কোটা সংস্কার আন্দোলন কেন্দ্র করে দেশব্যাপী চলছে ধরপাকড়। বিশেষ করে আন্দোলনকারী সন্দেহে রাস্তা ও বাসা থেকে শিক্ষার্থীদের তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন শিক্ষকরা। এরই মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ৩৪ জন শিক্ষার্থীকে থানা থেকে ছাড়িয়ে আনার খবর পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি এক বিজ্ঞপ্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো নিরপরাধ শিক্ষার্থী যাতে হয়রানির শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি হয়রানির শিকার হলে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিল ঢাবি কর্তৃপক্ষ। তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের ১৭ জন শিক্ষার্থীকে থানা থেকে ছাড়িয়ে আনার ব্যবস্থা করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম। এ ছাড়া বিভিন্ন জায়গায় আটকে থাকা পাঁচজন শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করেছে তারা। তাছাড়া আর্থিক এবং আইনি সহায়তা করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের হয়রানি রোধ করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিতে দেখা গেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে।
ঢাবির যে ১৭ শিক্ষার্থীকে থানা থেকে ছাড়িয়ে আনা হয়েছে, তারা হলেন দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী মুক্তার আহমেদ, রুকু খাতুন; শিল্পকলা বিভাগের ইমরান সাদমান, ইশরাক তৈমুর, ইমরান মিয়া; বাংলা বিভাগের মোসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ; কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের আবিদ হাসান, আরবি বিভাগের আবিদ হাসান রাফি; ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টের নাজমুল হাসান শান্ত, উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজের মাসুম বিল্লাহ, ব্যাংকিং বিভাগের খাইরুল আজিম, ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের (আইবিএ) রুবায়েত ফেরদৌস রনিন, ওএসএল বিভাগের রাশেদ খান আবিদ, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সাদমান আব্দুল্লাহ, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের মোস্তাক তাহমিদ, মার্কেটিং বিভাগের আরমান খান এবং ফিন্যান্স বিভাগের শিক্ষার্থী এমএ তামিম।
ঢাকা কর্তৃপক্ষ বলছে, কোনো নিরপরাধ শিক্ষার্থী যাতে হয়রানির শিকার না হয় সেজন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। উপাচার্য, প্রক্টর এবং সহকারী প্রক্টররা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদারকি করছেন। এ ছাড়া দুজন সহকারী প্রক্টরকে বিশেষভাবে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন ছাত্রদের জন্য ড. মোহাম্মদ হাসান ফারুক এবং ছাত্রীদের জন্য ড. ফারজানা আহমেদ।
ঢাবি প্রশাসন সর্বোচ্চ সহযোগিতা করছে বলে একাধিক শিক্ষার্থী এবং বিভাগের চেয়ারম্যানরা নিশ্চিত করেছেন। আরবি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. যুবায়ের মুহাম্মদ এহসানুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের শিক্ষার্থীকে যখনই তুলে নিয়ে যাওয়ার খবর পেয়েছি তখনই প্রক্টরকে বিষয়টি জানিয়েছি। উনারা সর্বোচ্চ সহযোগিতা প্রদান করায় আমাদের শিক্ষার্থীকে আমরা দ্রুত ফিরে পেয়েছি।’
বিশ^বিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. মাকসুদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের চেষ্টার কোনো কমতি নেই। যখনই খবর পাচ্ছি তখনই সঙ্গে সঙ্গে সহযোগিতার চেষ্টা করছি। উপাচার্য নিজেও বিভিন্ন থানায় এবং পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে কথা বলেছেন। হাসপাতালে গিয়েছেন, আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করেছেন। এ ছাড়া যারা কোর্টে চলে গেছে তাদের আইনি সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করছি। ১৭ জনকে ছাড়িয়ে আনার পাশাপাশি আটকে থাকা এবং হয়রানির শিকার হওয়াদের নিরাপদ করার চেষ্টা করছি আমরা।’
উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটি আমাদের ধারাবাহিক প্রসেস। আমরা আমাদের কথা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করার চেষ্টা করছি এবং করব। আমার কোনো শিক্ষার্থীকে যাতে হয়রানি করা না হয়, সেজন্য আমরা সচেষ্ট আছি। প্রক্টরসহ পুরো টিম শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করছে।’
এদিকে কোটা সংস্কার আন্দোলনে সোমবার বিক্ষোভ মিছিলের প্রস্তুতিকালে কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ১৮ শিক্ষার্থীকে আটক করে পুলিশ। পরে তাদের মধ্যে ১৭ শিক্ষার্থীকে ছাড়িয়ে আনেন ইবির বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকরা। তবে এখনো একজন শিক্ষার্থী থানায় আছেন বলে জানা গেছে। গত সোমবার রাত দেড়টায় কুষ্টিয়া মডেল থানা কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে তাদের ছাড়িয়ে আনেন শিক্ষকরা। এ সময় উপস্থিত ছয় শিক্ষক হলেন আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. তোজাম্মেল হোসেন, অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান, অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম, আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. আকতার হোসেন, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল বারী এবং দাওয়াত অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মহাম্মদ মাসউদ আল মাহদী। শিক্ষার্থীদের ছাড়িয়ে আনার বিষয়ে আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. তোজাম্মেল হোসেন বলেন, ‘আমরা সাধারণ শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের বিপদে পাশে থাকার চেষ্টা করেছি এবং ভবিষ্যতেও যেকোনো বিপদে পাশে থাকব।’ তবে এ বিষয়ে বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা কী ছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা তাদের দায়িত্বে অবহেলা।’
ইবি প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহাদাৎ হোসেন আজাদ বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা তাদের মতো বলতে থাকুক। আমরা আমাদের অবস্থান থেকে তাদের ছাড়ানোর বিষয়ে গোপনে ভূমিকা পালন করেছি।’
