বাংলাদেশে কোটা সংস্কার নিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ, প্রায় দেড় শতাধিক মৃত্যু এবং অবশেষে কারফিউ, ঢাকার রাস্তায় সেনাবাহিনী মোতায়েন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা, সব কিছুই বেশ গুরুত্ব সহকারে প্রচার পেয়েছে বিশ্ব গণমাধ্যমগুলোতেও।
বাংলাদেশের কোটা আন্দোলন নিয়ে বিশ্লেষণভিত্তিক প্রতিবেদন করেছে বিশ্বের প্রভাবশালী কিছু গণমাধ্যম। তাদের মতে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার শাসনামলের সবচেয়ে ‘নজিরবিহীন’ বিক্ষোভের মুখোমুখি হয়েছেন।
রয়টার্স
ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্স বলছে, কোটা আন্দোলনকে ঘিরে সৃষ্টি হওয়া সংঘর্ষ ও সহিংসতা থামাতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশব্যাপী কারফিউ জারি করেছেন এবং বিক্ষোভ দমন করতে সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছেন। কিন্তু এসব পদক্ষেপেও দেশটির সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ কমেছে বলে মনে হচ্ছে না।
বিক্ষোভে প্রায় ১৫০ জনের মত নিহত হয়েছে বলে উল্লেখ করেছে রয়টার্স।
যদুই সরকার বিক্ষোভে সরাসরি গুলি চালানোর কথা অস্বীকার করেছে, তবে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে যে মৃত ও আহতদের শরীরে বুলেট এবং বন্দুকের গুলির ক্ষত রয়েছে।
বিভিন্ন সংগঠন ও সমালোচকদের অভিযোগ, শেখ হাসিনার সরকার গত ১৫ বছরের ক্ষমতায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও কর্মীদের গণগ্রেপ্তার, জোরপূর্বক গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যা চালিয়েছে। যদিও এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করেছেন তিনি।
দ্যা ইকোনমিস্ট
চলতি মাসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার শাসনামলের সবচেয়ে ‘নজিরবিহীন’ বিক্ষোভের মুখোমূখি হয়েছেন বলে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে প্রভাবশালী ব্রিটিশ ম্যাগাজিন দ্য ইকোনমিস্ট।
ইকোনমিস্ট বলছে, গত কয়েকদিনের আন্দোলনে এবং সহিংসতায় প্রায় ২০০ জন বিক্ষোভকারী এবং তাদের সমর্থনকারী নিহত হয়েছে (সম্ভবত আরও বেশি) এবং হাজার হাজার আহত হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ এই হত্যাকান্ডের হিসাব জানতে চায়। তবুও, হিসাবটা হয়তো এমন যা সামনে আনার মানসিকতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেই।
ইকোনমিস্ট বলছে,১৫ বছরের নিরবচ্ছিন্ন শাসনের মধ্যে এটি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কোটা আন্দলনকে ঘিরে সাম্প্রতিক দিনের সহিংসতার জন্য প্রশাসন কমপক্ষে ৬১,০০০ জনকে অভিযুক্ত করেছে, যার মধ্যে বেশিরভাগই বিরোধী দলের। এমনকি সরকারের পদক্ষেপ দেশের অর্থনীতিকে হুমকির মুখে ফেললেও, প্রধানমন্ত্রী তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন (দলীয়) প্রশাসনের প্রতি।
ইকোনমিস্টের মতে, সংকটের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া দেশের অধিকাংশ মানুষের মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। ক্ষমতার উপর তার দখল নিয়ে প্রশ্নের উদ্রেক করেছে।
দ্যা ডিপ্লোম্যাট
কোটা আন্দোলন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাগাজিন দ্যা ডিপ্লোম্যাট বলছে, সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতির বিরোধিতা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিক্ষোভে হাসিনা সরকারের সহিংস দমন বিক্ষোভের ফলে প্রায় ২০০ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার বেশিরভাগই ছাত্র এবং সাধারণ নাগরিক।
ম্যাগাজিনটি বলছে, শেখ হাসিনা তার রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্ত এবং কিছু নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে তুষ্ট করার প্রচেষ্টা এই পদক্ষেপটি নেওয়া হয়েছে।
দ্যা ডিপ্লোম্যাট আরও বলছে, সাম্প্রতিক দশকগুলোতে নজিরবিহীন এই বিক্ষোভ ও সহিংসতা বাংলাদেশীদের মধ্যে ক্ষোভ ও আতংকের জন্ম দিয়েছে। সরকারী হিসেবে মৃতের সংখ্যা ২০০ বলা হলেও প্রকৃত মৃত আরও বেশি ধারণা অনেকের।
দ্যা হিন্দু
কোটা আন্দোলনে সহিংসতা ও মৃত্যু নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যম দ্যা হিন্দু বলছে, বাংলাদেশে ছাত্র বিক্ষোভ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে প্রায় ২০০ জনের মৃত্যুর ঘটনায় সরকারের নানা পদক্ষেপের কারণে পরবর্তী প্রজন্মের সমর্থন হারিয়েছেন মাত্র কয়েক মাস আগে নির্বাচনে বিজয়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার।
দ্যা হিন্দু বলছে, প্রধানমন্ত্রীর রাজাকার মন্তব্য থেকেই মূলত ছাত্রদের মধ্যে ক্ষোভের বিস্তার।
তবে আদালতের রায়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার হলেও ক্ষোভ কমেনি ছাত্রদের। সহিংসতায় আহত এবং নিহতদের দায়িদের শাস্তি দাবি করে কয়েকজন মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছে ছাত্র সমাজ।
যার কারণে দ্যা হিন্দু আশংকা করছে, কারফিউ প্রত্যাহার করা হলে এবং ইন্টারনেট সম্পূর্ণরূপে পুনরুদ্ধার হলে ছাত্র আন্দোলনের পুনরাবৃত্তি হতে পারে।
ছাত্র আন্দোলন দীর্ঘায়িত হলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ার শংকা রয়েছে ভারতের। এছাড়া বাংলাদেশে অবস্থানরত হাজার হাজার ভারতীয় ছাত্রদের জীবন দীর্ঘায়িত বিক্ষোভে ব্যাহত হওয়ার শংকা দেশটির।
দ্যা গার্ডিয়ান
কোটা আন্দোলন ও সহিংসতা নিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্যা গার্ডিয়ান বলছে, বাংলাদেশের ছাত্র বিক্ষোভ সরকারের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনে পরিণত হয়েছে।
দ্যা গার্ডিয়ান বলছে, কোটা বহাল রাখা আদালতের সিদ্ধান্ত হলেও অনেকে এটিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে মনে করেছিলেন। কারণ বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষের ধারণা বিচার বিভাগের উপর শক্ত দখল রয়েছে শেখ হাসিনার।
এছাড়া কোটা পুনর্বহালে আওয়ামী লীগের লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা বেশি এবং শেখ হাসিনা মিত্রদের দিয়ে সরকার চাকরি পূরণ করতে পারে তা নিশ্চিত করার জন্য একটি পদক্ষেপ বলে ধারণা জন্মেছিল। এবং এই ধারণাই ক্ষোভের জন্ম দেয় অর্থনৈতিক মন্দা এবং উচ্চ যুব বেকারত্বের বাংলাদেশের ছাত্র সমাজে।
