সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রতিবাদে গতকাল শনিবার রাজধানীর শাহবাগে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সংগঠন ও সাধারণ মানুষ। এ সময় হিন্দুদের মন্দির ও বাড়িঘরে হামলা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষায় অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তারা। এদিকে চট্টগ্রামে বাংলাদেশ হিন্দু জাগরণ মঞ্চের ব্যানারে বিক্ষোভ হয়েছে।
বেলা ৩টার দিকে বিক্ষোভ শুরুর পর শাহবাগ ও আশপাশের সড়কগুলোয় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। রাত ৮টা পর্যন্ত আন্দোলনকারীরা সেখানে বিক্ষোভ করেন। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকসমাজসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন বিক্ষোভ সমাবেশে সংহতি জানায়। গত শুক্রবারও প্রায় চার ঘণ্টা শাহবাগ মোড় অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখানো হয়।
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সারা দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর সংঘটিত হামলা, অত্যাচার, নির্যাতন, নিপীড়ন, ভাঙচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ওই সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
যদিও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের রক্ষায় বিভিন্ন এলাকায় ছাত্র-জনতার পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা পাহারা দিচ্ছেন। এরপরও বিভিন্ন এলাকায় হামলার ঘটনা ঘটেছে। কোথাও কোথাও হামলার পেছনে আওয়ামী লীগের কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। পাশাপাশি ফেসবুকে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, ধর্ষণ, মন্দির ভাঙচুরসহ বিভিন্ন ধরনের কিছু ভুয়া ছবি, খবর ও ভিডিও প্রচার করছেন ভারতীয় নাগরিকরা।
গতকালের বিক্ষোভে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও সংখ্যালঘুদের চিকিৎসা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন নেতারা। এ সময় কারও হাতে, কারও মাথায় বাঁধা অবস্থায় জাতীয় পতাকা দেখা যায়। সমাবেশ থেকে ‘জাগো রে জাগো, হিন্দু জাগো’, ‘তুমি কে আমি কে, হিন্দু হিন্দু’, ‘স্বাধীন দেশে স্বাধীন নাই’, ‘জ্বালাও পোড়াও বন্ধ করো, মানুষ হওয়ার চেষ্টা করো’, ‘তুমি কে, আমি কে, বাঙালি বাঙালি’, ‘অ্যাকশন অ্যাকশন ডাইরেক্ট অ্যাকশন’ প্রভৃতি স্লোগান শোনা যায় সমবেত লোকজনের মুখে।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া বাংলাদেশ সচেতন সনাতনী নাগরিক সংগঠনের নেতা বিশ্বনাথ বলেন, ‘হিন্দুদের বাড়িঘর, মন্দির, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা-লুটপাট করা হচ্ছে। কয়েকটি স্থানে হত্যাকাণ্ড হয়েছে। আমরা তো এ দেশেই জন্মেছি, আমরা কোথায় যাব। ক্ষমতায় যেই আসুক, আমাদের নিরাপত্তা চাই। আমরা আমাদের বাসস্থান ও ধর্মীয় স্থাপনার নিরাপত্তা চাই।’
বিক্ষোভে সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় গঠন করার দাবি নিয়ে ৪ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। এগুলোর মধ্যে আছে সংখ্যালঘু সুরক্ষা কমিশন গঠন করতে হবে; সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত সব হামলা প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে এবং সংখ্যালঘুদের জন্য ১০ শতাংশ সংসদীয় আসন বরাদ্দ করতে হবে।
গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে ৫২টি জেলায় ২০৫টি সহিংস ঘটনার বিবরণ দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে একটি খোলা চিঠি দিয়েছে সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ।
খোলা চিঠিতে ড. ইউনূসকে একটি নতুন যুগের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সমতাভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে ছাত্র ও গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতনের পর দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। তবে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে কিছু গোষ্ঠীর সহিংস কর্মকাণ্ডে গভীর দুঃখ ও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, যা এ অর্জনকে কলঙ্কিত করেছে।
এদিকে বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের সভাপতি অ্যাডভোকেট গোবিন্দ প্রামাণিক সাংবাদিকদের বলেছেন, ভারতের মিডিয়ায় বাংলাদেশের হিন্দু সমাজের ওপর হামলা নিয়ে মিথ্যাচার করছে। বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক গুজব ছড়াচ্ছে, নানা উদ্ভট কথাবার্তা বলছে।
তিনি বলেন, সোমবার শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর এ দেশের হিন্দু সমাজ মনে করেছিল যে তাদের ওপর হামলা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটবে। কিন্তু ওইদিন বিকেলে জামায়াত ও বিএনপির নেতারা তাদের সব নেতাকর্মীকে হিন্দুদের বাড়িতে হামলা-লুটপাট যাতে না হয় এবং মন্দিরে যেন পাহারার ব্যবস্থা করা হয়, সেই নির্দেশ দেন। সেদিন থেকে তারা পাহারা দিচ্ছেন। এ কারণে সাধারণভাবে হিন্দুদের ওপর কোনো ধরনের হামলা হয়নি বা কোনো মন্দিরে ভাঙচুর হয়নি। কিছু আওয়ামী হিন্দু নেতা রয়েছেন, যারা বিভিন্ন সময়ে বাড়াবাড়ি করেছিলেন, তাদের বাড়িতে ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ হয়েছে। একই সঙ্গে মুসলমান আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়িতেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে।
চট্টগ্রামে সনাতনীদের বিক্ষোভ : দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর চলমান পরিস্থিতিতে বিভিন্ন স্থানে হিন্দুদের ওপর হামলা ও মন্দির ভাঙচুরের প্রতিবাদে চট্টগ্রাম নগরীতে বিক্ষোভ করেছে বাংলাদেশ হিন্দু জাগরণ মঞ্চ। গতকাল শনিবার বিকেলে নগরীর চেরাগী পাহাড় মোড়ে বিক্ষোভকালে হামলা, নির্যাতন, দখল, মঠ-মন্দির-বাড়িঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগকারীদের বিচার এবং নিজেদের সুরক্ষার দাবি জানান তারা।
এ সমাবেশে যোগ দিতে বেলা আড়াইটায় দিকে নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে চেরাগী পাহাড় এলাকায় জড়ো হতে থাকেন সনাতন ধর্মাবলম্বী নারী-পুরুষ। এ সময় তারা ‘আমার মাটি আমার মা, দেশ ছেড়ে যাব না’, ‘তুমি কে আমি কে, বাঙালি বাঙালি’, ‘পদ্মা-মেঘনা-যমুনা, তোমার আমার ঠিকানা’, ‘আমার বাড়ি ভাঙল কেন, জবাব চাই দিতে হবে’ ইত্যাদি নানা স্লোগান দেন। এ সময় তারা বলেন, গত পাঁচ দিন ধরে বিভিন্ন এলাকায় সনাতনীরা চরম আতঙ্কের মধ্যে দিনাতিপাত করছে। হামলার ভয়ে কাটছে নির্ঘুম রাত। এ পরিস্থিতির অবসান হওয়া প্রয়োজন।
কর্মসূচি থেকে সনাতনীদের নিরাপত্তায় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে কেউ যদি মন্দিরে হামলা করতে আসে তাদের প্রতিহত করারও ঘোষণা দেওয়া হয়। সমাবেশে সনাতনী সম্প্রদায়ের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজন বক্তব্য রাখেন।
শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগের পর চট্টগ্রামে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ওপর হামলার তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
