মহররমের ফজিলত ও তাৎপর্য

আপডেট : ১২ জুলাই ২০২৪, ০৬:৩৫ এএম

আরবি বর্ষপঞ্জিকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতের পুণ্যময় স্মৃতি। তাই যুগ যুগ ধরে মুসলমানদের কাছে হিজরি সন অনেক গুরুত্ব বহন করে আসছে। মহান আল্লাহর অপার কৃপায় আমরা আরবি ১৪৪৫ হিজরি শেষ করে ১৪৪৬ হিজরি বর্ষে প্রবেশ করার সুযোগ পেয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ, মুসলমানদের রোজা, হজ, ঈদ ও কোরবানিসহ ইসলামের বিভিন্ন বিধিবিধান হিজরি সনের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বর্তমান সময়ে তা কেবল রমজান, ঈদ, কোরবানি ও হজের হিসাব রাখার মধ্যেই যেন সীমিত। আমাদের সন্তানদের বেশিরভাগই তা জানে না যে, হিজরি সন কী আর আরবি মাসগুলোর নামই বা কী?

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই হিজরি সনের শুভ সূচনা হয়। ইসলামি সন তথা হিজরি সন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মক্কা থেকে মদিনা হিজরতের ঐতিহাসিক তাৎপর্যময় ঘটনার অবিস্মরণীয় স্মারক।

হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম। এটি সম্মানিত ৪ মাসের একটি। আল্লাহর গণনায় মাস ১২টি। এ ১২ মাসের মধ্যে সম্মানিত হারাম মাস ৪টি। যে মাসগুলোতে যাবতীয় যুদ্ধ-বিগ্রহ ও রক্তপাতকে মহান আল্লাহ হারাম ঘোষণা করেছেন। তন্মধ্যে মহররম একটি। এটি হিজরি বছরের প্রথম মাস। যা হজরত ওসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর প্রস্তাবনায় হিজরি বছরের প্রথম মাস হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়। এ মাস সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, নিশ্চয় আসমানসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাস বারোটি। তন্মধ্যে চারটি সম্মানিত। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান। সুতরাং এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি অত্যাচার করো না। (সুরা তওবা আয়াত ৩৬) মর্যাদার মাস মহররম। এ মাসের মর্যাদা, ফজিলত ও তাৎপর্য ঘোষণায় হাদিসে অনেক বর্ণনা রয়েছে। যার কিছু তুলে ধরা হলো।

হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররমের রোজা। আর ফরজ নামাজের পর সর্বোত্তম নামাজ হলো রাতের নামাজ। (সহিহ মুসলিম) হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, জাহেলি যুগে কুরাইশরা আশুরার রোজা পালন করত। এরপর হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় এসে নিজে আশুরার রোজা রাখলেন এবং সাহাবিদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু যখন রমজানের রোজা ফরজ হলো তখন তা পরিত্যাগ করা হলো। যার ইচ্ছা রাখত, যার ইচ্ছা রাখত না। (সহিহ বুখারি)

হজরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনা আগমন করার পর দেখলেন, সেখানকার ইহুদিরা আশুরার দিন রোজা পালন করছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কীসের রোজা রাখো? তারা বলল, এটি একটি কল্যাণময় দিন। এ দিন বনি ইসরাইলকে মহান আল্লাহ তাদের শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। তাই মুসা আলাইহিস সালাম এ দিন রোজা পালন করেছিলেন। তাই আমরাও মুসা আলাইহিস সালামের অনুসরণে এ দিনটিতে রোজা পালন করি। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমি তোমাদের চেয়ে মুসা (আ.)-কে অনুসরণ করার বেশি হকদার। এরপর তিনি এ দিন রোজা রাখলেন এবং সাহাবিদের রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন। (সহিহ মুসলিম)

হজরত আবু মুসা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইহুদিরা আশুরার দিনকে ঈদ মনে করত। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, অতএব তোমরা এ দিন রোজা রাখো। (সহিহ মুসলিম) হজরত হুমাইদ বিন আবদুর রহমান হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহুকে হজের বছর আশুরার দিন মিম্বারের উঠে বক্তব্য দিতে শুনেছি। তিনি বলেছেন, হে মদিনাবাসী, তোমাদের আলেমগণ কোথায়? আমি হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, আজ আশুরার দিন। আল্লাহ এ দিন রোজা রাখা ফরজ করেননি। কিন্তু আমি রোজা রেখেছি। অতএব তোমাদের কেউ চাইলে রোজা রাখতে পারে, নাও রাখতে পারে। (সহিহ মুসলিম)

হজরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রমজান মাস ছাড়া এই আশুরার দিনের ওপর অগ্রাধিকার দিয়ে এত গুরুত্ব সহকারে অন্য কোনো দিন রোজা পালন করতে দেখিনি। (সহিহ বুখারি) হজরত রুবাই বিনতে মুআউওয়াজ রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আশুরার দিন সকাল বেলা আনসারদের মহল্লায় মহল্লায় এ ঘোষণা দেওয়ার জন্য লোক পাঠালেন যে, যে ব্যক্তি রোজা রাখেনি সে যেন দিনের বাকি অংশ রোজা অবস্থায় থাকে আর যে রোজা রেখেছে সে যেন রোজা পূর্ণ করে। রুবাই রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আমরা নিজেরা রোজা রাখতাম এবং আমাদের বাচ্চাদের রোজা রাখাতাম। আর তাদের জন্য রঙিন পশম দ্বারা খেলনা বানিয়ে রাখতাম। কেউ কান্নাকাটি করলে সেটা তাকে দিতাম যেন ইফতারের সময় পর্যন্ত রোজা অবস্থায় থাকে। (সহিহ মুসলিম)

হজরত আবু কাতাদা রাদিয়াল্লাহু আনহু হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করে বলেন, আরাফার দিন রোজা রাখলে আল্লাহর কাছে আশা করি যে, তিনি এর বিনিময়ে আগের ও পরের এক বছরের গুনাহ মোচন করে দেন। আর আশুরার দিন রোজা রাখলে আল্লাহর কাছে আশা করি যে, তিনি এর বিনিময়ে পূর্বের এক বছরের গুনাহ মোচন করবেন।

(সহিহ মুসলিম)

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, জাহেলি জামানার লোকেরা আশুরার দিন রোজা পালন করত। রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং মুসলমানগণও এ দিন রোজা পালন করতেন। পরবর্তী সময় রমজানের রোজা ফরজ হলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আশুরার দিন আল্লাহর দিনগুলোর মধ্য থেকে একটি দিন। যার ইচ্ছা সে এ দিন রোজা রাখতে পারে আর যার ইচ্ছা রোজা বাদও দিতে পারে।

(সহিহ মুসলিম)

হজরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন আশুরার দিন রোজা রাখলেন এবং অন্যদের রাখার জন্য আদেশ করলেন তখন সাহাবিগণ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! এ দিনটিকে তো ইহুদিরা সম্মান করে। তিনি বললেন, ইনশাআল্লাহ আমি আগামী বছর নয় তারিখেও রোজা রাখব। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, তিনি বলেছেন, আগামীতে বেঁচে থাকলে নয় তারিখেও রোজা রাখব। (সহিহ মুসলিম)

হজরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আশুরার দিন রোজা রাখো এবং এ ক্ষেত্রে ইহুদিদের বিরোধিতা করে এর আগের দিন বা পরের দিন রোজা রাখো। (মুসনাদ আহমদ) আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে হিজরি বছরের প্রতি যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা দেখানোর তাওফিক দান করুন। মহররমে বেশি বেশি নফল ইবাদত ও আশুরায় রোজা রাখার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : আলেম ও গবেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত