বিদেশি ঋণ পরিশোধে রেকর্ড ব্যয় ৩৩৬ কোটি ডলার

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২৪, ১২:২১ এএম

বাংলাদেশের ঋণ পরিশোধের চাপ প্রতি বছরই বাড়ছে। সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরে (২০২৩-২৪) বিদেশি ঋণের সুদ ও আসল মিলিয়ে বাংলাদেশকে প্রায় ৩৩৬ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে। ফলে এই প্রথমবারের মতো এক বছরে বিদেশি ঋণ পরিশোধ ৩০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেল। পরিশোধ করা অর্থের মধ্যে আসল ২০১ কোটি ডলার, আর সুদের পরিমাণ প্রায় ১৩৫ কোটি ডলার।

গতকাল রবিবার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) বিদায়ী অর্থবছরের বিদেশি ঋণের হালনাগাদ পরিস্থিতি নিয়ে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করে, তাতে এ তথ্য পাওয়া গেছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এক বছরের ব্যবধানে ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ দুটোই বেশ বেড়েছে। গত অর্থবছরের তুলনায় এই বৃদ্ধি ২৫ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সুদ ও আসল মিলিয়ে ২৬৮ কোটি ডলার পরিশোধ করেছিল বাংলাদেশ।

কয়েক বছর ধরেই বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে। ঋণ পরিশোধ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে গত দুই বছরে। বিদেশি ঋণ পরিশোধের এই চাপ শুরু হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন দেশে দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি মুদ্রার সংকট চলছে। বিদেশি ঋণ পরিশোধ বাবদ অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বাজেটে বাড়তি চাপের সৃষ্টি হচ্ছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, গত অর্থবছরে বিদেশি ঋণের আসল পরিশোধ যে গতিতে বেড়েছে, তার চেয়ে বেশি গতিতে বেড়েছে সুদ বাবদ খরচ। গত অর্থবছরে আগের অর্থবছরের তুলনায় আসল পরিশোধ বেড়েছে ২৮ কোটি ডলার বা ১৬ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আসল পরিশোধ করতে হয়েছিল ১৭৩ কোটি ডলার।

অন্যদিকে এক বছরের ব্যবধানে সুদ পরিশোধ বেড়েছে ৪৫ শতাংশ। গত অর্থবছরে সুদ খাতে অতিরিক্ত খরচ করতে হয়েছে ৪২ কোটি ডলার। ২০২২-২৩ অর্থবছরের সুদ বাবদ ৯৩ কোটি ডলার খরচ করতে হয়েছিল। বিদায়ী অর্থবছরে প্রথমবারের মতো শুধু সুদ বাবদ খরচও এক বিলিয়ন ডলার বা ১০০ কোটি ডলার ছাড়াল।

তবে বিদেশি ঋণ পরিশোধ ব্যয়ের পাশাপাশি ঋণপ্রাপ্তিও প্রত্যাশা অনুযায়ী বেড়েছে। ইআরডির তথ্য অনুসারে, গত অর্থবছরের ৯৮৬ কোটি ডলারের বিদেশি ঋণ এসেছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ছাড় বেড়েছে ৫৫ কোটি ডলার। আগের অর্থবছর, অর্থাৎ ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৯২১ কোটি ডলার ছাড় করেছিল উন্নয়ন সহযোগীরা। এদিকে, গত অর্থবছরে ঋণদাতা সংস্থা ও দেশগুলো ১ হাজার ৭২ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

যদিও ভারত, চীন ও রাশিয়া গত এক বছরে এক ডলারের প্রতিশ্রুতিও দিতে পারেনি। এ তিন দেশ গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের অনেক বড় বড় প্রকল্পের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করে আসছে। তবে এ বছর এ তিন দেশ আগের ঋণের অর্থছাড় দিয়েছে। ভারত প্রায় ৩০ কোটি ডলার, চীন ৩৯ কোটি ডলার ও রাশিয়া ১২৯ কোটি ডলারের বেশি অর্থছাড় করেছে।  বাংলাদেশের পাইপলাইনে এ বছর ১১ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ পড়েছিল।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া তথ্য বলছে, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ ৯৯ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ ডলারপ্রতি মূল্য ১১৮ টাকা করে হিসাব করলে বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ প্রায় ১১ লাখ ৭১ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন জিডিপির তুলনায় প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার ঋণ বেশি না হলেও রাজস্ব আয়, রপ্তানি এবং রেমিট্যান্স না বাড়াতে পারলে এবং বিদেশি ঋণের প্রবাহ কমিয়ে না আনতে পারলে এ ঋণই বিশাল চাপ তৈরি করতে পারে আগামী কয়েক বছরে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কিছু মেগা প্রকল্পের মূল অর্থ পরিশোধ শুরু হবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এবং সেই বছরে ৫৩১ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করার কথা রয়েছে। এরপর ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ৫১৯ মিলিয়ন ডলার এবং ২০২৮-২৯ সালে ৫০৭ মিলিয়ন ডলার শোধ করার আশা করছে সরকার।

সরকারি হিসাবমতে, চলতি অর্থবছরে বিদেশি ঋণ হিসেবে ৪ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার শোধের পরিকল্পনা আছে সরকারের। এরপর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সুদসহ বিদেশি ঋণ পরিশোধের পরিমাণ দাঁড়াবে অন্তত সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলারে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে মূলত ভারত, চীন এবং রাশিয়ার কাছ থেকেই ঋণ নিয়েছে বেশি। এসব প্রকল্প সময়মতো শেষ না করতে পারলে ঋণ আরও বাড়তে পারে।

সব মিলিয়ে একটি দেশের বিদেশি ঋণ হচ্ছে, ওই দেশটি বিভিন্ন দেশ, বিদেশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে যে ঋণ নেয় সেটি। বাংলাদেশ সাধারণত বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ঋণ নিয়ে থাকে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত