লেবাননের বৈরুত শিক্ষায় চট্টগ্রাম বন্দরে নির্মিত হলো আধুনিক রাসায়নিক শেড। এই শেডে আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যালার্ম বেজে উঠবে। এতে যুক্ত করা হয়েছে আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, যা প্রায় আট ঘণ্টা পর্যন্ত আগুনের তাপ সহ্য করার ক্ষমতাসম্পন্ন। এতে ১২ ইঞ্চি পুরুত্বের দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছে। মূলত ২০২০ সালের ৪ আগস্ট বৈরুত বন্দরের শেডে রক্ষিত সাত বছরের পুরনো ২ হাজার ৭৫০ টন অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের বিস্ফোরণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পর সতর্কতা হিসেবে ৬৪ বছরের পুরনো শেডের পরিবর্তে নতুন এই রাসায়নিক শেড নির্মাণ করল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে বন্দরের এক নম্বর জেটি গেটে দোতলার আধুনিক ভবনটির নির্মাণকাজ ২০২২ সালে শুরু হয়ে সম্প্রতি এর নির্মাণকাজ শেষ হয়। এখনো এই রাসায়নিক শেডে পণ্য রাখার কার্যক্রম শুরু হয়নি। শিগগিরই তা চালু করা হবে বলে জানান চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র ও সংস্থাটির সচিব ওমর ফারুক। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বন্দরের ভেতরে পুরনো একটি শেড (পি শেড) রয়েছে কেমিক্যাল রাখার জন্য। এখন পর্যন্ত ওখানেই সব ধরনের রাসায়নিক উপাদান জাহাজ থেকে নামানোর পর রাখা হয়। কিন্তু বৈরুত দুর্ঘটনার পর বন্দরের গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে আমরা আধুনিক এই শেডটি নির্মাণ করি।’
শেড নির্মাণের প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী তারেক মাহমুদ বলেন, ‘শেডের কোথাও আগুন লাগলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যালার্ম বেজে উঠবে। এ ছাড়া আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রয়েছে ভবনটিতে। পণ্যের ঝুঁকি বিবেচনায় পৃথক পৃথক স্থানে রাখা হবে। আর এর চারপাশের দেয়ালগুলো প্রায় আট ঘণ্টা পর্যন্ত আগুনের তাপ সহ্য করতে পারবে, শেডের বাইরে এই তাপ যাবে না।’
দীর্ঘ সময় তাপ ধরে রাখার আধুনিক প্রযুক্তি রয়েছে কি না, জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রাম বিভাগের উপপরিচালক দিনমনি শর্মা বলেন, ‘আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থায় এমন প্রযুক্তি রয়েছে। তবে তাদের শেডে যুক্ত করা এসব অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ফায়ার সার্ভিস থেকে ভেটিং করে নিতে হবে। একই সঙ্গে চালু করার আগে এগুলো ঠিকভাবে কাজ করছে কি না, সেজন্য ফায়ার সার্ভিস থেকে প্রতিনিধি রাখা প্রয়োজন। তারপরও যেকোনো প্রয়োজনে কারিগরি সাপোর্ট দিতে আমরা প্রস্তুত আছি।’
এদিকে ২০২০ সালে লেবাননের বৈরুত বন্দরে ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। সেই কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন তখনকার সময়ের সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) জাফর আলম। বর্তমানে অবসরে থাকা এই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক উপাদানগুলো রাখার জন্য আমরা একটি আধুনিক শেড নির্মাণের সুপারিশ করেছিলাম। বর্তমান পি শেডটি ১৯৫০-এর দশকের সময়ে গড়ে তোলা। তাই নতুন আধুনিক শেডের প্রয়োজন ছিল। এ ছাড়া বন্দরের ভেতরে ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক উপাদান যত কম সময় রাখা যায় ততোই মঙ্গলজনক। দ্রুত এসব পণ্য ডেলিভারি দেওয়ার ব্যবস্থা করতে কাস্টমসকে যুগোপযোগী হতে হবে। বছরের পর বছর পুরনো রাসায়নিক উপাদান শেডে ফেলে রাখা যাবে না।’
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক বলেন, দ্রুত রাসায়নিক উপাদান ডেলিভারির জন্য ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করা যেতে পারে। এতে আমদানিকৃত পণ্য টেস্ট, টেস্টের রিপোর্ট, কাস্টমসের সিদ্ধান্তসহ নানা আমলাতান্ত্রিক কাজ একস্থান থেকে দ্রুত শেষ করা যাবে।
চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে প্রায় শতাধিক ধরনের রাসায়নিক উপাদান আমদানি হয়ে থাকে। আর এসব আমদানি পণ্যের কিছু উপাদান সাত থেকে আট বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্দরের শেডে পড়ে রয়েছে। শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে আমদানি হচ্ছে এসব রাসায়নিক পণ্য। আর বিধি অনুযায়ী কোনো পণ্য খালাসের পর ৩০ দিনের মধ্যে আমদানিকারক ডেলিভারি না নিলে তা নিলামযোগ্য হয়ে যায়। পরে এগুলো নিলাম বা ধ্বংস করার এখতিয়ার রয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টমসের। যথাসময়ে নিলাম না হলে কিংবা পণ্যগুলো ধ্বংস করা না হলে এগুলোই একসময় অনুকূল পরিবেশে বিস্ফোরিত কিংবা অগ্নিকা-ের কারণ হতে পারে।
