ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে ঝিনাইদহ-৪ আসনের আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য (এমপি) আনোয়ারুল আজীম খুন হওয়ার পর এমপিদের বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে কী ধরনের নিয়ম মানতে হয়, সে বিষয়ে জনমনে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। মন্ত্রী ও এমপিদের ব্যক্তিগত বিদেশ সফরে তাদের নিরাপত্তা কী হবে সেটি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
দেশের সংবিধান, সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুসারে ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অধিবেশন না থাকলে একজন এমপির দেশের বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রে স্পিকারকে অবহিত করা বাধ্যতামূলক নয়। তাছাড়া ব্যক্তিগত সফরে কোনো এমপি বা মন্ত্রী যদি দেশের বাইরে যান তবে সেসব দেশে সাধারণত কোনো ব্যক্তি বিশেষ নিরাপত্তা পান না।
কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, সংসদ অধিবেশন চলাকালে কোনো সংসদ সদস্য যদি দেশের বাইরে ব্যক্তিগত কাজে যান তবে তা স্পিকারকে অবহিত করবেন। আর অন্য সময় স্পিকারকে বিষয়টি না জানালেও হয়। কার্যপ্রণালি বিধির ১৭৯ অনুচ্ছেদের (১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘একাদিক্রমে ৯০ দিন বৈঠকে অনুপস্থিত থাকার জন্য অনুমতি লাভ করিতে ইচ্ছুক কোনো সদস্য তাহার অনুপস্থিতির আরম্ভ ও সমাপ্তির তারিখ এবং উহার কারণ স্পিকারের নিকট লিখিতভাবে আবেদন করিতে পারিবেন। তবে শর্ত থাকে যে, যেকোনো সময়ে আবেদনকৃত অনুপস্থিতির মেয়াদ ৯০ দিনের অধিক হইবে না।’
মন্ত্রীদের ছুটির ব্যাপারে বলা আছে, প্রধানমন্ত্রীর কাছে তিনি তার ব্যক্তিগত ছুটির আবেদন করবেন এবং তিনি যদি মন্ত্রী ও একাধারে সংসদ সদস্য হন তাহলে স্পিকারকেও অবহিত করবেন। আর টেকনোক্রেট কোটার মন্ত্রীদের ক্ষেত্রে শুধু প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করে যাবেন।
সংসদ সচিবালয়, সংসদ সদস্য এবং সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আনোয়ারুল আজীম আনারের বিষয়টি একটি ব্যতিক্রম ঘটনা। তিনি যদি স্পিকারকে চিঠিও দিয়ে যেতেন, তাহলেও যে দেশে তিনি গিয়েছেন, সেখানে তার প্রতি কোনো আলাদা নিরাপত্তার বিষয় নেই। এটা শুধু ভারতেই নয়, পৃথিবীর কোনো দেশেই বেসরকারিভাবে কোনো এমপি বা মন্ত্রী এবং ভিআইপিরা ভ্রমণ করলে বাড়তি কোনো নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকে না।
এ ব্যাপারে সাবেক এমপি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু দেশ রূপান্তরকে বলেন, সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনারের ঘটনাটি একটা অনভিপ্রেত ঘটনা। এ ঘটনার সঙ্গে অন্য যা কিছুই জড়িত থাকুক না কেন, স্পিকারকে অবহিত করা না করা এর সঙ্গে যুক্ত নয়। তাছাড়া একজন সংসদ সদস্য দেশের বাইরে ব্যক্তিগত কাজে গেলে নিরাপত্তা বিষয়টি দেখা হয় না। এটা শুধু ভারতে নয়, কোনো দেশেই নিরাপত্তা দেয় না। কোনো দেশেই এমন কোনো নিয়ম নেই যে একজন সংসদ সদস্য বা কোনো দেশের একজন ভিআইপি দেশটি সফরে গিয়ে সংশ্লিষ্ট থানা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করবেন। শুধু রাষ্ট্রীয় সফরে কিংবা যে দেশে যাচ্ছেন সে দেশের সরকারের কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণে গেলে সফরকে ঘিরে নিরাপত্তার বিষয়টি দেখা হয়।
জাসদের সভাপতি ইনু বলেন, আনোয়ারুল আজীমের ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম। এর জন্য সব আইন পরিবর্তনের সুযোগ নেই। এখানে ভারতের পক্ষ থেকেও কোনো সমস্যা নেই। আবার কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী আনোয়ারুল আজীম গত ৫ মে সংসদের অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন। অধিবেশন চলাকালে যদি তিনি দেশের বাইরে যেতেন তাহলে হয়তো ছুটি নেওয়ার বিষয় বা অনুমতির বিষয় থাকত।
চাঁদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুহম্মদ শফিকুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, সংসদ সদস্যরা অধিবেশন চলাকালে দেশে বাইরে গেলে স্পিকারকে অবহিত করেন। আর বেশি দিন অর্থাৎ ৯০ দিনের মতো ছুটি লাগলে সেটির অনুমতি আগেও নিতে পারেন আবার পরে এসেও তিনি সংসদকে অবহিত করতে পারেন।
এমপি আনোয়ারুল আজীম আনারের আসন শূন্য ঘোষণার বিষয়ে জটিলতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সবকিছুরই সমাধান আছে। সংসদ নেতা শেখ হাসিনা, স্পিকার, আইন বিশেষজ্ঞরা বসে অবশ্যই একটা সমাধান করবেন।
এদিকে সংবিধান ও সংশ্লিষ্ট আইন বলছে, মরদেহ পাওয়া না গেলে সংসদে তার আসন শূন্য হওয়া নিয়ে জটিলতা দেখা দিতে পারে। সাধারণত চলতি সংসদের কোনো সংসদ সদস্য মৃত্যুবরণ করলে একদিনের মধ্যেই সংসদ সচিবালয় থেকে তারা আসন শূন্য ঘোষণা করা হয় এবং নির্বাচন কমিশন পরবর্তীতে ওই আসনের ওপর নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে থাকে।
কিন্তু সংসদ সদস্য আনারের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। তাছাড়া তিনি সর্বশেষ অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন। সে হিসেবে অনুপস্থিতি দেখিয়েও আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সময় পাওয়া যাবে।
সংসদ সচিবালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এর মধ্যে বিষয়টি স্পিকার সংশ্লিষ্টদের নিয়ে কথা বলেছেন। এ নিয়ে আইনের খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ চলছে। প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনা নেবে সংসদ।
সংসদ সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব কেএম আবদুস সালাম গণমাধ্যমকে বলেন, স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে এমপি আনারের আসন শূন্য ঘোষণার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
