বরিশালের আমেনা বেগম (৩০)। ওমানে যাওয়ার জন্য গতকাল সোমবার দুপুর ২টার দিকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যান। অথচ তার ফ্লাইট ছিল গতকাল রাত ১০টায়। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সহিংসতার মধ্যে দেশে কারফিউ জারি করা হয়েছে। ফলে রাজধানীসহ জেলা শহরগুলোর গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চেকপোস্ট বসিয়েছে। এদিকে কারফিউর মধ্যেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। ফলে মানুষ জরুরি কাজ ছাড়া বাড়ির বাইরে বের হচ্ছে না।
কিন্তু আমেনা বেগম ফ্লাইট ধরার জন্য আতঙ্কের মধ্যেও ৫ বছরের ছেলে ও ১০ বছরের মেয়েকে নিয়ে বিমানবন্দরে এসেছেন। সঙ্গে নিয়ে এসেছেন বড় ভাইকে। বিমানবন্দরের এক নম্বর টার্মিনালের সামনে তার ১০ বছরের মেয়েকে দাঁড়িয়ে ব্যাগের ওপরে মাথা দিয়ে ঘুমাতে দেখা গেছে। আর ৫ বছরের ছেলেকে কোলে ঘুম পাড়াচ্ছেন আমেনা বেগম। তাদের চোখেমুখে উৎকণ্ঠার ছাপ দেখা গেছে। কারণ, চলমান পরিস্থিতিতে ফ্লাইট বাতিল হলে তাদের ভোগান্তিতে পড়তে হবে।
নির্দিষ্ট সময়ের আগে বিমানবন্দরে আসার কারণ জানতে চাইলে আমেনা বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশে এই পরিস্থিতিতে ভয় নিয়ে প্রাইভেট কার ভাড়া করে বিমানবন্দরে এসেছি। রাস্তায় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর চেকপোস্টে দাঁড় করিয়ে কাগজপত্র দেখে ছেড়ে দিয়েছে। আবার অনেক জায়গায় মানুষ ঢাকায় না যেতে ভয় দেখিয়েছে। দুপুর ২টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত এভাবেই বসে থাকতে হবে।’
গতকাল সোমবার ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ঘুরে দেখা গেছে, বিদেশগামী অধিকাংশ মানুষ ফ্লাইটের নির্ধারিত সময়ের এক দিন কিংবা দুদিন আগে বিমানবন্দরে ভিড় করছে। তাদের সঙ্গে আত্মীয়স্বজনদেরও দেখা গেছে। তারা বিমানবন্দরের টার্মিনালগুলোর সামনে শুয়ে কিংবা বসে আছেন। কারণ বিদেশগামী যাত্রীরা দেশের চলমান পরিস্থিতিতে বিমানবন্দরকেই নিরাপদ ভাবছেন। তাই কষ্ট হলেও তারা রাতে বিমানবন্দরেই কাটাবেন বলে জানিয়েছেন। এমনই একজন আশিক। চাঁদপুর থেকে এক দিন আগেই বিমানবন্দরে এসেছেন। বিমানবন্দরের এক নম্বর টার্মিনালের সামনে শুয়ে আছেন। তাকে বিমানবন্দরের প্রবাসীকল্যাণ ডেস্কের সহকারী পরিচালক রাতে কোথায় থাকবেন তা জিজ্ঞেস করেন। তখন আশিক জানান, তিনি বিমানবন্দরেই থাকবেন। কারণ রাতে হোটেলে থাকা তিনি নিরাপদ মনে করছেন না। আশিকের মতো অনেকেই বিমানবন্দরে ভিড় করছেন। যাদের ফ্লাইট আজ হওয়ার কথা।
প্রবাসী কামাল পারভেজ থাকেন টাঙ্গাইলের সখীপুরে। নির্মাণশ্রমিক হিসেবে পাঁচ বছর ধরে কাজ করেন সিঙ্গাপুরে। দুই মাস আগে এসেছিলেন দেশে। গতকাল রাত ১০টায় তার ফ্লাইট। কিন্তু বিমানবন্দরে এসে হাজির হয়েছেন সকাল ১০টায়। বাড়ি থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন ফজরের সময়। একটি মাইক্রোবাস ভাড়া করে ঢাকা উদ্দেশে রওনা হন তিনি। কিন্তু আশুলিয়া পর্যন্ত আসতেই আর এগোতে চাইল না চালক। পরে সিএনজি নিয়ে বিমানবন্দরে পৌঁছান।
বেলা দেড়টায় রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কামাল পারভেজের সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের। দেশের সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে বাসা থেকে সময় নিয়ে বের হয়েছি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঢাকায় আসতে অতিরিক্ত তিন হাজার টাকা গুনতে হয়েছে। আর রাস্তায় অনেক ভোগান্তি হয়েছে। তিন জায়গায় আটকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘গাজীপুরের চৌরাস্তায় দেশে ফেরত এক প্রবাসী ভাইকে মাইক্রোবাস থেকে নামিয়ে লাঠিপেটা করেছে পুলিশ। এটা দেখে আমার চালক আশুলিয়া পর্যন্ত এসে আর এগোতে চায় না। পরে আমি সিএনজি দিয়ে আসি।’
কামাল বলেন, ‘সকাল ১০টায় বিমানবন্দরে এসে পৌঁছাই। আমাকে প্রায় ১২ ঘণ্টা এখানে থাকতে হবে। এখন পর্যন্ত কোনো ফ্লাইট বিলম্বের খবর পাইনি। আমি যথাসময়ে যেতে পারব।’
এ বিষয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসীকল্যাণ ডেস্কের সহকারী পরিচালক দেবব্রত ঘোষ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আজ কোনো ফ্লাইট বাতিল করা হয়নি। তবে কিছু ফ্লাইট বিলম্ব হয়েছে। বিমানবন্দরে আসা যাত্রীদের অধিকাংশই ফ্লাইটের নির্ধারিত সময়ের আগে এসেছেন। রাস্তায় অসুবিধা হতে পারে, তাই তারা আগে এসেছেন বলে জানাচ্ছেন। আমরা তাদের পাশে আছি। তাদের সহযোগিতার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করা হচ্ছে।’
