বৃষ্টির দিনে পোশাক পরতে হয় একটু বুঝেশুনে। কারণ একদিকে কাদাপানির ঝামেলা আর অন্যদিকে ভ্যাপসা গরম। দুটো বিষয়কে মাথায় রেখেই পোশাক নির্বাচন করতে হয়। এই সময়টাতে কেমন পোশাক পরবেন জানালেন জান্নাতুল কাওসার প্রকৃতিতে বর্ষার আগমন ঘটেছে আরও এক সপ্তাহ আগেই। তবে আষাঢ়ের বৃষ্টিকে বোঝা যেন মানুষের মন বোঝার মতোই কঠিন। কখন কোন ফাঁকে ঝুপ করে বৃষ্টি নেমে যায় বলাই যায় না। বৃষ্টিদিন সবার মনেই প্রেম-বিরহের ভাবাবেগ জাগিয়ে তোলে। বৃষ্টির বিকেলে প্রিয়জনের সঙ্গে হঠাৎ দেখায় বুকে সুখের মতো ব্যথা বেজে উঠলেও, হঠাৎ বৃষ্টিতে চটি জামা ভিজে গেলে বেশ বিপত্তিতেই পড়তে হয়। এ কারণে বাদলা দিনে পোশাক আশাক পরতে হয় একটু বুঝে শুনে।
গাঢ় রঙ-ই সঙ্গী হোক
‘আজ বৃষ্টির রঙ হয়ে যাবে নীল, আর আকাশের রঙটা ছাই’ সত্যি, বৃষ্টির কথা ভাবলে নীল রঙটাই চোখে ভেসে ওঠে আগে। আর মেঘলা আকাশ সে তো ছাই রঙেই ছেয়ে থাকে। বর্ষার প্রকৃতির সঙ্গে মিল রেখে পোশাকে নিয়ে আসুন নীল আর ছাই রঙের মিশেল, বেশ ফ্যাশনেবল দেখাবে। যেহেতু বাদল দিনে রাস্তায় জল কাদার একটা ব্যাপার থাকে, তাই পোশাকের রঙ গাঢ় হওয়াই শ্রেয়। নীলের বিভিন্ন শেড, সি গ্রিন, জলপাই সবুজ, গাঢ় সবুজ, বাদামি, এসব রঙ বেছে নিতে পারেন। বর্ষার দিনে সাদা ও কালো রঙ একটু এড়িয়ে চলাই ভালো। সাদা কাপড়ে কাদা মাটির দাগ সহজে ধরা পড়ে, আর কালো কাপড় পানিতে ভিজে গেলে তাতে ছোপ ছোপ ভাব দেখায়। তবে যে রঙের পোশাকই ব্যবহার করুন, রঙের স্থায়িত্বের দিকে নজর রাখুন। এমন কাপড় পরার ঝুঁকি নেবেন না, যা ভিজলেই রঙ ওঠে।
কাপড় বাছুন বুঝেশুনে
বর্ষাকালে পোশাকের তন্তু এমন হতে হবে, যা ভিজলে সহজে শুকিয়ে যাবে। জর্জেট, ক্রেপ জর্জেট, সিল্ক, শিফন, তসর সিল্ক এ ধরনের কাপড় ভিজলেও খুব একটা বোঝা যায় না আর সহজে শুকিয়ে যায়। এসব পোশাকে দাগ লাগলেও পরিষ্কার করা সহজ। এ সময় সুতির মতো ভারী কাপড় এড়িয়ে চলুন, কারণ সুতির কাপড় ভিজলে শুকাতে সময় বেশি লাগে। বর্ষায় বৃষ্টি থাকলেও মাঝে মাঝে আবহাওয়া থাকে প্রচণ্ড গরম। সে জন্য চাইলে বেছে নিতে পারেন মলমল কটন। মলমল কাপড় সুতির চেয়ে বেশি আরামদায়ক আবার ভিজলেও শুকিয়ে যায়।
চাই কম দৈর্ঘ্যরে পোশাক
বৃষ্টির দিনে পোশাকের ঝুল একটু কম হওয়াই ভালো। পথেঘাটে কাদা পানি লেগে যাওয়ার ভয় থাকবে কম। এ সময় লম্বা কামিজ এড়িয়ে চলুন। পরিবর্তে ব্যবহার করুন শর্ট কাফতান, ফতুয়া, কুর্তি ইত্যাদি। ছিমছাম ধরনের কো অরদ সেট পরতে পারেন। ঢোলা শার্ট, টি-শার্ট ও টপ হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। পোশাকে লেয়ারিং স্টাইল বর্ষাকালে ভীষণ উপযোগী। টি-শার্টের ওপর সিল্ক বা ক্রেপ সিল্কের তৈরি কটি ব্যবহার করতে পারেন। ভিজে গেলেও গন্তব্য স্থলে পৌঁছে চাইলে কটি খুলে রাখতে পারবেন। আবার দেখতেও স্টাইলিশ দেখাবে।
গাঢ় রঙের বোটম পার্ট
পোশাকের টপ বা কামিজ যেমন বর্ষা দিনে কম ঝুলের হওয়া ভালো, তেমন বোটম বা নিচের অংশ গাঢ় রঙের হওয়া বর্ষা ফ্যাশনের আরেক মন্ত্র। ঢোলা ধরনের পাজামা বা প্লাজর পরিবর্তে এ সময় একটু চাপা প্যান্ট ব্যবহার করুন। কালো, নেভি ব্লু, গাঢ় বাদামি এসব রঙের লেঙ্গিংস বা সিগারেট প্যান্ট ব্যবহার করতে পারেন। এতে ভিজলেও দ্রুত শুকিয়ে যাবে। কাদার দাগ লাগলেও তা সহজে ধরা পড়বে না।
শাড়ির বেলায় বিশেষ নজর
বৃষ্টির দিন বলেই যে শাড়ি পরা যাবে না এমন কিন্তু নয়। তবে এ ক্ষেত্রে একটু বুদ্ধি করে শাড়ি বাছাই করুন। আগেই বলেছি সুতি কাপড় ভিজলে শুকাতে সময় লাগে। তাই বেছে নিন ছাপা নকশার জর্জেট, সিল্ক, শিফন, সাটিন এসব শাড়ি। এগুলো ভিজে গেলেও গায়ে লেপটে থাকবে না আবার বাতাসে দ্রুত শুকিয়ে যাবে। জামদানি শাড়ি না পরাই ভালো। ভিজলে এই শাড়ি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এই আবহাওয়ায় দেশীয় রাজশাহী সিল্ক সবচেয়ে উপযোগী।
চেষ্টা করুন গাঢ় রঙের ব্লাউজ পরিধান করতে। ব্লাউজের ক্ষেত্রেও সিল্ক, সাটিন ধরনের কাপড় বেছে নিন।
পোশাকের কাটিং ফিটিং
বৃষ্টির দিনে স্কিন টাইট বা বডি হাগিং পোশাক না পরাই ভালো। আচমকা ভিজে গেলে এগুলো আপনার অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। আবার ভারী জমকালো এমব্রয়ডায়রি করা পোশাকও এড়িয়ে চলা উচিত। কেননা এগুলো শুকোতে দেরি হয়। খুব বেশি ঢোলা বা খুব বেশি টাইট কোনো ফিটিংই এ সময় ভালো হবে না। তাই উচিত মাঝারি ধরনের ফিটিংযুক্ত পোশাক পরা। কামিজ একটু ঢোলা ধরনের বেছে নিতে পারেন যেন বাতাস চলাচল করতে পারে। এর সঙ্গে নিতে পারেন সিগারেট বা সোজা কাটিংয়ের প্যান্ট। খুব বেশি ফ্লেয়ার বা ঘের দেওয়া পোশাক বাদ দিন এ সময়ে। বেছে নিন মিডি ধরনের পোশাক ফ্রক, স্কারট টপ ইত্যাদি।
ডেনিমও হতে পারে বন্ধু
বৃষ্টির ঋতুতে আরামের চিন্তা করলে ডেনিম আপনার প্রথম পছন্দ না হলেও এটি কিন্তু বেশ সুবিধাজনক। কাদা পানিতে এই তন্তুর প্যান্ট পরলে সহজেই গুটিয়ে নিতে পারবেন, আবার কাদা মাটির দাগও এতে সহজে বোঝা যায় না। শক্ত ধরনের কাপড় হওয়ায় সহজে এটি নষ্টও হয় না। আবার যে কোনো পোশাকের সঙ্গেই বেশ ফ্যাশনেবল লাগে। তবে এ ঋতুতে ডেনিমের পোশাক খুব ঘন ঘন ধোয়া উচিত নয়। যেহেতু বর্ষাকালে আর্দ্র পরিবেশের কারণে কাপড় দ্রুত শুকায় না, তাই ঘন ঘন ধুলে ফেব্রিকের বুনন দুর্বল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
জুতা যেমন হওয়া চাই
বর্ষায় প্লাস্টিক বা নন লেদার মেটেরিয়ালের জুতা পরুন। বর্ষায় স্পেশাল বিভিন্ন স্টাইলের প্লাস্টিকের জুতা পেয়ে যাবেন বিভিন্ন দোকানে। স্লিপার পরতে হলে পেছনে ফিতা রয়েছে এমন স্লিপার পরুন, যেন কাদা ছিটে না ওঠে। হাই হিল, পেনসিল হিল এড়িয়ে চলুন। পা ঢাকা জুতাও পরতে পারেন, তবে তা এমন হতে হবে যেন সহজে শুকিয়ে যায়।
বর্ষায় পোশাকের যত্ন
বৃষ্টিতে পোশাকে কাদা লাগলে সঙ্গে সঙ্গে ডিটারজেন্টে ব্যবহার না করে প্রথমে কাদা লাগা স্থানগুলো ধুয়ে নিন। এরপর পুরো কাপড় আলাদাভাবে ডিটারজেন্ট দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। এর ফলে পুরো কাপড়ে দাগ লাগবে না। যে কোনো রঙের কাপড় ভিজে গেলে ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে যেন তাতে দাগ না পড়ে।
বর্ষায় কাপড় শুকাতে সময় লাগে বেশি, কারণ বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকে। তবুও ভালোভাবে কাপড় শুকানো দরকার। তা না হলে কাপড় নষ্ট হতে পারে। কাপড় ভালো করে শুকানোর পর ইস্ত্রি করে নিন। বৃষ্টির দিনে নিয়মিত আলমারিতে রাখা কাপড় রোদে দিতে হবে। এতে কাপড়ের মধ্যে থাকা গুমোট গন্ধ কেটে যাবে। আলমারিতে কাপড় রাখার সময় কাপড়ের ফাঁকে ফাঁকে ন্যাপথলিন ব্যবহার করুন। এটা কাপড়কে ছত্রাক থেকে বাঁচিয়ে রাখবে, সুরক্ষিত রাখবে। এতে কাপড় ভালো থাকবে।
সঙ্গে রাখা চাই
পোশাক যত ভেবেই পরুন না কেন, এ সময় সঙ্গে অবশ্যই ছাতা বা রেইন কোট রাখুন। সঙ্গের ব্যাগটি যেন পানিরোধী হয়। প্রয়োজনে সঙ্গে একটি অতিরিক্ত পোশাক এবং জুতা রাখুন। যেন ভিজে গেলেও বদলে নিতে পারেন। প্রসাধন সামগ্রীও যেন পানিরোধী হয় সে খেয়াল রাখা চাই।
আষাঢ়ের হঠাৎ বৃষ্টি মাঝে মাঝে একটু ঝামেলার মনে হলেও, বুঝে শুনে পোশাক নির্বাচন করলে প্রাণ জুড়ানো বৃষ্টিকে আর ঝামেলা বলে মনে হবে না। একটু চিন্তা করে পোশাক পরলেই বর্ষাযাপন হবে ঝামেলা মুক্ত, আবার ফ্যাশনেবল। বর্ষার ধারাস্নান আপনার জীবনে কল্যাণ বয়ে আনুক।
