গ্রীষ্মের তাপপ্রবাহের পর এবার বৃষ্টিতে ভাসছে দেশ। আবহাওয়াবিদরা এই পরিস্থিতিকে এল নিনো কাটিয়ে লা নিনায় প্রবেশের প্রভাব বলছেন। আর এমন আবহাওয়া এবারের বর্ষা মৌসুমের পুরোটাই বিরাজ করবে। মূলত মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় বর্ষার দৈর্ঘ বাড়বে। আর মৌসুমি বায়ু বেশিদিন সক্রিয় থাকলে বৃষ্টি হবে।
কিন্তু বৃষ্টি হলে দেশের কোন এলাকায় হবে, কত দিন হবে, এল নিনো কাটিয়ে লা নিনায় প্রবেশ করলে তার প্রভাবে কী হয় এমন অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আবহাওয়া অধিদপ্তর ও আবহাওয়া বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের।
দেশ এখন লা নিনায় প্রভাব বলয়ে প্রবেশ করেছে জানিয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা গত গ্রীষ্মে এল নিনোর প্রভাবে দেশজুড়ে তাপপ্রবাহ পেয়েছি। এল নিনো কেটে গিয়ে নিউট্রাল (আবহাওয়া সূচকের শূন্যরেখা। শূন্যরেখার বাঁ দিকে গেলে এল নিনো এবং ডান দিকে গেলে লা নিনা শুরু হয়) অবস্থানের পর লা নিনা শুরু হয়েছে। আর এর প্রভাবে ভারতীয় উপমহাদেশে এবার বৃষ্টি বেশি হবে। কিছুদিন ধরে চলমান বর্ষা এরই প্রতিফলন।’
এল নিনোর ক্ষেত্রে প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার অস্ট্রেলিয়া প্রান্ত থেকে সমুদ্রের উষ্ণ স্রোত ভারত মহাসাগরের দিকে আসার কারণে গরমের তীব্রতা বেড়ে গিয়েছিল বলে আবহাওয়াবিদরা ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। কিন্তু লা নিনার ক্ষেত্রে কী ঘটে, এই প্রশ্নের জবাবে আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক সমরেন্দ্র কর্মকার বলেন, ‘দক্ষিণ আমেরিকার পেরু উপকূল থেকে একটি উষ্ণ স্রোত ভারত মহাসাগরের দিকে আসে। এটি বঙ্গোপসাগর এলাকায় আসার পর আগে থেকে বহমান মৌসুমি বায়ুর সঙ্গে মিশে গিয়ে মৌসুমি বায়ুকে সক্রিয় করে এবং এর প্রভাবে বৃষ্টিপাত বেড়ে যায়।’
মৌসুমি বায়ু সক্রিয় হওয়ার কথা স্বীকার করে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ওমর ফারুক বলেন, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় হওয়ার আগে দেশের উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টিপাত বেশি হয়েছিল। কিন্তু এখন দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এলাকায় বেশি বৃষ্টি হচ্ছে। এ ছাড়া আগামীতেও এ এলাকায় বেশি বৃষ্টি হবে। এ ছাড়া দেশের মধ্যাঞ্চল ও অন্যান্য এলাকায়ও স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টি হবে।
ওমর ফারুকের বক্তব্যের সঠিকতা পাওয়া যায় গতকাল সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার বৃষ্টিপাতের উপাত্তে। এই সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সন্দ্বীপে ১৮৮ মিলিমিটার, সীতাকু-ে ৯২ মিলিমিটার, কক্সবাজারে ৮৬ মিলিমিটার ও টেকনাফে ৮২ মিলিমিটার। এ ছাড়া দেশের মধ্যাঞ্চল ঢাকায় ১৩১ মিলিমিটার, টাঙ্গাইলে ১০৮ মিলিমিটার ও উত্তরাঞ্চলের রাজশাহীতে ১৩৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে।
এ বিষয়ে আবহাওয়াবিদ ওমর ফারুক বলেন, ‘বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে বেশি বৃষ্টি হচ্ছে। তবে আগামীকাল রবিবারের পর থেকে দেশজুড়ে বৃষ্টির মাত্রা কিছুটা কমে আসবে।’
তবে এল নিনো বা লা নিনা যা-ই হোক না কেন স্থানীয় আবহাওয়াই এ ক্ষেত্রে প্রধান ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে বলে জানান অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আশরাফ দেওয়ান। তিনি বলেন, এল নিনোর প্রভাবে কোনো এলাকায় যেমন গরমের তীব্রতা বাড়ে আবার এর উল্টোটাও ঘটে। একইভাবে লা নিনার প্রভাবে আমাদের এলাকায় যেমন এখন বৃষ্টি বেশি হচ্ছে আবার আমেরিকাসহ কোথাও কোথাও গরমও বেশি পড়ে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় আবহাওয়া প্রধান ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দক্ষিণ আমেরিকার পেরু ও ইকুয়েডর উপকূল থেকে আসা বায়ুপ্রবাহ আটলান্টিক হয়ে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে থাকে; অর্থাৎ এল নিনোর পুরো উল্টো গতিপথ। এ কারণে আমাদের দেশে এখন তুলনামূলকভাবে বেশি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। তবে এতে শহরে পানি জমছে ড্রেনেজব্যবস্থার অভাবের কারণে।’
এদিকে চলতি মাসের দীর্ঘমেয়াদি আবহাওয়ার পূর্বাভাসেও স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।
