ভোটযুদ্ধে ‘চিরশত্রু’ বাদ টার্গেট ‘বন্ধুরাষ্ট্র’

আপডেট : ২০ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

ভারতের নির্বাচনে শাসক বিজেপির মূল ইস্যু কী! এই নিয়ে প্রশ্ন করলে, ভুলেও অর্থনীতি, কৃষি, বিজ্ঞান, খেলা বা দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন বলে ফেলবেন না। তাহলেই কৌন বনেগা ক্রোড়পতির অমিতাভ বচ্চনের মতো শুনবেন ইয়ে গলদ জবাব, ভুল উত্তর। সহি বা ঠিক উত্তর অবশ্যই সাম্প্রদায়িক বিভাজন। অদ্ভুত কারণে এবার পড়শি যেসব দেশের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে সংঘ পরিবার যেভাবে উগ্র জাতীয়তাবাদী হাওয়া তোলে, নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে সেই তালিকায় কোনো অজ্ঞাত কারণে চীন, এমনকি ‘চিরশত্রু’ পাকিস্তান এবার নেই।

নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে মোটামুটি সব পড়শি রাষ্ট্রের সঙ্গেই ধীরে ধীরে ভারতের সম্পর্ক খারাপ হয়েছে। চীন, পাকিস্তান তো ছিল, বিস্ময়করভাবে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান, মায়ানমার, ভুটান, নেপালের নামও। সরকারিভাবে একমাত্র বাংলাদেশ ভারতের বন্ধুরাষ্ট্র বলে স্বীকৃত। যদিও মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের জনগণের বড় অংশ ভারতবিদ্বেষী হতে হতে আওয়াজ তুলেছে বয়কট ইন্ডিয়া। এর পেছনে মূল অভিযোগ, দুই দেশের ক্ষমতাসীনদের আঁতাত। এছাড়াও সীমান্ত হত্যা, নানা ধরনের অর্থনৈতিক শোষণ, বাংলাদেশের বহু মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। তবুও সরকারিভাবে ভারতের বন্ধু বলেই বাংলাদেশ পরিচিত। অথচ বিস্ময়করভাবে বন্ধুত্ব লাটে তুলে দিয়ে ভারতের শাসকদের নির্বাচনী ইস্যুতে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু বাংলাদেশেকে টার্গেট করা। বলাই বাহুল্য, বাংলাদেশের জনগণের সিংহভাগ মুসলমান বলেই নিয়ম করে প্রতিটি জনসভায় বিজেপির ছোট-বড়-মাঝারি সব নেতাই বিষ উগরে দিচ্ছেন ওপারের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের ওপর। এভাবেই বিপজ্জনকভাবে সাম্প্রদায়িক তাস খেলছে বিজেপি। যা নিঃসন্দেহে অশোভন, দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ক্ষতিকর। ভারত যে মোদির আমলে পুরোপুরি সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠেছে তা এখন ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। শুধু তো মুসলিমরা নন, খ্রিস্টানদের নিরাপত্তা নিয়েও পশ্চিম দুনিয়ায় প্রশ্ন উঠে গেছে।

এমনও শোনা যাচ্ছে যে পশ্চিম দুনিয়ায় সমর্থন সরে যাওয়ার কারণে, ভারত এই নির্বাচনের আগে চীনের সঙ্গে গোপন বোঝাপড়া সেরে নিয়েছে। মুখে যত তর্জন গর্জন হোক না কেন, ভারতের অর্থনীতিতে এই মুহূর্তে চীনের প্রভাব যথেষ্ট। পিন টু এলিফ্যান্ট, এমন কোনো জিনিস নেই যেখানে চীনের ভূমিকা নেই। ফলে পশ্চিম যদি ভবিষ্যতে বয়কটের রাস্তায় হাঁটে, তাহলে ভারতের চীননির্ভরতা বাড়তে বাধ্য। রাজনীতিতে চিরশত্রু বলে কিছু হয় না। চীনের হাত ধরলে পাকিস্তান নিয়েও তুলনায় মুখ কম খোলা হতে পারে। আপাতত এই লক্ষণ স্পষ্ট হয়েছে এবারের ভোটে। অথচ বিজেপির রাজনীতিতে দুই অস্ত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক, সাম্প্রদায়িক বিভাজন। দুই, উগ্র জাতীয়তাবাদ। দুটোর ক্ষেত্রেই কল্পিত এক ‘শত্রু’ না থাকলে বাজার গরম হবে না। জার্মানিতে হিটলারের উত্থানের কালে কল্পিত শত্রু ছিল ইহুদি সম্প্রদায়ের মানুষজন। এখানে অবশ্যম্ভাবী সফট টার্গেট মুসলমান, খ্রিস্টান, অল্প সংখ্যক বৌদ্ধ, কিছু কিছু ক্ষেত্রে শিখরাও।

বাংলাদেশ নিয়ে মোদি, অমিত শাহ ও অন্য নেতাদের বক্তব্য সেখানে অত্যাচারের ফলে বাধ্য হয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন এপারে পালিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। পশ্চিমবঙ্গে ও আসামে জনসংখ্যা যে বাড়ছে তা ওই নির্যাতন এবং অনুপ্রবেশ। পাশাপাশি একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে ঘুষপেটিয়া, রোহিঙ্গা এমন সব চোখা চোখা শব্দবন্ধ দিয়ে চিহ্নিতকরণ হচ্ছে যে তাতে মনে হয় ইচ্ছে করেই ওপারের মৌলবাদকে উসকে দেওয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে ওপার থেকে রোজ শত শত হিন্দু দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। এক বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদকে উদ্ধৃত করে সংখ্যাটি বছরে দু লাখের ওপরে।

যদি ধরেও নিই সংখ্যাটি সত্যি। তাহলে প্রশ্ন উঠবে, সবাই কি নির্যাতনের জন্য চলে যাচ্ছেন! বাংলাদেশ সম্পর্কে একটু আধটুও যারা খোঁজ রাখেন তারা সবাই স্বীকার করবেন বিষয়টিকে এমন সরলীকরণ করা ঠিক নয়। আমাদের শেকড় ছিল যে গ্রামে, সেখানে এখন হিন্দু কমেছে নিঃসন্দেহে। কিন্তু তার পেছনে অনেক কারণ। অনেকেই শহরে চলে এসেছেন। অনেকে কানাডা, আমেরিকা চলে গেছেন। বাংলাদেশের সব জেলা থেকেই মাইগ্রেশন হয়েছে। হচ্ছে। মূলত তার কারণ অর্থনীতি। আপনি আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইংল্যান্ড যান, সেখানে বিপুল উপস্থিতি বাংলাদেশিদের। নিও লিবারেল অর্থনীতি হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে বড় সংখ্যক জনগণকে অনাবাসী করেছে। বাংলাদেশের হিন্দু জনসংখ্যা শতাংশের হিসাবে ঠিক কত তা নিয়ে একাধিক হিন্দু সংগঠনের মধ্যে মতপার্থক্য আছে। তবে এটাও ঠিক যে ১৯৪৭ সালে, দেশভাগের সময় যে হিন্দু জনসংখ্যা পূর্ব বাংলাতে ছিল এখনো সংখ্যার হিসাবে তা খুব হেরফের হয়নি। শতাংশ কমলেও জনসংখ্যা দু কোটিরও বেশি আজও। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই শতাংশ মোটে দশ। তাহলেও মনে রাখবেন যে বাংলাদেশের নীতি নির্ণায়ক নানা গুরুত্বপূর্ণ পোস্টে হিন্দু জনসংখ্যা অন্তত পঁচিশ শতাংশ। তাছাড়া অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে দলে দলে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু যদি রোজ এদেশে চলে আসেন তা খুবই উদ্বেগের। তাহলে বিষয়টি নিয়ে ভারত সরকার সরকারিভাবে বন্ধু দেশকে জানাচ্ছে না কেন!! নির্যাতন যদি একমাত্র এদেশে চলে আসার কারণ হয়, তাহলে ঘুষপেটিয়া কারা? তারা কি সবাই সন্ত্রাসী!! তাহলে বিএসএফ কেন তাদের অনুপ্রবেশ আটকাতে পারছে না!! আমি বহু জেলায় ঘুরি। দক্ষিণবঙ্গ ও উত্তরবঙ্গে। কিন্তু নির্যাতন একেবারেই হয় না বলছি না। তবে যে ভয়ংকর ছবি এপারে তুলে ধরা হয় তা অতিরঞ্জিত। এর পেছনে বাংলাদেশের কিছু আরএসএস সমর্থক গোষ্ঠীর মদদ রয়েছে। পুরনো একটা গল্প ছিল। গ্লাসে অর্ধেক জল রয়েছে। আপনি বলতে পারেন যে অর্ধেক গ্লাস খালি। অপরের চোখে অর্ধেক ভর্তি। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী থেকে বিজেপির হেভিওয়েট অন্যান্য নেতা রাজনৈতিক স্বার্থে নেগেটিভ বলে বলে বিভাজনের রাজনীতি করছেন। না হলে তারা এখনো বাংলাদেশের বিভিন্ন শিল্পে হিন্দু জনগোষ্ঠীর প্রভাব কতটা তাও বলতেন। আরও বলতেন কত বিপুল সংখ্যক ভারতীয় বাংলাদেশের বিভিন্ন কোম্পানিতে নিযুক্ত আছেন, আইনি ও বেআইনি ভাবে। আসলে কোনো ছবিই একপেশে নয়। বাংলাদেশের কথিত নির্যাতন, মন্দির ভাঙা নিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশ করলেই অনেক ভুল ধারণা এপারের জনমনে ভেঙে যাবে। ইচ্ছা আছে বিশদে কখনো এই বিতর্কিত বিষয় নিয়ে লেখার।

এভাবে ব্রিটিশের ভাগ করো ও শাসন করো নীতি, কোনো সম্প্রদায়ের কাছেই কাক্সিক্ষত নয়। দুদেশের জনগণের উচিত এই বিভাজনের নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া।

লেখক : ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত