সমাধান দূরে সমস্যা ঘনীভূত

বৃহত্তর ছাত্র আন্দোলনে রূপ পাচ্ছে ‘কোটা’

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২৪, ০৪:৩৬ এএম

সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা বাতিল করে ২০১৮ সালে জারি করা পরিপত্র পুনর্বহালের দাবিতে চার দিন ধরে আন্দোলনে থাকা শিক্ষার্থীদের চোখ ছিল আপিল বিভাগের দিকে। তবে আপিল বিভাগে শুনানি না হওয়ায় মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে হাইকোর্টের রায়ই আপাতত বহাল থাকছে। এ ঘটনায় শিক্ষার্থীরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। এ আন্দোলন শিগগিরই যে থামছে না, তার প্রতিফলনও ঘটল তাদের ক্ষোভের মধ্য দিয়ে। কর্মসূচির ঘোষণার মধ্যে দিয়ে বোঝা গেল শিক্ষার্থীদের আন্দোলন বড় আকার নিতে যাচ্ছে।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, আপস নয় বরং সংগ্রামের পথ বেছে নেবেন তারা। ইতিমধ্যে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ডাক দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

২০১৮ সাল পর্যন্ত দেশে সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ কোটা প্রচলিত ছিল। পরে টানা আন্দোলনের জেরে পুরো কোটাব্যবস্থাই বাতিল করে দেয় সরকার। আন্দোলনকারীরা চেয়েছিলেন, ৫৬ শতাংশ কোটা বরাদ্দকে ১০-এ নামিয়ে আনা হোক। ২০২১ সালে সেই কোটাব্যবস্থা বাতিলের পরিপত্রের মুক্তিযোদ্ধাদের অংশটি চ্যালেঞ্জ করে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান উচ্চ আদালতে একটি রিট আবেদন করেন। সেই রিটের রায়ে গত ৫ জুন পরিপত্রের ওই অংশ অবৈধ ঘোষণা করে আদালত।

হাইকোর্টের রায়ের পর থেকে শিক্ষার্থীরা সরকারের জারি করা সেই পরিপত্র পুনর্বহালের দাবিতে মাঠে নামেন। গত সোমবার থেকে টানা আন্দোলন করছেন তারা। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো হচ্ছে ২০১৮ সালের পরিপত্র বহাল সাপেক্ষে কমিশন গঠন করে দ্রুত সময়ের মধ্যে সরকারি চাকরিতে (সব গ্রেডে) অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক কোটা বাদ দিতে হবে এবং সংবিধান অনুযায়ী কেবল অনগ্রসর ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনা করতে হবে। সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় কোটা সুবিধা একাধিকবার ব্যবহার করা যাবে না এবং কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে শূন্য পদগুলোতে মেধা অনুযায়ী নিয়োগ দিতে হবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার চতুর্থ দিনের মতো কর্মসূচি পালন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। বেশ কয়েকটি স্থানে সড়ক-মহাসড়ক ও রেললাইন অবরোধও করা হয়েছে।

গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মসূচি থেকে জানানো হয়েছে, বৃহত্তর কর্মসূচির অংশ হিসেবে শুক্রবার অনলাইন এবং অফলাইনে চার দফা দাবির ভিত্তিতে সারা দেশে জনসংযোগ ও সমন্বয় করা হবে। শনিবার বেলা ৩টায় সব বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজ থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হবে এবং আগামী রবিবার সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ক্লাস পরীক্ষা বর্জন করে ধর্মঘট করবেন শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীদের পক্ষে কর্মসূচি ঘোষণা করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমরা হাইকোর্টের বিরুদ্ধে না। তারা নিজেদের মতো কাজ করে যাবে। আমরা আন্দোলনের মাধ্যমে আমাদের দাবি আদায় করে ঘরে ফিরব।’

আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়কারী হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘সরকার কোটা চায় না, প্রশাসন কোটা চায় না, শিক্ষকরা কোটা চান না, বিশ্ববিদ্যালয় কোটা চায় না, তাহলে কোটা চায় কে? সরকার যেখানে কোটাপদ্ধতি বাতিল করেছে, সেখানে কোন অদৃশ্য শক্তিবলে এই কোটা বহাল করা হয়? আমরা এই অদৃশ্য শক্তির হাত গুঁড়িয়ে দেব।’

হাইকোর্টের রায় স্থগিত হয়নি : কোটাপদ্ধতি বাতিলের পরিপত্রের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন সরকারি চাকরিপ্রার্থী ময়মনসিংহের ফুলপুরের অহিদুল ইসলামসহ সাতজন। শুনানি নিয়ে ২০২১ সালের ৭ ডিসেম্বর ওই পরিপত্রের বৈধতা প্রশ্নে রুল দেয় হাইকোর্ট। গত ৫ জুন চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে রুল যথাযথ ঘোষণা করে রায় দেয় হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ।

সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা তখন জানিয়েছিলেন, এ রায়ের ফলে সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের ক্ষেত্রে নবম থেকে ১৩তম গ্রেডে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা থাকার বিধান বহাল থাকবে। পরে হাইকোর্টের এ রায় স্থগিত চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার আদালতে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ।

গত ৯ জুন চেম্বার আদালত আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে বিষয়টির ওপর শুনানি করতে ৪ জুলাই (গতকাল) দিন ধার্য করে। এর ধারাবাহিকতায় এটি শুনানিতে আসে।

রিটকারী পক্ষে অ্যাডভোকেট অন রেকর্ড জহিরুল ইসলাম আদালতের উদ্দেশে বলেন, এ মামলায় জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী শুনানি করবেন। তিনি দেশের বাইরে আছেন। এজন্য সময়ের আবেদন করেন তিনি।

অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন সংশ্লিষ্ট মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়ে বলেন, ‘২০১৮ সালে কোটাপদ্ধতি সংশোধন করে সরকার পরিপত্র জারি করেছিল। হাইকোর্ট এটি বাতিল করেছে।’

হাইকোর্টের রায় নিয়ে চেম্বার আদালত কী আদেশ দিয়েছিল জানতে চান প্রধান বিচারপতি। অ্যাডভোকেট অন রেকর্ড বলেন, ‘আজ (গতকাল) ফুল বেঞ্চে শুনানির জন্য রেখেছিলেন।’

প্রধান বিচারপতি এ সময় বলেন, ‘নট টুডে (আজ নয়)। আপনারা (অ্যাটর্নি জেনারেল) সিপি (লিভ টু আপিল) ফাইল করেন।’

এএম আমিন উদ্দিন বলেন, ‘এখনো হাইকোর্টের রায় পাইনি।’ প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘পেয়ে যাবেন।’

এ সময় প্রধান বিচারপতি অ্যাটর্নি জেনারেলের উদ্দেশে বলেন, ‘এত আন্দোলন কীসের?’ অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘কোটা বাতিল নিয়ে অনেকেই আন্দোলন করছেন।’ প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আন্দোলন করে কি হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্টের রায় পরিবর্তন করবেন?’ অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘না না, বিষয়টি এমন নয়।’

রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অবরোধ : পরিপত্র পুনর্বহালের দাবিতে টানা ছয় ঘণ্টা শাহবাগ অবরোধ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সন্ধ্যা ৬টায় বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করে অবরোধ তুলে নিলে যানজট স্বাভাবিক হয়। এর আগে সকাল থেকেই শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে শাহবাগ থেকে সায়েন্সল্যাব, ফার্মগেট, পল্টনমুখী যান চলাচল বন্ধ ছিল। আগারগাঁও মোড় অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

রাজধানী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন সড়ক ও মহাসড়ক অবরোধ করেন আন্দোলনকারীরা। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক অবরোধ করে সমাবেশ করেন এবং বই পুড়িয়ে কোটাপদ্ধতি বাতিলের দাবি জানান। পরে উপাচার্য মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়ার সঙ্গে আলোচনা শেষে বিকেল ৫টার দিকে শিক্ষার্থীরা অবরোধ প্রত্যাহার করে নেন। অবরোধের কারণে বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কের দুই প্রান্তে অসংখ্য যাত্রী ও পণ্যবাহী যান আটকা পড়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্যারিস রোড থেকে শুরু করে মেইনগেটসংলগ্ন রাজশাহী-নাটোর সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন করেন। টানা তৃতীয় দিন ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ফের আবদুল জব্বার মোড়সংলগ্ন রেললাইনে ট্রেন অবরোধ করেন। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিকেল সাড়ে ৪টা থেকে দুই ঘণ্টা নগরীর জিরো পয়েন্ট অবরোধ করে রাখেন।

ছাত্রলীগের বাধার অভিযোগ : শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ঢাবি ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্য সেন হল, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলসহ বিভিন্ন হলে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যেতে হল ছাত্রলীগের পদপ্রত্যাশীরা বাধা দিয়েছেন। সূর্য সেন হলের মূল ফটক বন্ধ করে দেন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। পরে বাইরে থেকে কোটাবিরোধী আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা গিয়ে ফটক খুলে তাদের আন্দোলনে নিয়ে আসেন। এ সময় ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বাগ্বিতণ্ডা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফরিদ বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা যাতে হল থেকে বেরোতে না পারেন, তাই সতর্ক অবস্থানে আছি।’ জহুরুল হক হলের প্রধান ফটকের সামনে দুই সারি চেয়ার নিয়ে অবস্থান করছিলেন তিনিসহ কয়েকজন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতা জানান, তাদের ওপর নির্দেশ আছে শিক্ষার্থীরা যাতে আন্দোলনে না যেতে পারেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ সভাপতি মাজহারুল কবির শয়ন দেশ রূপান্তরকে বলেন, শিক্ষার্থীদের আটকানোর কোনো নির্দেশনা নেই। কারা সেখানে অবস্থান নিচ্ছেন, তারা দেখছেন।

দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটাবিরোধী আন্দোলন ঠেকাতে প্রকাশ্যে মিছিল ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে শাখা ছাত্রলীগ।

পাশে নেই ছাত্র সংগঠনগুলো : আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ছাত্র সংগঠনগুলো শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়া নিয়ে সরব হওয়ার কথা থাকলেও, তারা কেউই কোটা আন্দোলনে সমর্থন দিচ্ছে না। বরং কর্মসূচিতে বাধা দেওয়ারই অভিযোগ উঠেছে সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ছাত্র সংগঠনগুলো এখন ছাত্রদের জন্য কাজ করে না, ছাত্রদের পক্ষে লড়াই করে না। তারা আশা করেছিলেন ছাত্রনেতারা তাদের সমর্থন জানাবেন।

শিক্ষার্থীদের কোটা আন্দোলনের বিষয়ে মন্তব্য নিতে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও কথা বলতে রাজি হননি বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসাইন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। তবে ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক বলছেন, কোটা আন্দোলনকারীদের প্রতি তাদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।

শিক্ষকদের সমর্থন : শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছে শিক্ষকদের একটি অংশ। সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা পুনর্বহাল হওয়ায় উদ্বেগ জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সংগঠন ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইউট্যাব)। আন্দোলনে সমর্থন জানিয়ে ইউট্যাব বলেছে, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশে কোটা কখনই মেধার বিকল্প হতে পারে না। কোটাব্যবস্থা বাতিলের দাবিতে যে আন্দোলন করছেন, তা শুধু প্রাসঙ্গিক নয়, অত্যন্ত ন্যায্য ও যৌক্তিক। রাজপথে গিয়ে সরাসরি শিক্ষার্থীদের সমর্থন জানিয়ে আসছেন ঢাবির ফিন্যান্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। কোটা যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসার দাবি জানিয়েছেন অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক সাইফুল ইসলাম।

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক, সংশ্লিষ্ট জেলা-উপজেলা ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিরা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত