জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আবহাওয়ার ধরন ক্রমেই পাল্টাচ্ছে। সেই সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনাও বাড়ছে। ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়ে সুন্দরবনে প্রাণী ও সম্পত্তির বিপুল ক্ষতি হচ্ছে। যে সুন্দরবন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে দেশকে বারবার রক্ষা করে, ঘূর্ণিঝড় রিমালের প্রভাবে এবারও সেই বনের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে।
রিমাল নামের ঘূর্ণিঝড়টি গত রবিবার রাতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাগর দ্বীপ ও বাংলাদেশের পটুয়াখালীর খেপুপাড়ার মধ্যবর্তী অঞ্চল দিয়ে আঘাত হানে স্থলভাগে। ৩৬ ঘণ্টা ধরে সুন্দরবনের ওপর দিয়ে ঘূর্ণিঝড় রিমাল তান্ডব চালায়। এ পুরো সময়টা জোয়ার-জলোচ্ছ্বাসের পানিতে প্লাবিত হয় গোটা সুন্দরবন। এতে হরিণসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর প্রাণহানির শিকার হয়েছে। এ ছাড়া হাজার হাজার গাছ উপড়ে পড়েছে।
বন বিভাগ বলছে, ঘূর্ণিঝড় রিমালের আঘাতে সুন্দরবনে অবকাঠামোয় প্রায় ৬ কোটি ২৭ লাখ টাকার ক্ষতির প্রাথমিক ধারণা নিরূপণ করেছে বন বিভাগ। উদ্ধার করা হয়েছে ৩৯টি মৃত হরিণ। আহত ১৭টি হরিণ উদ্ধার করার পর শুশ্রুষা করে সুন্দরবনে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জলোচ্ছ্বাসের কারণে সুন্দরবনের মিষ্টি পানির আধার শতাধিক পুুকুর লবণাক্ত পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এতে খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে।
সুন্দরবনের বন সংরক্ষক (সিএফ) মিহির কুমার দো বলেন, সুন্দরবন ঝড়ের পর প্রাথমিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পূর্ণভাবে নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, ঝড়ের সময় জলোচ্ছ্বাসের কারণে গাছপালার চেয়ে বন্যপ্রাণীর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কারণ ৩৬ ঘণ্টা ধরে সুন্দরবনে ১০ থেকে ১২ ফুট জোয়ারের পানিতে নিমজ্জিত ছিল। এ সময় নদ-নদীতে ঘূর্ণি বাতাসের সঙ্গে প্রচন্ড ঢেউ ছিল। ফলে হরিণসহ সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীর ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। গাছে গাছে অসংখ্য পাখির বাসা ছিল। যাতে ডিম ছিল সেগুলো নষ্ট হয়েছে। সব প্রাণীই তাদের আবাসস্থল হারিয়েছে।
ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসে সুন্দরবনের এমন ক্ষতি নতুন। যুগ যুগ ধরে সুন্দরবন নিজের ক্ষতি করে আমাদের রক্ষা করে আসছে। সুন্দরবনের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় সিডর এবং ২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলায়। বড় ধরনের তাণ্ডব থেকে এই বন উপকূলকে রক্ষা করেছে। যদিও সেই দুর্যোগে বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হয়েছিল বিস্তৃত এই বাদাবন।
গত ১৪ বছরে বাংলাদেশের ওপর ১১টি ঘূর্ণিঝড় আঘাত করেছে। এর অন্তত অর্ধেক ঝড় সুন্দরবনকে আঘাত করে বাংলাদেশের উপকূলে আছড়ে পড়েছে। ঝড়ো হাওয়া আর জলোচ্ছ্বাসের তীরর্তী সুন্দরবনের গাছপালা, প্রাণী আর অবকাঠামো বারবার ক্ষতির মুখে পড়েছে। এভাবেই বারবার নিজে ক্ষতবিক্ষত হয়ে প্রকৃতি ও জীবনকে বাঁচিয়ে যাচ্ছে নীরবে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের আয়তন ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে বনভূমি ৪ হাজার ৮৩২ এবং জলাভূমি ১ হাজার ১৮৫ বর্গকিলোমিটার। ১৯৯৭ সালের তথ্য অনুযায়ী, এই বনভূমি ও জলাভূমিতে ২৮৯ প্রজাতির স্থলজ ও ২১৯ প্রজাতির জলজ প্রাণীর বসবাস।
বন্য প্রাণী-গবেষক সীমান্ত দীপু দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রকৃতিক দুর্যোগে কী পরিমাণ প্রাণী সুন্দরবনে মারা যায়, তার কোনো সঠিক তথ্য আমাদের কাছে নেই। ঝড়ের পর কখনই আমাদের গবেষণা করা হয়নি। নামমাত্র কিছু কিছু তথ্য আমরা পাই, তা যথেষ্ট নয়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এমএ আজিজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সব প্রাণীর জন্য সুন্দরবন উপযোগী আবাস নয়। কিছু প্রাণী আছে যেগুলো লোকালয়ের কিন্তু মানুষের অত্যাচারে এরা সুন্দরবনে আশ্রয় নেয়। তিনি বলেন, সুন্দরবনের ভূমি পানির তল থেকে খুব বেশি উঁচু নয়। ঝড় বা জলোচ্ছ্বাস হলে অধিকাংশ এলাকা দ্রুতই তলিয়ে যায়। বড় ধরনের হলে যেমন আমরা রিমালের ক্ষেত্রে দেখেছি পুরো সুন্দরবনই তলিয়ে যায়। এ সময়ে বিশেষ করে যারা ক্যাট জাতীয় প্রাণী যেমন বাঘ, বন্য কুকুর, মেছো বিড়াল কিছুটা গাছে উঠতে পারে। ফলে তারা সুরক্ষা পায়। অন্য যে প্রাণী হরিণ, শূকর এরা আবার আশ্রয় নিতে পারে না। ফলে এ প্রাণীগুলো প্রচুর মারা যায়। এবারও আমরা তাই দেখেছি। এ ধরনের পরিস্থিতি সব প্রাণীর জন্যই আসলে দুর্যোগ।
জলোচ্ছ্বাস কমে গেলেও প্রাণীর জন্য বিপদ থেকে যায় উল্লেখ করে এ বিশেষজ্ঞ বলেন, জলোচ্ছ্বাসের সময় লবণাক্ত পানির পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। সুন্দরবনের যেসব মিষ্টি পানির আধার (পুুকুর) রয়েছে সেগুলো লবণাক্ত পানিতে প্লাবিত হয়ে যায়। এতে প্রাণীর খাবার পানির সংকট তৈরি হয়। এ ক্ষেত্রে দ্রুত মিষ্টি পানির ব্যবস্থা করতে হলে পানিটা সেচে ফেলা। সব পুকুর তো আর সেচে ফেলা সম্ভব হয় না। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের পুকুরগুলো দ্রুত সেচে ফেললে এখন যেহেতু বর্ষাকাল দ্রুত এটা ভরে যাবে। আবার অনেক সময় পানি চুইয়েও ভরে যায়। সে চুয়ানো পানিটা ভালো।
বন্য প্রাণী-গবেষক সীমান্ত দীপুর মতে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে বন্যপ্রাণী রক্ষার জন্য সেল্টার তৈরি করা হয়। মানুষের জন্য যেমন সেল্টার দরকার সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী রক্ষা করতে হলে তাদের জন্যও সেল্টার তৈরি করা প্রয়োজন। কারণ আমাদের দেশে দিনে দিনে ঘূর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাড়ছে। সরকারিভাবে এ উদ্যোগ নিতে হবে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক আবদুস সোবহান মল্লিক বলেন, সম্প্রতি বন বিভাগ সুরক্ষা প্রকল্পের আন্ডারে একটা উদ্যোগ নিয়েছে। অনেক জায়গায় ডিভির মতো করে দিচ্ছে। এখন এটা কতটুকু সুফল পাওয়া যাচ্ছে বলা যাচ্ছে না। ওনারা অনেক গবেষণা করেই নিয়েছেন। তবে আমি মনে করি, সুন্দরবনের প্রাণী ও সম্পদ রক্ষায় সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়া দরকার, তাতে সংকট অনেকটা কমে আসবে।
