ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর দলের ভরাডুবি ও উগ্র দক্ষিণপন্থি শিবিরের জয় হয়েছে। মাখোঁর আচমকা আগাম সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণার চালে কাজ হয়নি। গত রবিবার প্রথমপর্যায়ে প্রায় ৩৩ শতাংশ ভোট পেয়ে উগ্র দক্ষিণপন্থি আরএন দল আবার ভালো ফল করেছে। তবে কোনো শিবির সরাসরি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় দ্বিতীয় পর্যায়ে আবার ভোটগ্রহণ হবে। এই পরিস্থিতিতে উগ্র দক্ষিণপন্থি শক্তির উত্থান রুখতে বাকি দলগুলো মতবিরোধ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভোটারদের সামনে উপস্থিত হয়েছে, যেমনটা ইতিহাসে আগেও দেখা গেছে। দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসে প্রেসিডেন্ট ও সংসদ নির্বাচনে এই দ্বিতীয় সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে আসছে বাকি দলগুলো। অন্যদিকে ইউরোপের কয়েকটি পপুলিস্ট দল মিলে আরও সংঘবদ্ধ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
মাখোঁর মধ্যপন্থি শিবির ও বাম দলগুলোর জোট আগামী ৭ জুলাই দ্বিতীয় পর্যায়ের ভোটের জন্য সোমবার রণকৌশল স্থিরের তোড়জোড় শুরু করেছে। প্রথমপর্যায়ের ভোটে বাম শিবির দ্বিতীয় ও মাখোঁর শিবির তৃতীয় স্থান দখল করেছে। ফল প্রকাশের পর মাখোঁ উগ্র দক্ষিণপন্থিদের বিরুদ্ধে ব্যাপক গণতান্ত্রিক জোট গড়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যার মধ্যে দ্বিতীয় পর্যায়ের ভোট থেকে মনোনয়ন প্রত্যাহারের সুযোগ ছিল। ইতিমধ্যে মধ্যপন্থি ও বাম শিবিরের দেড় শতাধিক প্রার্থী সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে এএফপি জানিয়েছে।
ভোটারদের উদ্দেশে দ্বিতীয়পর্যায়েও জোরালো সমর্থনের আহ্বান জানিয়েছে আরএন দল। কাক্সিক্ষত ফল পেলে ফ্রান্সের আধুনিক ইতিহাসে এই প্রথম কোনো উগ্র দক্ষিণপন্থি দল ক্ষমতায় আসবে। অন্যদিকে মাখোঁ ২০২৭ পর্যন্ত নিজের কার্যকাল শেষ করতে চাইলে তাকে এমন এক সরকারের সঙ্গে কাজ করতে হবে। আগাম নির্বাচন ডাকার কারণে তার বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। আগামী রবিবার আরএন চূড়ান্ত সাফল্য পেলে তার পদত্যাগের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।
ফ্রান্সে এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে। জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবক বলেছেন, ফ্রান্সে চরম দক্ষিণপন্থিদের সাফল্যই উদ্বেগের কারণ। তার মতে, আরএন দল ইউরোপকে সমাধানের বদলে সমস্যা হিসেবে দেখে। পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টুস্কের মতে, এই ফল ফ্রান্স ও ইউরোপের জন্য ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক’। ইতালির চরম দক্ষিণপন্থি প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি ও হাঙ্গেরির উগ্র জাতীয়তাবাদী প্রধানমন্ত্রী আবার ফ্রান্সের নির্বাচনের ফলকে স্বাগত জানিয়েছেন।
এ ছাড়া ফ্রান্সে রবিবার সন্ধ্যায় ফল ঘোষণার পর বিভিন্ন শহরে উগ্র ডানপন্থি এনআরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে রাস্তায় নামে হাজারো মানুষ। অনেক ফরাসিই এমন ফলে হতাশ। ৩৩ বছর বয়সী শিক্ষক নাজিয়া খালদি রয়টার্সকে বলেন, তিনি বিক্ষোভে অভ্যস্ত নন। কিন্তু বিতৃষ্ণা, দুঃখ ও ভয়ের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে যোগ দিয়েছেন। আগামী ৭ জুলাই দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচন শেষ না হুয়া পর্যন্ত সংসদের ৫৭৭টি আসন কীভাবে ভাগ হবে, তা জানা যাবে না। ভোটের ফলাফলে আরএনের আবারও জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলেও দলটি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নাও পেতে পারে।
এদিকে ফ্রান্সে আরআন দলের বিপুল সাফল্যের মাঝেই ইউরোপের কয়েকটি পপুলিস্ট দল মিলে আরও সংঘবদ্ধ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবান ইইউ স্তরে পপুলিস্ট দলগুলোর এক নতুন জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। হাঙ্গেরি, অস্ট্রিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্রের পপুলিস্ট দলগুলো নিয়ে জোট গড়েছেন তিনি। ইউরোপীয় পার্লামেন্টে এই তিনটি দল মিলে একটি নতুন চরম দক্ষিণপন্থি গ্রুপ গঠন করবে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টে আপাতত চরম দক্ষিণপন্থি শক্তির মধ্যে ঐক্যের অভাব রয়েছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টে সংসদীয় গোষ্ঠীর স্বীকৃতি পেতে হলে ওরবানের জোটকে কমপক্ষে আরও চারটি দেশের দলকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ১৬ জুলাই সদ্য নির্বাচিত সদস্যরা প্রথম অধিবেশনে উপস্থিত থাকবেন। তার আগেই ওরবানের জোট আরও দলকে আকর্ষণ করার আশা করছে।
