের (নিরস্ত্র-সশস্ত্র) ও (শহর ও যানবাহন) চাকরির মেয়াদ প্রায় শেষ পর্যায়ে হওয়ায় তাদের মধ্যে ৩০০টি সুপারনিউমারারি পদ সৃজনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। তাদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে ষষ্ঠ গ্রেডে থাকার কথা থাকলেও তারা ৯ম গ্রেডেই বেতন-ভাতা পাবেন। ২০১২ সালে ইন্সপেক্টর পদকে দ্বিতীয় থেকে প্রথম শ্রেণির নন-ক্যাডার পদে উন্নতীকরণ সরকারি আদেশ জারি করা হয়েছিল। তারা নবম গ্রেডভুক্ত। তা ছাড়া এএসপি পদটিও নবম গ্রেডভুক্ত। সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টি হলে সরকারের অতিরিক্ত অর্থ খরচ হবে না। চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, পুলিশে মজুরিকৃত ক্যাডার পদের সংখ্যা ৩ হাজার ১৪৬টি। এর মধ্যে আইজিপি এক, অতিরিক্ত আইজিপি (গ্রেড-১) ২টি, অতিরিক্ত আইজিপি (গ্রেড-২) ২০টি,  ডিআইজি (গ্রেড-৩) ৮৭টি, অতিরিক্ত ডিআইজি (গ্রেড-৪) ২০১টি, এসপি (গ্রেড-৫) ৫৯৬টি, অতিরিক্ত এসপি (গ্রেড-৬) ১ হাজার ৮টি ও এএসপি (গ্রেড-৯) ১ হাজার ২৩১টি রয়েছে। ৩৮৩ জনের পদোন্নতি ও পিএলজনিত কারণে শূন্য পদের বিপরীতে পদোন্নতি প্রদান করা হলে ৩৫তম বিসিএস পুলিশ কর্মকর্তাদের পদোন্নতি সম্পন্ন হবে ২০২৭ সালে এবং ৩৭তম কর্মকর্তাদের সময় লাগবে ২০৩০ সালে। এই সমস্যা থেকে উত্তরণে ঊর্ধ্বতন ধাপে প্রয়োজনীয় সংখ্যক না হওয়া পর্যন্ত সুপারনিউমারারি হিসেবে ৩৫০টি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গ্রেড-৬ পদে সৃজন করা প্রয়োজন। একইভাবে পরিদর্শক থেকে এএসপি পদে ভবিষ্যতে শুধু অবসর বা মৃত্যুজনিত শূন্যপদের বিপরীতে পদোন্নতি প্রদান করা হলে বহুসংখ্যক ইন্সপেক্টর পদোন্নতি বঞ্চিত হবে এবং পদোন্নতি প্রায় স্থবির হয়ে পড়বে। তাদের মধ্যে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৯ সালে চাকরিতে যোগদান করেছেন অনেকে। তাদের চাকরির বয়স হয়েছে ২৫ থেকে ৩৩ বছর পর্যন্ত। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে অধিকাংশ পরিদর্শক অবসরে চলে যাবেন। ২০২৮ সাল পর্যন্ত এএসপি পদে যে কয়টি শূন্য পদ সৃষ্টি হওয়ার কথা সে তুলনায় অপেক্ষমাণ কর্মকর্তা তুলনামূলক খুব কম। চিঠিতে আরও বলা হয়, এএসপি থেকে অতিরিক্ত এসপি পদে ভবিষ্যতে শুধু অবসর বা মৃত্যুজনিত প্রকৃত শূন্য পদের বিপরীতে পদোন্নতি দিলে বহুসংখ্যক এএসপি পদোন্নতিবঞ্চিত হবেন এবং পদোন্নতি এক প্রকার স্থবির হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর মধ্যে ৩৫তম বিসিএস (২০১৭) পদোন্নতি প্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন মোট ক্রমাযোজিত ১১৪ জন। তাদের সাত বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো পদোন্নতি হয়নি। ৩৬তম ব্যাচের (২০১৮) রয়েছেন ১১৩ জন। ছয় বছর পূর্ণ হলেও পদোন্নতি হয়নি। ৩৭তম ব্যাচের (২০১৯) রয়েছে ৯৭ জন।

নাম প্রকাশ না করে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রশাসনসহ অন্য ক্যাডারগুলোর প্রায় সবাই পদোন্নতি পেয়েছেন। অথচ পুলিশের বড় একটি অংশেরই পদোন্নতি হয়নি। নন-ক্যাডাররা দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। সবার মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে সুপারনিউমারারি পদোন্নতিতে অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক, ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি ও পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতির জন্য ৫২৯টি সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টি করতে আবেদন করা হয়েছিল। এর মধ্যে অতিরিক্ত আইজিপি (গ্রেড-১) ১৫টি, অতিরিক্ত আইজিপি (গ্রেড-২) ৩৪টি, ডিআইজি ১৪০টি, অতিরিক্ত ডিআইজি ১৫০টি ও পুলিশ সুপার ১৯০টি পদ চেয়েছিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জনপ্রশাসনে আবেদনের পর গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর ৩৪২টি পদ দিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় অতিরিক্ত আইজিপি পদে ২, ডিআইজি পদে ৫০, অতিরিক্ত ডিআইজি পদে ১৪০ ও পুলিশ সুপার পদে ১৫০ জনকে পদোন্নতি দিতে বলা হয়। পুলিশ সদর দপ্তরের তালিকা কাটছাঁট করায় পুলিশে দেখা দেয় অসন্তোষ। পরে ওই বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পদের সংখ্যা আরও বাড়াতে আরেকটি চিঠি পাঠানো হয়। ২৩ অক্টোবর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় অতিরিক্ত আইজপি পদে ৮ ও ডিআইজি হিসেবে ১৫টি পদ বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায়।  তফসিল ঘোষণার দুদিন আগে মন্ত্রণালয় অতিরিক্ত আইজিপি হিসেবে শূন্য পদে ২ জনসহ ১২ জন অতিরিক্ত আইজপি ও ডিআইজি হিসেবে শূন্য পদে ১২ জনসহ ৭২ জনের তালিকা চূড়ান্ত করে। তিনি আরও বলেন, নতুন করে সুপারনিউমারারিতে নন-ক্যাডাররা পদোন্নতি পাবেন। সাব ইন্সপেক্টর থেকে ইন্সপেক্টর ও ইন্সপেক্টর থেকে এএসপি পদে পদোন্নতি দেওয়া হবে দ্রুত সময়ে। মন্ত্রণালয় ইতিবাচক হিসেবে বিষয়টি নিয়েছে। 

বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারে কাছে একাধিকবার আমরা দাবি করেছি। দাবিগুলো ছিল পুলিশ পরিদর্শকদের ১০ বছর পূর্তিতে ষষ্ঠ গ্রেডপ্রাপ্ত। ১০ বছর পূর্তিতে ব্যাজ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রেড পরিবর্তন করা। ১০ বছরের মধ্যে পদোন্নতি না হলে সুপারনিউমারারি পদে পদোন্নতি দেওয়া। সাব-ইন্সপেক্টরদের (এসআই) ক্ষেত্রেও একই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে এসআই/ সার্জেন্ট পদটি দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও তাদের র‌্যাংক ব্যাজের নীল বা লাল ফিতা তুলে নেওয়া। এ ছাড়া এসআই এবং ইন্সপেক্টর র‌্যাংক ব্যাজ উন্নীত করার বিষয়টি পুলিশ সদর দপ্তরের ইচ্ছাকৃতভাবে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সময় বেঁধে দিয়ে বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তি করা। কনস্টেবলদের বিভাগীয় পরীক্ষায় একবার পাস করলে সেখান থেকে প্রমোশন লিস্ট (পিএল) করে ক্রমান্বয়ে পদোন্নতি দেওয়া। সুপারনিউমারারি পদে পদোন্নতি হলেও এখনো অনেক কর্মকর্তার পদায়ন হয়নি। আমরা আশাবাদী-শিগগিরই সমস্যার সমাধান হবে।

একাধিক পিএলে থাকা এসআই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ক্যাডারদের সহজেই পদোন্নতি-পদায়ন করা হচ্ছে। অথচ একই পদে থেকে নন-ক্যাডাররা মাঠপর্যায়ে কাজ করলেও তাদের পদোন্নতি হয় না ১০-১২ বছর ধরে। এসআই পদে ১০ম গ্রেড থেকে পরিদর্শক পদে ৯ম গ্রেড আনা হলে তাদের বেতন থেকে ঝুঁকিভাতা কেটে যাবে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার টাকা। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ইন্সপেক্টর থেকে এএসপি পদে পদোন্নতি হলে ষষ্ঠ গ্রেডে উত্তীর্ণ হবে। প্রতিটি স্থানে নন-ক্যাডারদের জটিলতার সৃষ্টি করা হচ্ছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত