দেশে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি একটি শক্তিশালী মুদ্রানীতি গ্রহণ করে, বাণিজ্যিক ব্যাংককে অতিরিক্ত তারল্য সহায়তা প্রদান করা থেকে বিরত থাকে এবং বাজেট ঘাটতি মেটাতে অর্থ না ছাপায়, তাহলে ছয়-নয় মাসের মধ্যে মুদ্রাস্ফীতির হার কমতে শুরু করবে বলে জানিয়েছেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর।
গতকাল রাজধানীর গুলশানে এমসিসিআই মিলনায়তনে ‘বাজেটের অন্তর্দৃষ্টি : চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগ’ শীর্ষক একটি উপস্থাপনাকালে তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায় যে কঠোর মুদ্রানীতি সব প্রধান অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির হার দ্রুত হ্রাসে অবদান রেখেছে।’
যুক্তরাষ্ট্রকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে আহসান এইচ মনসুর বলেন, সুদের হার প্রায় দ্বিগুণ অঙ্ক (বাংলাদেশের মতো) থেকে প্রায় ৩ শতাংশে নেমে এসেছে। একই ধরনের ফলাফল যুক্তরাজ্য, ইইউ এবং ভারতেও দেখা গেছে।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, ঢাকা (এমসিসিআই) এবং বাংলাদেশের পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, এসব দেশের উদাহরণ থেকে আমরা আশা করতে পারি যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি ওইসব উদ্যোগ নিতে পারে তাহলে বাংলাদেশেও মূল্যস্ফীতির হার ৫-৬ শতাংশে নেমে আসতে পারে।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় আহসান এইচ মনসুর বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি রোধে আর বিলম্ব না করে পলিসি রেট বর্তমান সাড়ে ৮ শতাংশ থেকে কমপক্ষে ১০ শতাংশে উন্নীত করা উচিত। তিনি বলেন, মূল্য স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সরকারকে মুদ্রানীতির অবস্থান শক্ত রাখার দিকে মনোনিবেশ করা উচিত।
তিনি বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছর সামষ্টিক অর্থনৈতিক একত্রীকরণের বছর এবং এটি উচ্চ বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির বছর হবে না। কঠোর আর্থিক অবস্থানের মাধ্যমে বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা মুদ্রাস্ফীতির লক্ষ্য অর্জনের মূল চাবিকাঠি হবে। তিনি বলেন, সুদের হার কাঠামোকে অবশ্যই বাজার শক্তির সঙ্গে অবাধে ওঠানামা করার অনুমতি দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংককে তার কঠোর আর্থিক অবস্থানের অংশ হিসেবে সরকারি ঋণের নগদীকরণ থেকে বিরত থাকা উচিত। সংস্কার না এনে এবং জবাবদিহি নিশ্চিত না করে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে তারল্য সহায়তা প্রদান থেকে বিরত থাকতে হবে।
সরকারের উদ্দেশে আহসান এইচ মনসুর বলেন, আপনারা ব্যয় সংকোচনের চেষ্টা করছেন। সরকারি ব্যয় আরও ৫০ হাজার কোটি টাকা ছেঁটে ফেলেন। ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার পরিমাণ ৯০ হাজার কোটি টাকায় নিয়ে আসেন। তাহলে ব্যক্তি খাত আরও ৮০-৯০ হাজার কোটি টাকা পাবে। এতে একটা ভারসাম্য আসবে।
ব্যক্তি খাতের উদ্দেশে আহসান এইচ মনসুর বলেন, আপনারা শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হবেন না। আপনারা বিদেশ থেকে ঋণ নেওয়ার ব্যবস্থা করুন। আগে তো নিয়েছেন। ২৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়েছিল ব্যক্তি খাত। এখন সেটি কমে ১২ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। এটা যদি না বাড়াতে পারি, তাহলে দুটি সমস্যা থেকে যাবে। এক. ব্যক্তি খাতের ঋণের পরিমাণ কম হবে। দুই. দেশের আর্থিক হিসাব যদি পজিটিভ করতে পারি তাহলে লেনদেন ভারসাম্যে সমস্যা সমাধান হবে। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভটা ধীরে ধীরে বাড়বে। রিজার্ভ কমার মূল কারণ, আর্থিক হিসাব ঋণাত্মক হওয়া। যার বড় কারণ ব্যক্তি খাতের ঋণ পরিশোধ। ঋণ আরও নিতে হবে। এই কৌশলে গেলে লেনদেন ভারসাম্য ঠিক হবে। মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনতে পারব। সরকার ও ব্যক্তি খাতের মধ্যে ঋণ ব্যবস্থাপনাও সামঞ্জস্য হবে। সামগ্রিকভাবে সেটি অর্থনীতির জন্য ভালো।
অনুষ্ঠানে পিআরআই’র চেয়ারম্যান জাইদি সাত্তার বলেন, বাজেটটি সঠিক পথে আছে এবং ব্যয়ের দিক থেকে অনেক বেশি বাস্তবসম্মত। কেউ কেউ বলছেন যে এটি সংকোচনমূলক, কিন্তু এটি সংশোধিত বাজেটের তুলনায় মাঝারি ভাবে সম্প্রসারণমূলক বলে তিনি মনে করেন। রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবসম্মত বলে মনে করলেও জাইদি সাত্তার আমূল সংস্কার আশা করেন। তিনি বলেন, বাজেট ঘাটতি গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। আদর্শভাবে, বাজেট ঘাটতি সংকোচনমূলক রাজস্ব ও মুদ্রানীতিকে সমর্থন করে।
বাজেটে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ প্রসঙ্গে জাইদি সাত্তার বলেন, এটি একটি জাতীয়তাবাদী ধারণা। মেড ইন বাংলাদেশের নীতিগত সহায়তা যদি বৈশ্বিক বাজারে বিক্রি বাড়াতে পারে, তাহলে প্রবৃদ্ধি ৭-৮ শতাংশ হতে পারে, যা বেড়ে ১০ শতাংশও হতে পারে। অবশ্য শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ বিক্রির মাধ্যমে কোনো দেশই এমন প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে এমন কোনো উদাহরণ নেই বলেও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিনিময় হারের উদারীকরণ একটি ভালো পদক্ষেপ। আমরা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে চাই। পণ্য ও বাজার বৈচিত্র্যের ওপরও গুরুত্বারোপ করতে হবে। আমরা আরএমজিতে ফোকাস দেব।
তিনি বলেন, ব্যাংক একীভূতকরণের ক্ষেত্রে ব্যাংকটির ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা এবং ঋণ গ্রহণের উপযুক্ততা বিবেচনায় নিতে হবে। এছাড়া ব্যাংকটির সামগ্রিক অবস্থাও বিবেচনা করতে হবে। বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে যখন সরকার ঋণ নেয়, সে ঋণের ওপর আমানতকারীরা ব্যাংক থেকে কিছু মুনাফা পেয়ে থাকেন। ঋণের টাকা বিভিন্ন অবকাঠামো তৈরিতে ব্যয় করা হয়। সেখান থেকেও সমাজে সুবিধা বিস্তার হয়। মসিউর রহমান বলেন, বেকারত্ব দূর করতে আরও সরকারি বিনিয়োগ প্রয়োজন রয়েছে। বেসরকারি খাতকেও এগিয়ে আনতে হবে। প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে।
অনুষ্ঠানে এমসিসিআই প্রেসিডেন্ট কামরান টি রহমান অ-তালিকাভুক্ত ও এক ব্যক্তি মালিকানাধীন কোম্পানির করপোরেট করহার কমানোর প্রশংসা করে তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্যও একই সুবিধার সুপারিশ করেন। তিনি বলেন, ১৫ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার যে সুযোগ বাজেটে দেওয়া হয়েছে, তা সৎ করদাতাদের নিরুৎসাহিত করবে। এমসিসিআই সভাপতি বিশ্বাস করেন যে, করজাল সম্প্রসারণ না করে শুধুমাত্র করহার বাড়িয়ে কর-জিডিপির কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না। প্রতি তিন মাস পর পর বাজেটের অন্তর্বর্তী মূল্যায়ন হলে তা সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলেও তিনি মনে করেন।
