শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

জোট বন্দনায় মোদির প্রভাব ধরে রাখতে চায় বিজেপি

আপডেট : ০৮ জুন ২০২৪, ০২:২৮ এএম

আগামীকাল রবিবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তৃতীয় মেয়াদে শপথ নেবেন বিজেপি নেতা নরেন্দ্র মোদি। গতকাল শুক্রবার তৃতীয়বার সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক আবেদন নিয়ে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর বাসভবনে যান তিনি। সেখান থেকে বেরিয়ে তিনি সাংবাদিকদের জানান, রাষ্ট্রপতি তাকে ডেকেছিলেন। সরকার গড়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। রবিবার শপথ গ্রহণের দিন নির্ধারণ হয়েছে।

এনডিটিভি ও আনন্দবাজারের খবরে বলা হয়েছে, গতকাল সংসদের সেন্ট্রাল হলে আয়োজিত বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে এনডিএর সংসদীয় নেতা নির্বাচিত হন মোদি। পরে প্রবীণ বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আডভানী, মুরলী মনোহর জোশী এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এরপর রাইসিনা হিলে রাষ্ট্রপতি ভবনে যান মোদি। বিজেপি সূত্রের খবর, রাষ্ট্রপতির কাছে এনডিএর মোট ২১ জন নেতার সমর্থনপত্র নিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে গিয়ে সরকার গড়ার দাবি জানান তিনি।

শুক্রবার বিকেলে রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের সামনে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে জানান মোদি। মোদি বলেন, এটুকু আশ্বাস দিতে পারি, গত দুই দফায় উন্নয়নের যে গতি বজায় ছিল, তৃতীয় দফার পাঁচ বছরেও তা থাকবে।

এদিকে আনন্দবাজার এক প্রতিবেদনে বলেছে, গতকাল হওয়া এনডিএর বৈঠকে শরিক দলের নেতারা মোদির স্তুতি গেয়েছেন। এনডিএ তো বটেই, বিজেপির অন্দরেও যে নেতার সঙ্গে মোদির সম্পর্ক ‘মসৃণ’ নয় বলেই সবাই জানেন, তাকেও বক্তৃতা দেওয়ানো হয়েছে। মোদির ‘সার্বিক গ্রহণযোগ্যতা’ তুলে ধরতেই পুরনো সংসদ ভবনের সেন্ট্রাল হলের ওই বৈঠকে বিজেপি এবং সহযোগী দলগুলোর লোকসভা সাংসদদের পাশাপাশি ‘আমন্ত্রিত’ তালিকায় ছিলেন রাজ্যসভা সাংসদরাও। আমন্ত্রিত ছিলেন বিজেপি এবং এনডিএ শাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা। একেবারে সামনের সারিতে ছিলেন উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ।

আনন্দবাজার বলছে, শুক্রবারের যে বৈঠকে বারবার এনডিএর ঐক্যের ছবি তুলে ধরার চেষ্টা হলো, ঘটনাচক্রে মোদির দ্বিতীয় দফার প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রথম চার বছরে সেই জোটের কোনো বৈঠকই হয়নি! গত বছরের ১৮ জুলাই বেঙ্গালুরুতে বিরোধী জোট ‘ইনডিয়া’র আনুষ্ঠানিক আবির্ভাবের দিনে দিল্লিতে এনডিএর শরিকদের নিয়ে প্রথম বৈঠক করেছিলেন মোদি, অমিত শাহ, জেপি নড্ডারা। গত পাঁচ বছরে এনডিএর সেটিই প্রথম এবং সেটিই শেষ বৈঠক!

মোদির নেতৃত্বে বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও তার প্রতি ‘বিশ্বাস’ যে সবার অটুট, তা তুলে ধরতে ওই বৈঠক সরাসরি (লাইভ) সম্প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল খবরের চ্যানেলে। বৈঠকের প্রথমে বিজেপির সভাপতি জেপি নড্ডা দলের সংসদীয় নেতা হিসেবে মোদির নির্বাচিত হওয়ার কথা ঘোষণা করেন। এরপর রাজনাথ সিংহ এনডিএর সংসদীয় নেতা হিসেবে মোদির নাম প্রস্তাব করেন। গত কয়েক বছরে বিজেপির ‘নম্বর টু’ হয়ে ওঠা অমিত শাহের বদলে রাজনাথকে এই ভূমিকায় দেখতে পাওয়া ‘চমক’ তো বটেই। কারণ, প্রতিরক্ষা দপ্তর মন্ত্রী হলেও সরকার এবং বিজেপির অন্দরে রাজনাথ খানিকটা নীরবেই থাকেন।

আনন্দবাজার বলছে, বৈঠকে ‘চমক’ ছিল আরও। তৃতীয় বক্তা শাহের পরেই নিতিন গডকড়ীর আগমন! প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে আরএসএস ঘনিষ্ঠ নেতা গডকড়ীর সম্পর্ক ‘মসৃণ’ নয়। এক দশক ধরে মোদি মন্ত্রিসভায় থাকলেও দল এবং জোটের অন্দরে কখনো ‘সক্রিয়’ হতে দেখা যায়নি তাকে। এমনকি কয়েক বছর আগে আমজনতার স্বপ্নপূরণের ক্ষেত্রে মোদি সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছিলেন প্রাক্তন বিজেপি সভাপতি গডকড়ী।

১৬ জন লোকসভা সাংসদের দল টিডিপির প্রধান চন্দ্রবাবু নায়ডু এবং ১২ লোকসভা সাংসদের দল জেডিইউর সভাপতি নিতিশ কুমারকে পেছনে ফেলে এনডিএর অবিজেপি নেতাদের মধ্যে প্রথম বক্তা হিসেবে শুক্রবার বৈঠকে দেখা গেল জেডিএসের এইচডি কুমারস্বামীকেও। নায়ডু এবং নিতিশের পরে শিবসেনার একনাথ শিন্ডে, এনসিপির অজিত পাওয়ার, এলজেপির (রামবিলাস) চিরাগ পাসোয়ান, হিন্দুস্থান আওয়াম মোর্চা (হাম) সভাপতি জিতনরাম মাঝিঁ, আপনা দল (এস) নেত্রা অনুপ্রিয়া পটেল, জনসেনা পার্টির পবন কল্যাণের মতো সহযোগী নেতারাও বক্তার তালিকায় ছিলেন।

এনডিএর জয়জয়কার করেছেন মোদিও। তিনি বলেন, প্রকাশ সিংহ বাদল, বালাসাহেব ঠাকরে, জর্জ ফার্নান্দেজ, শরদ যাদবের মতো প্রয়াত নেতাদের হাত ধরে এনডিএর যাত্রা শুরু হয়েছিল।

প্রসঙ্গত, ১৯৯৬ সালে অটলবিহারি বাজপেয়ির নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল এনডিএ। ১৯৯৮ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত বাজপেয়ির প্রধানমন্ত্রিত্বে এই জোটের সরকার ছিল। তার পর ২০১৪ এবং ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে জিতে মোদির নেতৃত্বে ফের সরকার গঠন করেছিল এই জোট। তবে এত দিন জোট ছিল নামেই। এককালে বাংলায় যেমন বামফ্রন্টের শরিকদের হেলাফেলা করত সিপিএম, কেন্দ্রে বিজেপিও তেমনই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে এসেছে জোটশরিকদের। বস্তুত, গত এক বছরে এনডিএর অন্যতম শরিক পঞ্জাবের শিরোমণি অকালি দল, তামিলনাড়ুর এডিএমকে, জম্মু ও কাশ্মীরে পিডিপি, হরিয়ানায় জেজেপি, রাজস্থানের রাষ্ট্রীয় লোকতান্ত্রিক পার্টি মোদির সঙ্গ ছেড়েছে।

সহযোগী পাওয়ার জন্য উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনা এবং শরদ পাওয়ারের এনসিপি ভেঙে প্রতীক দখলেরও অভিযোগ উঠেছে বিজেপির বিরুদ্ধে। আবার গত কয়েক মাসে নিতিশের জেডিইউর পাশাপাশি এনডিএ ছাড়ার পরেও ফেরত এসেছেন টিডিপির চন্দ্রবাবু, তামিলনাড়ুর পিএমকে, কর্ণাটকের জেডিএস, এমনকি এলজেপির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রামবিলাস পাসোয়ানের পুত্র চিরাগ। উত্তর প্রদেশের রাষ্ট্রীয় লোকদল, অন্ধ্রে জনসেনা ত্রিপুরায় তিপ্রা মথার মতো নতুন সহযোগীও পেয়েছে বিজেপি। লোকসভা ভোটে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পরে মোদির ‘প্রভাব’ অক্ষুন্ন রাখতে সেই শরিকদেরও মুখাপেক্ষী বিজেপি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত