মঙ্গলবার, ২৮ মে ২০২৪, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

খুশির কান্নায় নাবিকদের বরণ করলেন স্বজনরা

আপডেট : ১৫ মে ২০২৪, ০৬:২৬ এএম

অয়েলার আইনুল হোসেনের মা লুৎফে আরা বেগম ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। এ কান্না যে বড় আনন্দের, ছেলেকে ফিরে পাওয়ার কান্না। খুশির এ দিনটি উদযাপন করতে বাসায় ছেলের পছন্দের বিরিয়ানি রান্না করে রেখে এসেছেন। ছেলে মায়ের হাতের বিরিয়ানি খুব পছন্দ করেন।

লুৎফে আরা বেগমের মতো কারও মা, কারও স্ত্রী, কারও বড় ভাই বা শ্বশুর-শাশুড়ি এসেছেন আপনজনদের বরণ করে নিতে। ৩১ দিন সোমালিয়ান জলদস্যুদের হাতে বন্দি থাকা এমভি আবদুল্লাহ জাহাজের নাবিকরা মুক্ত হয়ে দেশে ফিরেছেন গতকাল মঙ্গলবার। মুক্তি পাওয়ার পর দুবাই হয়ে দেশে ফিরতে আরও ৩০ দিন লেগেছে তাদের।

নাবিকরা লাইটার জাহাজ জাহান মণিতে করে চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে নামার পর এক অভূতপূর্ব দৃশ্য তৈরি হয়। জাহাজ থেকে নামার পরপরই তারা আপনজনদের সান্নিধ্যে চলে যান।

নাবিক আসিফ উর রহমানকে বরণ করতে তার ভাগনি এসেছেন। হাতে তার জাতীয় পতাকা। এ সময় আসিফ উর রহমানের মা নাসরিন আকতার বলেন, ‘আমার ছেলেকে ফিরে পেয়ে অনেক আনন্দ লাগছে। এত দিন খুব কষ্টে দিন যাপন করেছি। আল্লাহর কাছে অশেষ শুকরিয়া।’

স্টুয়ার্ড মোহাম্মদ নুরুদ্দিন আহমেদ নিজের ছোট্ট মেয়েকে বুকে নিয়ে কেঁদে দেন। মেয়ের কপালে চুম্বন এঁকে দেন। অশ্রুসিক্ত নুরুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আল্লাহর কাছে অশেষ শুকরিয়া এবং সরকারের প্রতিও কৃতজ্ঞ যে আমাদের মুক্ত করে আনতে সর্বাত্মক চেষ্টা করা হয়েছে।’

বরিশালের বাসিন্দা ও এমভি আবদুল্লাহ জাহাজে অয়েলার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা নাবিক আলী হোসেনকে বরণ করতে শ্বশুর-শাশুড়ি এসেছেন। তিনি বলেন, ‘আমার মা অসুস্থ, তাই তিনি আসতে পারেননি। আমরা আজই (মঙ্গলবার) বরিশালের উদ্দেশে যাত্রা করব।’

জিম্মিকালীন অবস্থার বর্ণনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সোমালিয়ান দস্যুরা খুবই হিংস্র। তাই বেঁচে আসতে পারব কি না, তা নিয়ে আমাদের সংশয় ছিল।’

দস্যুরা সবার আগে অস্ত্র ঠেকিয়েছিল সেকেন্ড অফিসার মোজাহিদুল ইসলামকে। গতকাল জাহাজের ক্যাপ্টেন আবদুর রশিদ বলেন, ‘তখন মোজাহিদুল খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। চারজন দস্যু এসে তাকে অস্ত্র ঠেকিয়েছিল। আর সব অস্ত্রই ছিল একে-৪৭। তারপর আমি গিয়ে সারেন্ডার করি এবং বাকিদের সেফহোম থেকে বের হয়ে আসতে বলি।’

অস্ত্র ধরার সময় কেমন মনে হয়েছিল জানতে চাইলে মোজাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘এটা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। খুব ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। আমি আর ওই দিনটা স্মরণ করতে চাই না। সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই। এখন মুক্তির আনন্দের কথা বলব।’

নাবিকদের জন্য সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছিল চট্টগাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে। তাই তাদের বরণ করতে হাজির হয়েছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ সোহায়েল ও জাহাজের মালিক প্রতিষ্ঠান কেএসআরএম গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক সারোয়ার জাহান রাহাতসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া ভার্চুয়ালি যুক্ত হন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ।

হাছান মাহমুদ বলেন, ‘আগামীতে যাতে জাহাজগুলো ঝুঁকিপূর্ণ রুট দিয়ে যেতে আর্মস গার্ড নিয়ে যাতায়াত করে, সে বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। একই সঙ্গে জাহাজে জোরপূর্বক উদ্ধার অভিযানের অনুমতি দিলে আজকে স্বজনদের কাছে ফিরে আসতে পারা ২৩ নাবিকের সবাই আসতে পারত কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকত। আমরা শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য কাজ করেছি এবং সফল হয়েছি।’

একই মন্তব্য করেন জাহাজের ক্যাপ্টেন আবদুর রশিদ। তিনি বলেন, ‘আমি বারবার নিষেধ করেছিলাম জোরপূর্বক উদ্ধার অভিযান যেন চালানো না হয়। এতে ফলাফল ভালো আসত না। আমার সঙ্গে আমার জাহাজ মালিক কোম্পানিও সহমত প্রকাশ করে সরকারের সহযোগিতায় ব্যবস্থা নিয়েছে।’

গত ১২ মার্চ দুপুর দেড়টার দিকে সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিসু থেকে প্রায় ৬০০ নটিক্যাল মাইল দূরে ভারত মহাসাগরে সোমালিয়ান জলদস্যুদের কবলে পড়ে এমভি আবদুল্লাহ জাহাজ। মোজাম্বিক থেকে ৫৫ হাজার টন কয়লা নিয়ে জাহাজটি দুবাই যাচ্ছিল। অনেক নাটকীয়তা, অনিশ্চয়তার পর ১৩ এপ্রিল ভোররাত ৩টায় সোমালিয়ান দস্যুদের কবল থেকে মুক্তি পান এমভি আবদুল্লাহ ও জাহাজের ২৩ নাবিক।

দস্যুদের ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মুক্তিপণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এর আগে একই মালিক গ্রুপের এমভি জাহান মণিকে ২০১০ সালে জিম্মি করেছিল একই গ্রুপের জলদস্যুরা। সেবারও মুক্তিপণ দিয়ে তাদের উদ্ধার করা হয়।

মুক্তি পাওয়ার পর এমভি আবদুল্লাহ ২৭ এপ্রিল দুবাই পৌঁছে ৫৫ হাজার টন কয়লা খালাস করে ২৮ এপ্রিল চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা দেয়। ১৩ মে সোমবার সন্ধ্যা ৬টায় জাহাজটি কুতুবদিয়ায় নোঙর করে। সোমবার রাত ১২টার দিকে ২৩ নাবিক লাইটার জাহাজ এমভি জাহান মণিতে উঠে আসেন এবং সেই জাহাজে করে গতকাল বিকেল ৪টায় চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের জেটিতে পৌঁছে।

বীমার টাকায় এমভি আবদুল্লাহ নাবিক উদ্ধার : সোমালিয়ান জলদস্যুদের মুক্তিপণের টাকা দিয়েই মুক্তি পেয়েছিলেন এমভি আবদুল্লাহ ও ২৩ নাবিক। কিন্তু এই টাকা কে দিয়েছিল? একসময় মুক্তিপণের টাকা দেশ থেকে কীভাবে যাবে কিংবা ডলার সংকট কীভাবে সমাধান হবে এসব বিষয় নিয়েও অনেকের প্রশ্ন ছিল। ১৩ এপ্রিল দস্যুদের কাছ থেকে মুক্তির পর ১৪ এপ্রিল জাহাজ মালিক প্রতিষ্ঠান কেএসআরএম কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও মুক্তিপণের টাকা নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি। তবে গতকাল মঙ্গলবার জানা গেল বীমা কোম্পানির পক্ষ থেকেই দেওয়া হয়েছিল শতভাগ মুক্তিপণের টাকা।

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের জেটিতে ২৩ নাবিক নিয়ে আসার আগ মুহূর্তে মিডিয়ার পক্ষ থেকে মুক্তিপণ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে উপস্থিত সংবাদকর্মীদের কেএসআরএমের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক সারোয়ার জাহান রাহাত বলেন, ‘আমরা শতভাগ টাকা ইন্স্যুরেন্স (বীমা) কোম্পানি থেকেই নিয়েছি।’

এতে আর্থিক ক্ষতি কেমন হয়েছে পাল্টা প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘ব্যবসায় লাভ-লস সবই থাকবে। আমাদের জাহাজটি দীর্ঘদিন বসা ছিল, এতে অবশ্যই আমাদের ব্যবসায়িক ক্ষতি হয়েছে। তবে ক্ষতি হলেও নাবিকদের ও তাদের স্বজনদের আজকের হাসিমুখ দেখার তৃপ্তিই আলাদা।’

দস্যুদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগাযোগের কাজটি তখন করেছিলেন কেএসআরএমের প্রধান নির্বাহী মেহেরুল করিম। পৃথকভাবে একই প্রশ্ন তাকে করা হলে তিনিও একই উত্তর দেন। তিনি বলেন, ‘বিধি অনুযায়ী আমরা বীমা কোম্পানির কাছ থেকে মুক্তিপণের টাকা পেয়েছি। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী আমাদের জাহাজের প্রথম শ্রেণির বীমা করা ছিল। আর এই বীমার আওতায় দস্যুদের কবলে পড়ার বিষয়টি যুক্ত ছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই বীমা খুবই উচ্চমূল্যের। আর সেজন্যই আমরা এই সুবিধাটি পেয়েছি।’

আন্তর্জাতিক আইনে কী রয়েছে জানতে চাইলে বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, ‘বিশ্বে ইউরোপ, আমেরিকা, চীন ও জাপানের ১৫ থেকে ২০টি ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি রয়েছে। এসব কোম্পানি ঝুঁকিপূর্ণ রুটে চলাচলকারী জাহাজগুলোর বীমা করে থাকে। আমাদের এমভি আবদুল্লাহ জাহাজের বীমা করা ছিল যুক্তরাজ্যের বার্কলি কোম্পানির কাছে।’

কিন্তু উচ্চমূল্যের এসব বীমা সব সময় পরিচালনা করা তো ব্যয়বহুল। এতে জাহাজ মালিকদের লস হওয়ার কথা। এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘উচ্চমূল্যের এসব বীমা ৫ থেকে ৭ দিনের জন্য করা যায়। এজন্য বীমা কোম্পানিকে কমপক্ষে ৫০ হাজার ডলারও পরিশোধ করতে হয়। তাই জাহাজ মালিকরা ঝুঁকিপূর্ণ রুটে চলাচলের সময় শুধু পাইরেসি (দস্যুদের দ্বারা আক্রান্ত) বীমা করে থাকে।’

এতে মালিকদের ক্ষতি হয় না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এতে সবচেয়ে বেশি লাভ হয় বীমা কোম্পানির। ঝুঁকিপূর্ণ এসব রুটে প্রতিদিন শতাধিক জাহাজ চলাচল করে। একটি জাহাজ থেকে যদি ৫০ হাজার মার্কিন ডলার করে নেওয়া হয়, তাহলে তাদের অনেক টাকা আয় হয়। বিপরীতে ঝুঁকিপূর্ণ রুটে জিম্মির ঘটনা খুবই নগণ্য। তাই এক আবদুল্লাহর পেছনে ৫ মিলিয়ন ডলার দিলেও তারা শতাধিক মিলিয়ন ডলার আয় করে নিচ্ছে।

জাহাজের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধাপের বীমা রয়েছে বলে জানান বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট খায়রুল আলম সুজন। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি জাহাজে বিভিন্ন ক্যাটাগরির বীমা রয়েছে। আর ক্যাটাগরিভিত্তিক টাকা দিতে হয়। আর এগুলো সবই আন্তর্জাতিক আইন মেনেই করা হয়ে থাকে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত