কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের’ ডাকা কর্মসূচির প্রতি সংহতি ও সমর্থন জানিয়েছেন দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও ব্যক্তি। আজ রবিবার থেকে আন্দোলনকারীদের ডাকা ‘অসহযোগ আন্দোলনে’ গতকাল শনিবার সংহতি ও পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন গণফোরামের একাংশের নেতারা। ছাত্র আন্দোলনের প্রতি সমর্থন এবং তাদের দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে গতকাল বিবৃতি দিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত ১৬১ জন কর্মকর্তা। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা।
‘অসহযোগ আন্দোলনে’ সমর্থন গণফোরামের : গতকাল শনিবার গণফোরাম সভাপতি মোস্তফা মোহসীন মন্টুর সভাপতিত্বে তার কার্যালয়ে গণফোরাম নেতাদের এক জরুরি সভা শেষে ‘অসহযোগ আন্দোলনে’ সংহতি ও পূর্ণ সমর্থন জানানোর তথ্য জানানো হয়।
সভায় নেতারা বলেন, আমরা শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ৯ দফাসহ সর্বশেষ ঘোষিত অসহযোগ আন্দোলনে সংহতি ও পূর্ণ সমর্থন প্রকাশ করছি। প্রশাসনকে শিক্ষার্থীদের বিপক্ষে না দাঁড়িয়ে অসহযোগ আন্দোলনে সমর্থনের আহ্বান জানাই। বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিক্ষক, ডাক্তার, শিল্পী ও আইনজীবীসহ সব পেশাজীবী, অভিভাবকসহ সর্বস্তরের জনগণ দলমত, জাতি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমর্থন জানিয়েছেন তাদের অভিবাদন জানাই এবং চলমান অসহযোগ আন্দোলন শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলনে যুক্ত থাকার আহ্বান জানাই। মহান মুক্তিযুদ্ধের সব সংগঠক ও যোদ্ধা যারা বেঁচে আছেন, তাদের এই আন্দোলনে সমর্থনের উদাত্ত আহ্বান জানাই। সত্যিকারের কোনো বীর মুক্তিযোদ্ধা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের বিরোধিতা করতে পারেন না।
সভায় উপস্থিত ছিলেন গণফোরাম সাধারণ সম্পাদক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী, নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট এ কে এম জগলুল হায়দার আফ্রিক, অ্যাডভোকেট মহিউদ্দিন আবদুল কাদের, সভাপতি পরিষদ সদস্য আবদুল হাসিব চৌধুরী, ঢাকা বিভাগীয় সাংঠনিক সম্পাদক মুহাম্মদ রওশন ইয়াজদানী, তথ্য ও গণমাধ্যম সম্পাদক মুহাম্মদ উল্লাহ মধু, যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক তাজুল ইসলাম প্রমুখ।
ছাত্র আন্দোলনে সমর্থন অবসরপ্রাপ্ত ১৬১ জন কর্মকর্তার : অবিলম্বে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহত শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ, আহতদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থাসহ সব আন্দোলনকারীর জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা বিধান করাসহ আন্দোলনকারীদের যৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত ১৬১ কর্মকর্তা। গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তারা এ আহ্বান জানান। বিবৃতিতে ১৬১ কর্মকর্তার পক্ষে স্বাক্ষর করেছেন ভাইস চেয়ারম্যান বিজন কান্তি সরকার ও মহাসচিব মো. আবদুল বারী।
বিবৃতিতে তারা বলেন, ‘মেধাভিত্তিক জনপ্রশাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে আমরা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সব দাবির প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন এবং সরকারদলীয় ক্যাডার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের অমানবিক নির্যাতন-হামলার তীব্র নিন্দা জানাই। আমরা এসব ন্যক্কারজনক হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের উপযুক্ত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি।’
একাত্মতা ব্যাংক কর্মকর্তার : শিক্ষার্থীদের সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড এসপিডি বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক নজরুল ইসলাম। গত শুক্রবার রাতে ফেসবুকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি লিখেছেন, ‘সাধারণ শিক্ষার্থীদের ডাকা সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করছি। দীর্ঘ ১৫ বছর চুপ থেকে এই সরকারের খুন, ব্যাংক লুট, দুর্নীতি সহ্য করেছি। কথা বলতে পারিনি। সম্প্রতি সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন, নিপীড়ন, হত্যা ও অনিয়মের কথা আমরা বলতে পারছি না হৃদয় যেন আমাদের অন্ধ হয়ে গেছে। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সরকার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত রাষ্ট্রের মালিক জনগণ তথা ছাত্রদের সঙ্গে থাকব, ইনশাআল্লাহ।’
ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে দেশ রূপান্তরকে নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি স্বেচ্ছায় স্বজ্ঞানে এসব কথা লিখেছি।’ ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে তিনি আরও বলেন, ‘রাষ্ট্রের মালিক যদি জয়লাভ করে, তাহলে হয়তো আমি আবার রাষ্ট্রের মালিকের সেবা করতে ফিরে যাব। আর এই খুনি, ব্যাংক লুটেরা, দুর্নীতিবাজ সরকার যদি টিকে যায় তবে আমি হয়তো চাকরিতে ফিরব না।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মেজবাউল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তিনি (নজরুল ইসলাম) আমাদের অফিশিয়ালভাবে কিছু জানাননি। তাই এই মুহূর্তে এ বিষয়ে আমরা কিছু বলতে পারছি না।’
গণতন্ত্র মঞ্চের সংবাদ সম্মেলন : নাগরিক ঐক্যের সভাপতি ও গণতন্ত্র মঞ্চের সমন্বয়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, দেশে এখন মৃত্যুর মিছিল চলছে। দেশ আজ মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হয়েছে। গতকাল নাগরিক ঐক্যের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গণতন্ত্র মঞ্চের সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন তিনি।
মান্না বলেন, ‘কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, কিন্তু ছাত্রদের আন্দোলন চলছে। তারা বলছে, ছাত্রদের আন্দোলনে তৃতীয় পক্ষ গুলি করেছে, তৃতীয় পক্ষ যদি থাকে তাহলে তা ছাত্রলীগ-যুবলীগ। হবিগঞ্জ, খুলনা, উত্তরা এবং অন্যান্য জায়গায় ছাত্রদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়েছে ছাত্রলীগ-যুবলীগ, সব অপকর্ম তাদের। শুভবুদ্ধি থাকলে পদত্যাগ করেন যতদ্রুত সম্ভব, না হলে যত দেরি করবেন, নিজের ক্ষয়ক্ষতি হবে, দেশেরও ক্ষতি হবে।’
সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, ভাসানী অনুসারী পরিষদের আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম বাবলু, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ুম, জেএসডির সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন।
‘আমাদের সন্তানদের গুলি করে হত্যা ক্ষমাহীন অপরাধ’ : সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিকল্পধারা বাংলাদেশের সভাপতি একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেছেন, ‘আমাদের সন্তানদের গুলি করে হত্যা করা একটি ক্ষমাহীন অপরাধ এবং কোনো রাজনৈতিক দোহাই দিয়ে এটাকে গ্রহণযোগ্য করার কোনো সুযোগ নেই।’
গতকাল বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নান স্বাক্ষরিত গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বদরুদ্দোজা চৌধুরী এ কথা বলেন।
আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘাতের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকার কথা উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এ কথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে, আমাদের নিজেদের দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আমাদেরই সন্তানদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ছে এবং শত শত ছাত্রছাত্রী ও সাধারণ জনগণকে হত্যা করেছে। এমনকি ছোট শিশুরাও এই নৃশংস হত্যাযজ্ঞ থেকে রেহাই পায়নি। হাজার হাজার ছাত্র-জনতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং এই নির্যাতন এখনো চলমান।’
দেশের সুশীল সমাজ, সব পেশাজীবী ও সর্বস্তরের জনসাধারণকে ছাত্রদের পাশে এসে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি। এই মুহূর্তেই এ অবস্থার অবসান হওয়া জরুরি এবং এই দায়িত্ব পুরোপুরি সরকারের উল্লেখ করে বিবৃতিতে বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, ‘আমরা আর একটিও প্রাণহানি, এক ফোঁটা রক্তপাতও দেখতে চাই না। ক্ষমতা প্রদর্শন নয়, বরং দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়ে ছাত্রদের সব দাবি নিঃশর্তভাবে মেনে নিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করুন এবং সব হত্যাকাণ্ডের বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে বিচার সুনিশ্চিত করুন।’
