বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষায় সুন্দরবনের বাঘ

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২৪, ০৬:৫৮ এএম

ধরুন জীব বৈচিত্র্যের সৌন্দর্যে ভরপুর সুন্দরবনে যদি আপনাকে যাওয়ার প্রস্তাব দিই, তাহলে প্রথমেই আপনার মাথায় আসবে বাঘ দেখার বিষয়টি। সুন্দরবন ভ্রমণে সরাসরি বাঘ দেখতে পাওয়াটা মোটামুটি সৌভাগ্যের বিষয়, কেউ প্রথমবারের ভ্রমণেই দেখে ফেলেন, কেউ ৫ বারে, কেউ ১০ বারে, আবার কেউবা ৩০ বারেও না। খুব বেশি আগের কথা নয়। আজ থেকে ৮০-১০০ বছর আগে, বাংলাদেশ জুড়ে ছিল বাঘের অস্তিত্ব। কিন্তু কালের স্রোতে আজ শুধু সুন্দরবনে টিকে আছে সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ১১৪টি বাঘ। এ ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম আর মৌলভীবাজারের লাঠিটিলায় বাঘের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া গেছে, যদিও তা কালেভদ্রে একেবারে সামান্য। পুরো পৃথিবীতে ১০০ বছর আগেও বাঘ ছিল ১ লাখের বেশি আর এখন মাত্র ৩ হাজার ৯০০। এর মধ্যে ভারতীয় উপমহাদেশের অঞ্চলগুলোতে ৩ হাজার ২০০-এর মতো। বাংলাদেশে সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১১৪টি। কিন্তু এখন বাঘের উপস্থিতি শুধু সুন্দরবনেই। সুন্দরবন বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে ঢালের মতো বাংলাদেশকে রক্ষা করছে আর এর ফলে রক্ষিত হচ্ছে বাংলাদেশের অস্তিত্ব। এই সুন্দরবনকে রক্ষা করে চলেছে বাঘেরা, না হলে তো কবেই উজাড় হয়ে যেত এই বন। তাই বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষায় বাঘের ভূমিকা অনেক।

পৃথিবীর সব অঞ্চলের বাঘ একই প্রজাতির (Panthera tigris) অন্তর্ভুক্ত হলেও এদের মধ্যে বৈচিত্র্য প্রকট। এর কারণ বাঘের উপপ্রজাতির মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত আর গবেষণার ওপর ভিত্তি করে উপপ্রজাতির সংখ্যা নয়টি, যার মধ্যে বিলুপ্ত তিনটি আর টিকে আছে ছয়টি। আমাদের এই অঞ্চলে যে বাঘ পাওয়া যায় তার নাম Bengal Tiger। উপপ্রজাতির নাম হলো Panthera tigris tigris। এটি বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমারে বিস্তৃত। সংখ্যাগত দিক দিয়ে এই উপপ্রজাতিটি সর্বোচ্চ। আইইউসিএনের তথ্যমতে পৃথিবীতে এই বাঘ বিপদাপন্ন এবং বাংলাদেশে মহাবিপদাপন্ন প্রাণী হিসেবে চিহ্নিত। বেঙ্গল টাইগার বাংলাদেশসহ ভারতের জাতীয় পশু। এ ছাড়া বাঘ আমাদের আইকনিক প্রাণী হিসেবে পরিচিত। এটি ফ্লাগশিপ, কিস্টোন, আমবলা প্রাণী নামেও পরিচিত। মানে এ বাঘের সঙ্গে বনের অন্যান্য পরিবেশের সুস্থতা নির্ভর করে। এ বাঘ সুরক্ষিত হলে, ভালো থাকলে বনের পরিবেশ ও প্রতিবেশ ভালো থাকবে। বাঘের সংখ্যার সঙ্গে ওই এলাকার পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থার ভারসাম্য নির্ভর করে।

কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হলো, আমাদের দেশসহ পুরো পৃথিবীতে বাঘের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। ২০১০ সালে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের উপস্থিতিতে বাঘ সংরক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং ১০ বছরের মধ্যে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সেই লক্ষ্যে ২৯ জুলাই মানুষকে সচেতন করার জন্য পুরো বিশ্বে পালিত হচ্ছে বিশ্ব বাঘ দিবস।

বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হলেও বর্তমানে বাঘের সব থেকে বড় সমস্যা অবৈধ চোরা শিকার ও আবাসন ধ্বংস। গত ১০০ বছরে ৯৫ শতাংশ আবাসস্থল নষ্ট হয়েছে বাঘের। সুন্দরবনের বাঘের প্রধান খাদ্য উপাদান হরিণ। পাশাপাশি বানর ও শূকর। প্রায়ই হরিণের চোরাচালানের খবর দেখা যায় পত্রিকার পাতায়, যা বাঘের খাদ্য সংকট এর জন্য দায়ী। গত ২০ বছরে সুন্দরবনের ৪২টি বাঘের মৃত্যুর খবর জানতে পাওয়া গেছে। এ ছাড়া শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকে বাঘের শারীরিক ক্ষতি হয় এবং অনেক সময় শরীরে পচন ধরে, যা কি না বাঘ সংরক্ষণের অন্তরায়।

আজ আপনি যে স্থানে বসে বাঘ নিয়ে এ সংবাদটি পড়ছেন, বেশি দিন নয়, ২০০-২৫০ বছর আগেও হয়তো সেই জায়গাটি ছিল বাঘের আবাসস্থল। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে মানুষের জনসংখ্যা ক্রমাগতই বেড়ে গিয়েছে। যার ফলে মানুষ প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট করে পূরণ করেছে নিজের মৌলিক চাহিদা। ফলস্বরূপ অনেক বন্যপ্রাণী হারিয়েছে তার প্রাকৃতিক আবাসস্থল। আর বড় আকারের বন্যপ্রাণীর সঙ্গে মানুষের তৈরি হয় দ্বন্দ্ব। ফলে মানুষ যেমন আক্রান্ত হয় বন্যপ্রাণী দ্বারা, তেমনি মানুষও মেরে ফেলে বন্যপ্রাণীদের। একপর্যায়ে জয় হয় মানুষের। এভাবেই পুরো বাংলাদেশ থেকে বাঘ নামক প্রাণীটি ধীরে ধীরে শুধু সুন্দরবনের বাসিন্দা হয়ে ওঠে।

প্রথমেই বলেছি, সুন্দরবনের নাম নিলেই প্রথমে মনে পড়ে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের কথা। বাঘ এই বনকে রক্ষা করে আসছে। বাস্তুতন্ত্রের সমতা রক্ষায় বাঘের রয়েছে বিশেষ ভূমিকা। আর বিভিন্ন ঝড়, প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় থেকে সুন্দরবন পুরো বাংলাদেশকে রক্ষা করে আসছে এই সুন্দরবন। এটা আসলেই সত্য, বাঘের ভয়ে সুন্দরবনে মানুষ প্রবেশ করতে ভয় পায়। যার ফলে সুন্দরবন রক্ষা পাচ্ছে বনখেকোদের হাত থেকে। এদিক থেকে বাঘ আমাদের সুন্দরবনের অতন্দ্র প্রহরী। রক্ষা করছে সুন্দরবনের বনভূমি এবং প্রাকৃতিক সম্পদ।

আমরা যদি বাংলাদেশের অন্যান্য বনভূমির দিকে এমনকি উপকূলীয় বনের দিকেও তাকাই, যেমন বরগুনা, নোয়াখালী, ভোলা এলাকার কিংবা পার্বত্য চট্টগ্রামে তাহলে দেখব বিগত সময়গুলোতে বনের একটি অনেক বড় অংশ উজাড় হয়ে গিয়েছে। বিশেষ করে মানুষ বসতি তৈরি করেছে, পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন পারিবেশগুলোকে নষ্ট করছে। তার একটি বড় কারণ হলো, বনগুলো মূলত Empty Forest  বিশেষ করে উপকূল, কারণ সেখানে বড় কোনো বন্যপ্রাণী নেই, যারা আমব্রেলা বা কিস্টোন স্পিসিস হিসেবে কাজ করে। পাশাপাশি ওইসব এলাকায় মানুষের নিয়মিত আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই কোনো বন্যপ্রাণী দ্বারা। আর অদূরদর্শী পর্যটন খাত খুব সহজে ওই এলাকাগুলোতে বিস্তার করছে। ফলে নষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশ। ভোলা বা নোয়াখালী উপকূলে বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ খুব সহজে আক্রান্ত করছে ওই এলাকার জনজীবনকে। চট্টগ্রামের বনে এখনো সংবাদ আসে বাঘের উপস্থিতির, কিন্তু সেটা একেবারে কম। ফলস্বরূপ, পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্বত্র বিচরণ আজ মানুষের। বিভিন্ন এলাকায় মানুষের বনভূমির ওপর নির্ভরশীলতা দিন দিন বাড়ছে ও তৈরি হচ্ছে স্থাপনা। বাঘের অনুপস্থিতি আজ মানুষকে করে দিয়েছে এমন সুযোগ।

ঠিক সুন্দরবন থেকে যদি বাঘ হারায়, সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য অনেকটাই বিনষ্ট হবে, হরিণের সংখ্যা বাড়বে, যার প্রভাব পড়বে প্যারাবনের ওপর। বাঘের ওপর যেহেতু পুরো সুন্দরবনের পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থা নির্ভর করে, সেহেতু পুরো সুন্দরবনের ওপর একটি বিরূপ প্রভাব পড়বে। বাড়বে অন্যান্য প্রাণীর চোরা শিকার, বনে বাড়বে বনসম্পদ আহরণ, পাশাপাশি হবে বন উজাড়। ফলে সুন্দরবন হারাবে তার প্রাকৃতিক অবস্থা এবং জৌলুস। একপর্যায়ে হারিয়ে যেতে পারে আমাদের সুন্দরবন। বিভিন্ন দুর্যোগে যেমন ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যায় সুন্দরবন মাতৃসমভাবে রক্ষা করে বাংলাদেশকে। প্রাকৃতিক এই ঢাল হারিয়ে অস্তিত্বহীন হবে বাংলাদেশ। তাই সুন্দরবন তথা সুন্দরবনের বাঘ বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষায় প্রয়োজন।

বাঘ প্রকৃতির পক্ষ থেকে বাংলাদেশে দেওয়া এক অনন্য উপহার। বর্তমানে পৃথিবীতে ১৩টি দেশে বাঘ পাওয়া যায়। অনেক দেশ থেকে বাঘ আজ বিলুপ্ত। আমাদের উচিত বাংলাদেশ যেন বাঘের বিলুপ্ত হওয়া দেশের তালিকায় না যায় এজন্য সব স্তরের মানুষের বাঘ সংরক্ষণে এগিয়ে আসা উচিত। শুধু নীতিনির্ধারকদের মধ্যে নয়, সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ দরকার বাঘ সংরক্ষণে। আর বাঘ বেঁচে থাকলে বেঁচে থাকবে মায়ের মতো সুন্দরবন, যা বাঁচিয়ে রাখবে বাংলাদেশের অস্তিত্বকে।

লেখক : অধ্যাপক ড মোহাম্মদ ফিরোজ জামান, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, আশিকুর রহমান সমী, বন্যপ্রাণী পরিবেশবিদ ও গবেষক সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিকাল ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস), বাংলাদেশ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত