একটি জঙ্গি গোষ্ঠীকে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হচ্ছে তো গজিয়ে উঠছে আরেকটি। একটি সংগঠনকে নিষিদ্ধ করা হচ্ছে তো অন্য নামে সক্রিয় হয়ে উঠছে জঙ্গিরা। অর্থাৎ গত দুই দশকের বেশি সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে জঙ্গিরা ছত্রভঙ্গ হলেও তাদের তৎপরতা থেমে নেই।
হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশ (হুজিবি), জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) পর নব্য জেএমবি সক্রিয়া ছিল। তাদের তৎপরতার মধ্যে আনসারুল্লাহ বাংলাদেশ টিমের আবির্ভাব। সংগঠনটি নিষিদ্ধ হলে আনসার আল ইসলাম নামে সক্রিয়া হয় জঙ্গি গোষ্ঠী। কিংবা সাম্প্রতিককালে জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া বা শাহাদাত নামে জঙ্গিরাও এখনো তৎপর।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই গুলশানের হলি আর্টিসান বেকারি ও রেস্টুরেন্টে নব্য জেএমবির ভয়াবহ সেই হামলার আট বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০১৬ সালের ১ জুলাই হলি আর্টিসান রেস্টুরেন্টে হামলার ঘটনা ঘটে। জঙ্গিরা গলা কেটে ও গুলি করে ১৭ বিদেশিসহ ২০ জনকে হত্যা করে। এ ঘটনায় দেশ-বিদেশে তোলপাড় শুরু হয়।
বিদেশি জঙ্গি গোষ্ঠীর সঙ্গে বাংলাদেশের জঙ্গিদের যোগাযোগ থাকার বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে। এরপর জঙ্গিদের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযান চালায় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। অভিযানের সময় এনকাউন্টারে একাধিক শীর্ষ জঙ্গিনেতা মারা যান। গ্রেপ্তার করা হয় অনেককে। তারপরও জঙ্গিদের তৎপরতা এখনো আছে বলে নিশ্চিত হয়েছে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। তাদের মধ্য কেউ কেউ দেশের বাইরে থেকেও সংগঠনের কর্মকা- চালাচ্ছেন বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে।
পুলিশের তথ্যানুযায়ী, সংগঠনগুলোর জঙ্গি অর্থায়ন কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না। বিদেশ থেকে আসছে মোটা অঙ্কের অর্থ। ব্যাংকিং, নন-ব্যাংকিং চ্যানেলে নিয়মিতই আসছে এ অর্থ। মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে জঙ্গিবাদ সংশ্লিষ্ট অর্থ লেনদেনের প্রমাণও পেয়েছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো। যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব, কুয়েত ও মালয়েশিয়া থেকে জঙ্গিদের কাছে বিপুল পরিমাণ টাকা আসার বিষয়ে তথ্য পেয়েছে পুলিশ।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সম্প্রতি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আমরা কঠোর অবস্থানে। এখনো জঙ্গিরা নিয়ন্ত্রণে এসেছে তা বলা যাবে না। তবে জঙ্গি নির্মূলে আমরা চেষ্টা করছি।’
তিনি বলেন, গোয়েন্দা তথ্য মতে, জঙ্গিদের আক্রমণাত্মক হওয়ার সামর্থ্য নেই। জঙ্গিরা চাইলেও হলি আর্টিসানের মতো সন্ত্রাসী তৎপরতা আর চালাতে পারবে না। তাদের মোকাবিলায় র্যাব-পুলিশ যথেষ্ট সক্ষমতা রাখে।
পুলিশ সূত্র জানায়, জঙ্গিদের বিষয়ে আরও কঠোর হতে গত সপ্তাহে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ইউনিটপ্রধান, রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার পুলিশ সুপারদের কাছে বিশেষ নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। আত্মগোপনে থাকা জঙ্গিরা যাতে দেশের বাইরে যেতে না পারে, সেজন্য দেশের সবকটি বিমানবন্দর ও সীমান্তবর্তী এলাকায় কড়াকড়ি আরোপ করতে বলা হয়েছে। নতুন জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া ও শাহাদাতের ব্যানারে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে বলে নির্দেশনায় বলা হয়েছে।
তদন্তকারী সংস্থাগুলো নিশ্চিত হয়েছে যে, গোপন তৎপরতার মাধ্যমে তরুণদের মগজধোলাই করছে শীর্ষ জঙ্গিনেতারা। এই মুহূর্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে পলাতক জঙ্গিদের নিয়ে। সংগঠনের মতাদর্শে বিশ্বাসী হয়ে কেউ কেউ হিজরতের নামে বাড়িঘর ছেড়ে যাচ্ছে।
এই প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা গতকাল রবিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, জঙ্গিরা সবসময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি তীক্ষè দৃষ্টি রাখে। জঙ্গিরা সুযোগ বুঝে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে। নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনগুলোর বাইরে কিছু নতুন সংগঠন গড়ে উঠেছে। ওরা সাংগঠনিক কাজে বাধা পেলে পাল্টা আঘাত করার টার্গেট নিয়ে কাজ করে থাকে। তাদের মধ্যে অনেকে পাহাড়ি অঞ্চলে ঘাপটি মেরে থাকে। কিছুদিন আগে শাহাদাত নামে নতুন একটি সংগঠনের সক্রিয় সদস্য ইসমাইল হোসেন, জিহাদ হোসেন ওরফে হুজাইফা ও আমিনুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে বেশ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে, এটা উদ্বেগজনক। গ্রেপ্তারকৃতরা একসময় আনসার আল ইসলামের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তারা আফগানিস্তানে তালেবানের উত্থানে উদ্বুদ্ধ এবং আল কায়েদা মতাদর্শে বিশ্বাসী বলে স্বীকার করেছেন। তারা মাদ্রাসার ছাত্রদের টার্গেট করে ‘জঙ্গি আদর্শে’ অনুপ্রাণিত করছেন।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, জঙ্গি সংগঠনগুলোর ব্যাকআপ টিমও আছে। যারা ঘর থেকে বের হয়ে যাচ্ছে তাদের জঙ্গিরা তিন ভাগে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। প্রথমে তাদের পাহাড়ের ক্যাম্পে শারীরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। দ্বিতীয় ধাপে যুদ্ধ কৌশল ডামি অস্ত্র দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। শেষ ধাপে প্যাট্রোলিং শেখানো হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানায়, জঙ্গিরা প্রকাশ্যে আসারও চেষ্টা করছে। জেএমবি, নব্য জেএমবি, হুজি, হিযবুত তাহরীর, আনসারউল্লাহ বাংলা টিমসহ অন্য জঙ্গি সংগঠনগুলোর অন্তত পাঁচ শতাধিক জঙ্গি জামিনে মুক্তি পেয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। তাদের মধ্যে জেএমবি, হুজি ও হিযবুত তাহরীরের সদস্য সংখ্যাই বেশি। অনেকেই জামিনের পর আর আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন না। আবার কেউ কেউ দেশের বাইরে পালিয়ে গেছেন। দেশি ও আন্তর্জাতিক চক্রের সহায়তা নিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা ফের সক্রিয় হয়ে উঠছে বলে তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা। ইতিমধ্যে পুলিশ ও র্যাব একটি তালিকা তৈরি করেছে। আবার পুরনো জঙ্গিরা প্রায় কয়েক বছর ধরেই লুট, ছিনতাই ও ডাকাতির মাধ্যমে অর্থ জোগাড় করছে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি ডাকাতি ঘটনা ঘটিয়ে বিপুল অঙ্কের টাকা লুট করেছে তারা। তারা অনলাইনেও সদস্য সংগ্রহ করছে।
বর্তমানে নব্য জেএমবির তৎপরতা আছে। পাশাপাশি আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি), হিযবুত তাহরীরও এখনো সক্রিয় আছে। জঙ্গি সদস্যরা কোনো বড় হামলা চালানোর আগে বাড়ি থেকে ‘হিজরত’ করেন। হলি আর্টিসান হামলার আগেও তারা হিজরত করেছিলেন। ওই সময়ের হিজরতকারীরা ছিলেন মূলত নব্য জেএমবির সদস্য। সাম্প্রতিককালে যারা হিজরত করছেন, তারা আনসার আল ইসলামের সদস্য।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার ও কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘হিজরতকারীদের আমরা নিয়মিতভাবে খুঁজে বের করছি। সিটিটিসি প্রতি মাসেই দুয়েকজনকে বের করে। যারা প্রাথমিক অবস্থায় থাকে তাদের বুঝিয়ে আমরা পরিবারের কাছে হস্তান্তর করি। নিজের এবং পরিবারের নিরাপত্তার কারণে আমরা এগুলো প্রকাশ করি না।’
র্যাবের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, জামিন নিয়ে অনেক জঙ্গি পালিয়ে আছে। তবে বড় ধরনের কোনো ঘটনা ঘটানোর সামর্থ্য নেই তাদের।
এ কর্মকর্তা বলেন, ‘জামিনে বের হওয়া জঙ্গিদের নিয়ে আমরা একটু দুশ্চিন্তায় আছি। তারা আদালতে নিয়মিত হাজিরা দেওয়ার কথা থাকলেও তা করছে না। তাদের মধ্যে অনেকেই দেশের বাইরে পালিয়ে গেছে বলে আমাদের কাছ তথ্য আছে।’
