র্যাব-৭ এর চান্দগাঁও ক্যাম্পের মেসে চাকরি করে ১৪ বছরের সুজন। দুই ভাই, দুই বোনের মধ্যে সে ছোট। তাই আদরের কোনো কমতি নেই তার। গতকাল শনিবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অর্থোপেডিক বিভাগের ৭৯ নম্বর ওয়ার্ডের তিন নম্বর শয্যায় গিয়ে দেখা যায় যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। তার ডান পায়ের হাঁটু ভেদ করে বেরিয়ে গেছে গুলি। ঘটনার বিস্তারিত জানতে চাওয়ার পর কেঁদে ওঠেন পাশে বসে থাকা মা নূর নাহার বেগম। বলেন, স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করে আমাকে আর চার সন্তানসহ একা ফেলে চলে যায়। সে থেকে আমি আমার এই চার সন্তানকে মানুষের ঘরে কাজ করে বড় করেছি। আমার এই ছেলে মাস চারেক আগে র্যাব ৭-এর একটি মেসে চাকরি নেয়। সেখানে থাকত। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার কোটা সংস্কারের দাবিতে যখন আন্দোলন চলছিল তখন আমাকে দেখতে আসবে বলে মেস থেকে খাজা রোডের দিকে রওনা দেয়। ওই সময় হঠাৎ তার ডান পায়ে গুলি লেগে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
পাশে থাকা সুজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি জানতাম না রাস্তায় ঝামেলা হচ্ছে। বহদ্দারহাট বড় পুকুর পাড়ের দিকে আসতে আমার পায়ে কিছু একটা লেগেছে বুঝতে পারি। নিচে তাকাতেই দেখি আমার পা দিয়ে রক্ত ঝরছে। সঙ্গে সঙ্গে আমাকে সেখানে উপস্থিত কিছু মানুষ তুলে বাসায় নিয়ে আসে। বাসায় আসার পর আম্মা আমাকে হাসপাতালে নিতে চাইলে পথে কোনো গাড়ি পায়নি। চারদিকে রাস্তা বন্ধ থাকায় আমাকে হাসপাতালে আনতে প্রায় সন্ধ্যা হয়। এরপর থেকে এই ওয়ার্ডে চিকিৎসা চলছে। কবে আবার নিজের পায়ে হাঁটব জানি না।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম মেডিকেলের অর্থোপেডিক বিভাগে এখন ৫ জন গুলিবিদ্ধ রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে। তাদের মধ্যে তিন জনের গুলি পা ভেদ করে বেরিয়ে গেছে। দুজনের অস্ত্রোপ্রচার করে গুলি বের করতে হবে।
একই অবস্থা হাসপাতালে কাতরানো গুলিবিদ্ধ হকার আবুল বাশারের। কোটা সংস্কার ইস্যুতে সংঘর্ষের ঘটনায় বাম পায়ের হাঁটুর নিচে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। দেশ রূপান্তরকে বলেন, অক্সিজেন থেকে প্রতিদিন বহদ্দারহাটে ফল বিক্রি করতে আসি। ওই দিনও একই ভাবে এসেছিলাম। কিন্তু ঝামেলা হচ্ছে বুঝতে পেরে চলে যাওয়ার সময় হঠাৎ খেয়াল করলাম বাম পায়ে আর ভর দিয়ে হাঁটতে পারি না। সড়কে পড়ে গেলাম। বাম পা থেকে রক্ত বের হচ্ছে। রাস্তায় শত শত মানুষ ছোটাছুটি করছে। আমাকে দেখে কয়েকজন দৌড়ে এলেও কিছুদূর যাওয়ার পর তারাও আমাকে ফেলে চলে যায়। এরপর সে অবস্থায় আমার মামাকে ফোন দিলে তিনিসহ আরও কয়েকজন এসে আমাকে নিয়ে যান। কিছুক্ষণ পর অচেতন হয়ে যাই। জ্ঞান ফিরে দেখি হাসপাতালে। পাশে বসে থাকা মা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, আমরা কেউ ছিলাম না শহরে। ঘটনার খবর পেয়ে এসে দেখি আমার ছেলের এই অবস্থা। এখন আমার ছেলের ভবিষ্যৎ কী? কীভাবে চলবে তার পরিবার? আমার দুই নাতনির কী হবে? রাতে তারা বাবাকে কাছে না পেয়ে কান্না করছে কিন্তু আমরা তাদের কিছু জানাতে পারি না।
চট্টগ্রামে বহদ্দারহাট মোড়ের সংঘর্ষের ঘটনাসহ কোটা সংস্কার ইস্যুতে গুলিবিদ্ধ বাশারের মতো আরও চারজন চিকিৎসা নিচ্ছেন চট্টগ্রাম মেডিকেলের অর্থোপেডিক ওয়ার্ডে। এর মধ্যে দুজন ছাত্র, এক শিশু ও একজন ইলেক্ট্রিশিয়ান রয়েছে। যাদের কেউ আন্দোলনে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন, কেউ জীবিকার তাগিদে রাস্তায় বের হয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। গতকাল চট্টগ্রাম মেডিকেলের ২৬ ও ৭৯ নম্বর ওয়ার্ড ঘুরে গুলিবিদ্ধ হওয়া এসব মানুষ ও তাদের স্বজনদের মধ্যে এক ধরনের হাহাকার ও চাপা কান্না দেখা যায়।
চট্টগ্রাম কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র জিয়াউল হক। চকরিয়ায় একটি মসজিদের ইমাম রশিদুল্লাহর তৃতীয় সন্তান। চট্টগ্রামের ওয়েল ফুডের কারখানায় কাজ করে নিজের পড়াশুনার খরচ চালান। বহদ্দারহাট এলাকায় ভাইয়ের বাসা থেকে বের হয়ে মূল সড়কে নামতেই গুলিবিদ্ধ হন তিনি। তার বাম পায়ের উরু ভেদ করে বের হয়ে যাওয়া বুলেট ওই অংশের হাড় চূর্ণবিচূর্ণ করে ফেলেছে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ব্যথার সঙ্গে এখন ভয়ও তাড়া করছে। তার মা খুরশিদা বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ছেলে গুলি খেয়েছে শুনে আমার শরীর বরফ হয়ে গিয়েছিল। এই প্রথম আমি চট্টগ্রাম এসেছি। কিন্তু এমনভাবে আসতে হবে জানা ছিল না। তিনি বলেন, আমার ছেলে স্কুলজীবন থেকেই পড়াশোনায় মেধাবী। স্কুলে বৃত্তি পেয়েছে, এসএসসিতে ভালো ফলাফল করে ভর্তি হয়েছে চট্টগ্রাম কলেজে। চাকরি আর কলেজ ছাড়া আমার এই ছেলে কিছু জানে না। একদিকে ছেলের জন্য কষ্ট, অন্যদিকে আশপাশের লোকজন ভয় দেখাচ্ছে। সবাই বলছে সে আন্দোলনে গেছে। তাই এখন পুলিশ মামলা দেবে, হয়রানি করবে। কিন্তু সে বলেছে আন্দোলনে যায়নি। বড় ভাইয়ের বাসা থেকে তার বাসায় যাওয়ার পথে গুলি খেয়েছে।
অর্থোপেডিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মিজানুর রহমান চৌধুরী বলেন, গুলিবিদ্ধ দুজনের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলে অপারেশন করে গুলি বের করা হবে। আর তিন জনের গুলি বেরিয়ে গেছে, তাদের অপারেশন পরে করা হবে। এ ধরনের রোগীদের সুস্থ হতে কম পক্ষে তিন থেকে পাঁচ মাস লাগে। তারপর তাদের নিজ পায়ে হাঁটতে আরও সময় লাগবে।
কাল ঢাকা পৌঁছবে শাফিনের মরদেহ
দীপিকাকে চুমু খেতে চায় ৯৯ শতাংশ মানুষ, সেই অভিনেতাকে বললেন বাবা
আর্জেন্টিনার অভিযোগ নাকচ ফিফার