হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধের হুঁশিয়ারি ইসরায়েলের

আপডেট : ২০ জুন ২০২৪, ০১:১২ এএম

লেবাননের ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ গোষ্ঠী আট মাস ধরে গাজা যুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে ইসরায়েলের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি গুলিবিনিময় করে আসছে। এতে দুপক্ষেরই বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। হিজবুল্লাহ বলছে, গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধ না হওয়া অবধি তাদের হামলা অব্যাহত থাকবে। অন্যদিকে ইসরায়েল পাল্টা হামলার পাশাপাশি এবার সর্বাত্মক যুদ্ধের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। গতকাল বুধবার ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, লেবাননের হিজবুল্লাহর সঙ্গে শিগগিরই একটি সর্বাত্মক যুদ্ধের সিদ্ধান্ত আসছে। সপ্তাহখানেক আগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও একই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোর চেষ্টা করছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের এক মুখপাত্র বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক মাত্রার আঞ্চলিক যুদ্ধ দেখতে চায় না। লেবানন সীমান্তে এই সংঘাত আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স।

আলজাজিরা বলছে, লেবাননের ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ গোষ্ঠী আট মাস ধরে গাজা যুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে ইসরায়েলের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি গুলিবিনিময় করে আসছে। ইসরায়েলের হামলায় হিজবুল্লাহর এ যাবৎকালের সবচেয়ে ঊর্ধ্বতন এক কমান্ডার নিহত হওয়ার পর গত সপ্তাহে ইসরায়েলি সামরিক স্থাপনাগুলোতে সবচেয়ে বড় রকেট ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে গোষ্ঠীটি। ড্রোন ফুটেজ প্রকাশ করে ইসরায়েলের বন্দর নগরী হাইফা আক্রমণ করার হুমকিও দেন হিজবুল্লাহ নেতা সাঈদ হাসান নাসারাল্লাহ।

এরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্টে কাটজ বলেছেন, নাসারাল্লাহর হাইফা বন্দরের ক্ষতি করার হুমকির মুখে আমরা হিজবুল্লাহ ও লেবাননের বিরুদ্ধে খেলার নিয়ম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার খুব কাছাকাছি চলে আসছি। সর্বাত্মক যুদ্ধে হিজবুল্লাহকে ধ্বংস করে দিয়ে লেবাননকে নাস্তানাবুদ করা হবে।

এর জন্য অবশ্য ইসরায়েলকে কঠিন মূল্য চুকাতে হবে সে কথা স্বীকার করে নিয়ে কাটজ বলেন, আমাদের দেশ ঐক্যবদ্ধ। আর এ যুদ্ধে নিশ্চিতভাবেই উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দাদের নিরাপত্তা ফিরে আসবে।

গতকাল ইসরায়েলের সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, ইসরায়েল লেবাননে সর্বাত্মক যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত এবং হিজবুল্লাহকে নিশানা করে আক্রমণ শানানোর পরিকল্পনাও অনুমোদন করা হয়ে গেছে।

এদিকে ইরানের প্রধান মিত্র লেবাননের হিজবুল্লাহ গেরিলা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার হুমকির মুখে সিরিয়ায়ও হামলা শুরু করেছে ইসরায়েল। গত মঙ্গলবার সিরিয়ার কুনেইত্রা ও দারা প্রদেশের সামরিক ঘাঁটিতে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী ধারাবাহিক বিমান হামলা চালিয়েছে। হামলায় এক সেনা কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন এবং এতে বস্তুগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েল নিয়মিতভাবে সিরিয়ায় বিমান হামলা চালিয়ে আসছে, প্রায়ই ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীর সদস্যদের লক্ষ্য করে। সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, এ বছর এ ধরনের হামলায় ১৭১ যোদ্ধা ও ১৩ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।

ফেসবুকে এক পোস্টে সিরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সিরিয়ায় অস্ত্র গুদাম, সরবরাহ রুট ও ইরান-সংশ্লিষ্ট কমান্ডারদের ওপর গোপন হামলা জোরদার করেছে ইসরায়েল।

বছরের পর বছর ধরে সিরিয়া এবং অন্যান্য দেশে চিরশত্রু ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে হামলার লক্ষ্যবস্তু করেছে ইসরায়েল। এসব হামলা এতদিন স্বল্প পরিসরে ছিল। কিন্তু গত বছর ৭ অক্টোবরে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী গোষ্ঠী হামাসের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর এই গোপন হামলার মাত্রা বেড়েছে।

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির হিসাব অনুযায়ী, গত বছর ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে ঢুকে হামাসের হামলার আগের দুই বছরে সিরিয়ায় ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড (আইআরজিসি) ও হিজবুল্লাহর কয়েক ডজন কর্মকর্তাকে হত্যা করেছে ইসরায়েল।

গত এপ্রিলে দামেস্কে ইরানি কনস্যুলেটে ইসরায়েলি বোমা হামলায় লেভান্তে আইআরজিসি’র শীর্ষ কমান্ডার নিহত হন। এর ফলে ওই অঞ্চলে ইসরায়েল-ইরান উত্তেজনা চরম মাত্রায় পৌঁছায়। এর জবাবে ইরান ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে প্রায় ৩০০ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করে, যার প্রায় সবগুলোই ভূপাতিত করা হয়। এরপর ড্রোন দিয়ে ইরানি ভূখণ্ডে হামলা চালায় ইসরায়েল। ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে এটিই ছিল প্রথম সরাসরি সংঘর্ষের ঘটনা। তবে এই সংঘর্ষ বড় আকার ধারণ করেনি।

ফরাসি কূটনীতিক সেলিন উইসাল বলেছেন, ইসরায়েল ইরান-সমর্থিতদের বিরুদ্ধে হামলা কিছুটা কমিয়েছে। এপ্রিলে দুপক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলার পর ইসরায়েল হামলার গতি ‘মন্থর করেছে’।

কিন্তু লেবাননে ইরানি অস্ত্র হস্তান্তর নিয়ে সন্দেহের কারণে ইসরায়েলের হামলা আবার বাড়ছে। সিরিয়া ও লেবাননে ইরান ও হিজবুল্লাহর মধ্যকার সরবরাহ চেইন ব্যাহত করার তৎপরতা চলছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত সপ্তাহে বলেন, তার দেশ লেবাননের সীমান্তে ‘অত্যন্ত শক্তিশালী হামলার’ জন্য প্রস্তুত ছিল। যদিও লেবাননে যুদ্ধ অনিবার্য নয়। ওয়াশিংটন ও ফ্রান্সের মধ্যস্থতায় কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে ইসরায়েলও খোলামেলা ইঙ্গিত দিয়েছে।

উত্তেজনা কমানোর লক্ষ্যে বিশেষ মার্কিন দূত মধ্যপ্রাচ্য সফর করছেন। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের বিশেষ দূত অ্যামস হোখস্টাইন লেবানন সফর করে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করছেন। মার্কিন দূত অ্যামস হোখস্টাইন মঙ্গলবার বলেন, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে উত্তেজনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্ট বাইডেন মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর যুদ্ধ এড়াতে বদ্ধপরিকর। তিনি মঙ্গলবার লেবাননের সেনাবাহিনী প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। হিজবুল্লাহর সহযোগী বলে পরিচিত সশস্ত্র আমাল বাহিনীর প্রধান ও সংসদের স্পিকার নাবি বারির সঙ্গেও আলোচনা করেন তিনি। হোখস্টাইন হামাসের উদ্দেশ্যে গাজায় অস্ত্রবিরতির প্রস্তাব মেনে নেওয়ার ডাক দেন। লেবাননের কার্যনির্বাহী প্রধানমন্ত্রী নাজিব মিকাতি তাকে বলেন, তার দেশ উত্তেজনা বাড়াতে চায় না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত