বাংলাদেশে যখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয় ভারতের কম গণমাধ্যমে তা গুরুত্ব পায়। সদ্য পতন হওয়া শেখ হাসিনার সরকারের পুলিশ যখন মিছিলে গুলি করছে তখনো মুষ্টিমেয় গণমাধ্যমে তার প্রচার হয়। তবে বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলোর আন্দোলনের প্রতি সংহতি ও সোশ্যাল মিডিয়ার সংহতি বেশ নজর কাড়ে।
যখন দেশ জুড়ে কারফিউ জারি ও ইন্টারনেট শাটডাউন করা হয় তখন ভারতীয় গণমাধ্যম নড়েচড়ে বসে। যেহেতু ভারতের কোটা সিস্টেমের বাস্তবতা ও বাংলাদেশের কোটা সিস্টেমের বাস্তবতা ভিন্ন, ফলে অনেকের পরিস্থিতি বুঝতে বেগ পেতে হচ্ছিল। তবুও বেশিরভাগ গণমাধ্যমের সংবাদের ধরন ছিল আদালতের রায়ে কোটা সংস্কার হওয়ার পর আন্দোলন থেমে যেতে পারে। কিন্তু এতগুলো সাধারণ ছাত্র হত্যার পর সরকারের নৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে যায়। ফলে শিগগিরই আন্দোলন কোটা সংস্কার থেকে সরকারবিরোধী একটি অসহযোগ আন্দোলনে রূপ নেবে। অনেক ভারতীয় গণমাধ্যম সেটা এড়িয়ে যায়।
যাই হোক ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা যখন ভারত চলে যান তখন ভারতের সরকারপন্থি গণমাধ্যম নড়েচড়ে বসে। এসব মিডিয়ায় শেখ হাসিনাকে ভারতের একমাত্র বন্ধু, ‘সংখ্যালঘুর একমাত্র আশ্রয়স্থল’ ও খালেদা জিয়াকে ‘পাকিস্তানপন্থি ও হিন্দু বিদ্বেষী’ বলে প্রচার করা হয়। ভারতের বেশ কিছু গণমাধ্যম দেখলে মনে হবে ৫ আগস্টের আগে দেশে কিছু হয়নি। ৫ আগস্ট হঠাৎ করে তাদের ভাষায়, ‘মৌলবাদী-জামাত পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর সহযোগিতায় হাসিনা সরকারের পতন ঘটিয়েছে।’ তবে কিছু গণমাধ্যম আন্দোলন নিয়ে গঠনমূলক সংবাদ প্রচার করেছে এবং হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার সমালোচনা করেছে।
সরকারপন্থি গণমাধ্যমের এসব নিউজে আরও ঘি ঢেলে দেন ভারতের বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। তিনি বাংলাদেশ ইস্যু নিয়ে ভারতের সর্বদলীয় বৈঠকে বাংলাদেশের ঘটনায় পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার হাত আছে কি না খতিয়ে দেখতে বলেছেন। তার এই বক্তব্য ভারতীয় গণমাধ্যমকে আরও উসকে দেয়।
সরকার পতনের পর দেশের সব ধরনের আইনশৃঙ্খলা ভেযে পড়ে। এই সুযোগে কিছু সুযোগসন্ধানী সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর করেছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ঘটনাটি নতুন নয়, কারণ প্রতি নির্বাচনের পরপরই সংখ্যালঘুদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটে। আর বর্তমান পরিস্থিতি তো একটি গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তীকাল এবং দেশে পুলিশ নেই। এর বাইরে যারা আওয়ামী লীগের রাজনীতি করত তাদের কেউ কেউ হামলার শিকার হয়েছেন এবং সেটা হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে। যাই হোক কোনো ধরনের প্রতিহিংসাপরায়ণ ও সাম্প্রদায়িক হামলা কাম্য নয়। তবে যেসব সরকারপন্থি গণমাধ্যম বাংলাদেশের আন্দোলন নিয়ে চুপ ছিল তারা সংখ্যালঘুর ওপর হামলা নিয়ে সংবাদ পরিবেশন শুরু করে। যার ভাষা ছিল আপত্তিকর ও উসকানিমূলক। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে, কলকাতা পুলিশ একটি বিবৃতি দিয়েছিল। বিবৃতিটি ছিল, ‘কিছু স্থানীয় টিভি চ্যানেলে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে যেভাবে রিপোর্টিং হচ্ছে, তা খুব দৃষ্টিকটুভাবে সাম্প্রদায়িক এবং ভারতের প্রেস কাউন্সিলের নিয়মাবলির পরিপন্থী’। সংবাদ গ্রহণের আগে তৃতীয় সোর্সের মাধ্যমে তা যাচাই করার অনুরোধ জানানো হয়।
শুধু মূলধারার গণমাধ্যম নয়, সংখ্যালঘুর ওপর সহিংসতা নিয়ে ফেক নিউজ ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বিশেষ করে এক্সে (সাবেক টুইটার)। ভারতের সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে আন্দোলনকারীরা ক্রিকেটার লিটন দাসের ঘর পুড়িয়ে দিয়েছে। যদিওবা যে ঘর পুড়িয়েছে তা বাংলাদেশের জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার।
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশভিত্তিক ফ্যাক্ট-চেকাররাও গত কদিনের সামাজিকমাধ্যম বিশ্লেষণ করে অনেকটা তথ্য পেয়েছেন যে মূলত ভারতের বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকেই হিন্দুদের ওপরে আক্রমণের ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়েছে।
সম্প্রতি আরও একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, যেখানে দাবি করা হয়েছে যে ‘ইসলামি জনতা’ হিন্দুদের গ্রাম আক্রমণ করেছে এবং একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী পুকুরে সাঁতার কেটে পালানোর চেষ্টা করছে। ভারতীয় ফ্যাক্ট-চেকাররাই খুঁজে বার করেছেন যে ওই ব্যক্তি মুসলমান। সম্প্রতি চট্টগ্রামের নবগ্রহ মন্দিরে হামলার ঘটনা দাবি করে একটি ভিডিও পোস্ট করা হয় ডেইলি লেটেস্ট আপডেটস নামের একটি এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে। যেখানে ‘সেভ বাংলাদেশি হিন্দু’ হ্যাশট্যাগ ছিল। ভিডিওটি ভারতীয় গণমাধ্যম রিপাবলিক টিভির অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেলেও প্রচার করা হয়। অনলাইন যাচাই ও মিডিয়া গবেষণা প্ল্যাটফর্ম ডিসমিস ল্যাব বলছে, নবগ্রহ মন্দিরে অগ্নিসংযোগ বা আগুন দেওয়ার বিষয়টি ঠিক নয়।
বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর হামলা শুরু হয়েছে, ইসকন, কালীমন্দিরসহ বহু মন্দিরে আগুন দেওয়া হয়েছে এবং ৫০০ জন মারা গেছে বলে দাবি করা হয় ‘বাবা বেনারস’ অ্যাকাউন্টের পোস্টে। দৈনিক প্রথম আলো বলছে মূলত কোটা সংস্কার আন্দোলনে পুলিশ ও সরকারি দলের সহিংসতার ছবি ও ২০২১ সালের ছবি দিয়ে এই পোস্ট করা হয়েছে। সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, দিল্লির কিছু বস্তিতে বাংলাদেশি বলে কিছু মানুষকে মারধর করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে বাংলাদেশের হিন্দু নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। যদিও-বা এমন কোনো ঘটনা বাংলাদেশের কোথাও সম্প্রতি ঘটেনি।
এসব গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এভাবে ভিত্তিহীন খবর প্রকাশের একটি রাজনীতি আছে। একটি মূল কারণ হলো ভারতের ক্ষমতাসীন জনতা পার্টি দেখাতে চায়, বাংলাদেশের হিন্দুরা চরম বিপদে এবং সারা দুনিয়ার হিন্দুদের ‘ত্রাণকর্তা’ হিসেবে তাদের দিল্লির ক্ষমতায় থাকা উচিত।
দেশে দেশে যখন বিপ্লব ও গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী শাসকরা পালিয়ে যায় তারা অন্য দেশে রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা পায় না। শেখ হাসিনা যখন ভারতে একটি সামরিক ঘাঁটিতে নামলেন তখন তাকে গ্রহণ করতে ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা গিয়ে উপস্থিত হন। অথচ শ্রীলঙ্কার সাবেক প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে এবং আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনিকে ভারত আশ্রয়ই দেয়নি। ফলে এখানে হাসিনার প্রতি ভারত সরকারের সহানুভূতির বিষয়টি স্পষ্ট। অথচ ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে তাকে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়। এই সরকারকে ভারত দীর্ঘদিন সমর্থন করে দিয়ে এসেছে। আর এখন ভুয়া নিউজ প্রচার করে গণ-অভ্যুত্থানকে ‘মৌলবাদী অভ্যুত্থান’ হিসেবে দেখিয়ে ভারত বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার অর্জনকে ভিন্ন দিকে নিতে চেষ্টা করছে এবং কার্যত হাসিনাকেই সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।
এখানে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও জড়িয়ে পড়েছে। পশ্চিম বাংলার সমস্ত বামপন্থি সংগঠন ছাত্র আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছে। মমতা ব্যানার্জিও কৌশলী শব্দে তার সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন। কিন্তু পশ্চিম বাংলার বিজেপি সভাপতি ১ কোটি শরণার্থী গ্রহণ করতে হবে বলে উত্তেজনা তৈরি করেছেন।
বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা যেভাবে অভ্যুত্থান সংঘটিত করে শক্তিশালী একটা ফ্যাসিস্ট রেজিমকে হটিয়ে দিতে পারল, তা দক্ষিণ এশিয়ায় একটি দৃষ্টান্ত। এই আন্দোলনের স্পৃহা ছড়িয়ে পড়তে পারে ভারতসহ সারা দক্ষিণ এশিয়ায়। ফলে ভারতের একাংশ চায় না যে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার এই অভ্যুত্থানে তার দেশের ছাত্র-কৃষক আগ্রহী হয়ে উঠুক।
লেখক : কলামিস্ট, গবেষক
[email protected]
