ছোট্ট দেশ উরুগুয়ে কেন ফুটবলে এত সফল?

আপডেট : ০১ জুলাই ২০২৪, ০৩:৪৯ পিএম

ছোট্ট দেশ উরুগুয়ে কেন ফুটবলে এত সফল? দক্ষিণ আমেরিকার দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ, জনসংখ্যা মাত্র ৩৪ লাখ, জিডিপি মন্টানার চেয়েও কম। এই দেশটির কেউ কখনো নোবেল পুরস্কার পায়নি। কিন্তু ফুটবলে এই ছোট্ট দেশটি কীভাবে টেক্কা দিচ্ছে অন্যদের? ব্রাজিলের চেয়েও বেশি কোপা আমেরিকা জিতেছে তারা। ইংল্যান্ডের চেয়ে বেশি বিশ্বকাপও আছে তাদের ঝুলিতে। কিন্তু কী এর রহস্য?

উরুগুয়ের দুই প্রজন্মের দুই ফুটবলার দিয়েগো রোসি আর নিকোলাস লোডেইরো এই রহস্যভেদ করার চেষ্টা করেছেন। দুজনের মাঝে রসি উঠে এসেছেন উরুগুয়ের রাজধানী মন্তেভিদেও থেকে। অন্যদিকে জাতীয় দলের মিডফিল্ডার লোডেইরো সীমান্তবর্তী শহর পায়াসান্দু থেকে। ‘ইয়াহু স্পোর্টস’কে লোডেই রো জানান, খুব ছোট বয়স থেকেই বাচ্চাদের ফুটবলে উৎসাহিত করা হয়। লোডেইরো প্রথম ফুটবল উপহার পেয়েছিলেন ২ বছর বয়সে। ওইটুকু বয়সে বল নিয়ে বাড়ির আশেপাশে ছোটাছুটি করতে করতেই খেলাটির প্রতি ভালোবাসা জন্মে। দিয়েগো রসি।

বাড়ির আশেপাশে মাঠ না থাকলে ফাঁকা রাস্তায় বল পায়ে দেখা যায় শিশুদের। এরপর বয়স পাঁচ বছর হতেই তারা উরুগুয়ের বিখ্যাত ‘বেবি ফুটবল’ সিস্টেমের আওতায় চলে আসে এবং তাদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পায়। প্রতি সপ্তাহে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সপ্তাহ শেষে আয়োজন করা হয় ম্যাচের। এই পর্যায় থেকেই তাদেরকে প্রতিযোগিতাও শেখানো হয়। আয়োজন করা হয়ে ক্ষুদেদের ফুটবল লিগ।

ওইটুকু বয়সেই শিশুরা মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বীতা সম্পর্কে ধারণা পেয়ে যায়। এই শিশুরা বড় হওয়ার সাথে সাথে স্থানীয় শিশু-কিশোরদের ফুটবল ক্লাবগুলো তাদেরকে ডেকে নেয়। সেখান থেকে ধাপে ধাপে আঞ্চলিক দল, একাডেমি, জাতীয় যুবদল পেরিয়ে একজন ফুটবলার জাতীয় দলের হয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পা রাখে। 

উরুগুয়ের আর্জেন্টাইন কোচ মার্সেলো বিয়েলসা গত সপ্তাহেই বলেছেন, “এটা সত্যিই দুর্দান্ত, খুবই সুচিন্তিত এবং সুসংগঠিত ফুটবল কাঠামো, যা পুরো দেশজুড়ে আছে। ফুটবলটা তাদের জিনে ঢুকে গেছে। এ কারণেই উরুগুয়ে এলিট ফুটবলার তৈরি করতে পারে।” 

এ কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের থেকে ১০০ গুণ কম জনসংখ্যা এবং ৩৫৮ গুণ ছোট জিডিপি নিয়েও তারা দিয়েগো ফোরলান, লুইস সুয়ারেজ, এডিনসন কাভানি, ডারউইন নুনেজ, ফেদেরিকো ভালভার্দেসহ দুর্দান্ত সব ফুটবলার উপহার দিয়েছে উরুগুয়ে।

১৮ শতকের শেষদিকে ইউরোপিয়ান অভিবাসীদের মাধ্যমে ল্যাটিন আমেরিকার দেশটিতে ফুটবলের আগমন ঘটে। তখন অবশ্য ফুটবল ছিল মধ্যবিত্ত আর উচ্চবিত্তদের খেলা। কিন্তু উনিশ শতকের গোড়ার দিকে উরুগুয়ের ব্যাপক সামাজিক সংস্কারের মাধ্যমে এটি জনসাধারণের খেলা হয়ে ওঠে। এরপর ১৯২৪ সালে তারা ফুটবল দিয়েই গোটা বিশ্বকে চমকে দেয়। নিকোলাস লোডেইরো

ওই বছর প্যারিস অলিম্পিক্সে অংশ নেয় উরুগুয়ের ফুটবল দল। গেমসে অংশগ্রহণের খরচ জোগাতে তখনকার উরুগুয়ে ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি ও রাজনীতিবিদ আতিলিও নারাসিও তার বাড়ি বন্ধক রেখেছিলেন! ফ্রান্সে যাওয়ার জন্য নিজের জাহাজ দিয়েছিলেন। এরপর গেমসে গিয়ে শৈল্পিক ফুটবলে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয় উরুগুয়ে। প্রথম দফাতেই জিতে নেয় স্বর্ণপদক। সেই থেকে উরুগুয়ের ফুটবলের অগ্রযাত্রা শুরু হয়।

উরুগুয়ের শিশুদের ৮৫ শতাংশই এখন ফুটবল খেলে। তারা সুয়ারেস, কাভানিদের মতো ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখে। ফুটবল এখন উরুগুয়ের সংস্কৃতির অংশ। দেশটিতে ৯টি জোনে ভাগ হয়ে ৬০টিরও বেশি শিশুদের লিগ হয়। এমনকী প্রত্যন্ত শহরগুলোতেও ফুটবল দল আছে।

রসি জানান, তার শহর মন্তেভিদেওতে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক বাস করে। শিশুরা এখানে ফুটবলের মাঝেই বেড়ে ওঠে। ক্লাবগুলো সেরা ফুটবলারদের বেছে নেয় এবং বিভিন্ন লিগ খেলার জন্য নির্বাচিত করে। এই দল সপ্তাহের শেষে পাশের শহর এবং বিভিন্ন রাজ্যে সফর করে। পেশাদার ক্লাবগুলো মিনি টুর্নামেন্টে অংশ নেয়। রসি জানান, উরুগুয়েতে প্রতিভার অবমূল্যায়নের ঘটনা খুবই বিরল। বয়স ১৩ হলেই দেশের শীর্ষ ফুটবল একাডেমিগুলোতে সুযোগ পায় কিশোর-কিশোরীরা। ধাপে ধাপে গঠিত এই পাইপলাইন দিয়েই উরুগুয়ের জাতীয় দল সমৃদ্ধ হয়। দুর্দান্ত সব ফুটবলার উঠে আসে। ফুটবলটা আসলে উরুগুইয়ানদের রক্তে মিশে গেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত