বাইডেনের সরে দাঁড়ানো ডেমোক্র্যাটদের জন্য কি আশীর্বাদ?

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৪, ১২:১৩ এএম

অবশেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যুগের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। নিজ দল ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে বিপুল বিরোধিতার মুখে বাইডেন ঘোষণা করেছেন যে, তিনি আর নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে মার্কিন ডেমোক্র্যাটরা যেন আপাত একটি রাজনৈতিক সংকটের সমাধান খুঁজে পেল।

প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে যাওয়ার পর কয়েকজন মার্কিন নাগরিকের অভিমত জানতে চেয়েছিল বিবিসি, যাদের মধ্যে কেউ কেউ বাইডেনের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন, আবার কেউ এতে দুঃখ পেয়েছেন। অনেকে মনে করেছেন এতে মার্কিনিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাদের মতে, বিতর্কে জয়ী হওয়া আর মার্কিন প্রশাসন পরিচালনা করা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।

এর আগে এবারের নির্বাচনের প্রথম প্রেসিডেন্টশিয়াল বিতর্কে ডোনাল্ট ট্রাম্পের বিপরীতে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের নিষ্প্রভ পারফরমেন্সের সূত্র ধরে ডেমোক্র্যাট নেতারা প্রকাশ্যেই বাইডেনকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন, যাদের মধ্যে প্রভাবশালী ডেমোক্র্যাট মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের সাবেক স্পিকার ন্যান্সি পেলোসিও ছিলেন। গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, পেলোসি ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় নভেম্বরের নির্বাচনে বাইডেন বিজয়ী হতে পারবেন না, এমন মতামত প্রকাশ করেছিলেন। শুরুতে প্রেসিডেন্ট বাইডেন প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়াতে অস্বীকৃতি জানালেও কিন্তু ধীরে ধীরে দলের মধ্য থেকে চাপ বাড়তে থাকায় এক প্রকার বাধ্য হয়েই নভেম্বরে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করার ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি তার ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসকে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে সমর্থন দিয়েছেন।

তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে যাওয়ার পর ডেমোক্র্যাটরা প্রেসিডেন্ট বাইডেনের শাসনামলকে গ্লোরিফাই করার চেষ্টা করছে। কেউ কেউ বলছেন বাইডেন নিজের থেকে দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছেন। ডেমোক্র্যাটরা নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজেদের ঐক্যবদ্ধ করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। অনেক ডেমোক্র্যাটরা একে নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলার সুযোগ হিসেবে দেখছেন। ডেমোক্র্যাটরা বাইডেনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য বিতর্কে ভালো করতে না পারা, তার স্বাস্থ্যগত ও বয়সজনিত সীমাবদ্ধতাকেই সামনে নিয়ে আসছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, প্রেসিডেন্ট বাইডেন প্রশাসনের বিভিন্ন নীতি নিয়ে যে ডেমোক্র্যাট শিবিরেই বিভক্তি চরম আকার ধারণ করেছিল।

তার শাসনামলে বিশ্বব্যাপী দুটি বড় ঘটনা, একটি ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান ও ইসরায়েলের ওপর হামাসের হামলার সূত্র ধরে ফিলিস্তিনিদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ইসরায়েলি গণহত্যা। উভয় ঘটনাই মার্কিনিদের জীবনযাত্রায় প্রভাব বিস্তার করেছে ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে বিভক্তি বাড়িয়েছে। ইউক্রেন ও রাশিয়া যুদ্ধে বাইডেন ছিলেন ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় সমর্থক, যুদ্ধে ইউক্রেনকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার সহযোগিতা করেছেন, ন্যাটোকে শক্তিশালী করেছেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউরোপীয় দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা পৃথিবীতে অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা বাড়িয়েছে। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের ইসরায়েল নীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের একটি বড় অংশকে বিক্ষুব্ধ করেছে। পররাষ্ট্রনীতির কারণে ইসরায়েলিরা বাইডেনকে একজন সত্যিকার বন্ধু হিসেবে মনে করে। বাইডেন নিজেও একজন জায়ানবাদী হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে রেডলাইনের কথা বললেও নীরবে ইসরায়েলে ধারাবাহিক মারণাস্ত্র সরবরাহ করে গেছেন। তার এই নীতির প্রভাবে প্রগতিশীল মার্কিন নতুন প্রজন্মের ভোটার, আরব আমেরিকান ভোটার, মুসলিম ভোটার ও অন্যান্য অভিবাসী ভোটাররা, যারা মূলত ডেমোক্র্যাটিক পার্টিকে সমর্থন দিয়ে থাকে তারা সমর্থনের বিষয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলেন। আর এই ভোটারদের সমর্থন ছাড়া নির্বাচনে সুইং স্টেটগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে বিজয় অসম্ভব। এই ভোটারদের পুনরায় ডেমোক্র্যাট নির্বাচনী ক্যাম্পেইনে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য নতুন প্রার্থী বাছাই ছাড়া ডেমোক্র্যাটদের সামনে কোনো বিকল্প ছিল না।

ইতিমধ্যে মার্কিন প্রভাবশালী ডেমোক্র্যাট গভর্নররা, সাবেক স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি ও হিলারি ক্লিনটন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিসেবে কমলা হ্যারিসকে সমর্থন দিয়েছেন। মনে করা হচ্ছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পকে মোকাবিলায় কমলা হ্যারিস অপেক্ষাকৃত প্রগতিশীল ও ভালো প্রার্থী বিশেষ করে গর্ভপাতের অধিকার, অভিবাসন ও ফিলিস্তিনিদের ইস্যুতে। প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তিনি নারী ভোটার, অভিবাসী কমিউনিটি, মুসলিম ভোটার ও নতুন ভোটারদের ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে নিয়ে আসতে পারবেন।

সব মিলিয়ে নির্বাচন থেকে বাইডেনের সরে যাওয়া যেন প্রত্যাশিতই ছিল, যেমনটা প্রথম বিতর্কের পর আঁচ করতে পেরেছিলেন প্রতিদ্বন্দ্বী ডোনাল্ট ট্রাম্প। তবে কমলা হ্যারিস সত্যিকারের ভালো বিকল্প কিনা তা নিয়ে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে বিকর্ত আছে। ডেমোক্র্যাট সংশ্লিষ্ট থিংক ট্যাঙ্ক ও ঘনিষ্ঠ মিডিয়া হঠাৎ করে কমলা হ্যারিসকে একজন ভালো প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছে, যদিও গত চার বছরে মার্কিন অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে তার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক আছে। 

আগামী ১৯ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে হবে ডেমোক্র্যাটিক দলের জাতীয় সম্মেলন, সেখানেই চূড়ান্ত হতে পারে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী। অন্যদিকে মাত্র রিপাবলিকান সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। এই সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে রিপাবলিকানদের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হয়। এই সম্মেলনে রিপাবলিকানরা ঐক্যবদ্ধভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জয়ী করার ব্যাপারে নিজেদের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। পেনসিলভেনিয়ান নির্বাচনী প্রচারাভিযানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর হত্যাচেষ্টার পর রিপাবলিকানরা আরও বেশি শক্তিশালী হয়েছে, এমন একটি ধারণা আছে।  

চার বছর আগে জো বাইডেন রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে ডেমোক্র্যাটদের ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছিলেন, ডেমোক্র্যাটরাও তাকে রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে অবতার হিসেবে পেয়েছিলেন। তবে তার শাসনামলে ট্রাম্প আমলের সীমাবদ্ধতাগুলো তিনি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। ফলে তাকে নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করার থেকে সর্বদা ব্যস্ত থাকতে হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির বিপরীতে উদ্যোগ নিতে। যেমন আমরা দেখেছি ন্যাটোকে নিয়ে ও গণতন্ত্র সম্মেলনকে ঘিরে। তার এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর মাধ্যমে ৮১ বছর বয়সে এক বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের আপাত সমাপ্ত ঘটতে যাচ্ছে, তবে তার এই সিদ্ধান্ত আসছে নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন কিনা তাই এখন দেখার বিষয়।

লেখক : উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত