দলীয়করণ বাদ দিয়ে দেশের স্বার্থে ও ব্যবসার কল্যাণে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়িক সংগঠন এফবিসিসিআইসহ সব ব্যবসায়িক সংগঠনের সংস্কার চেয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা। তারা বলেন, গত ১৫ বছরে ব্যবসায়ীরা ব্যবসার পরিবেশ বজায় না রেখে দলীয়করণ রাজনীতি বেশি করেছেন। এতে দেশের ব্যবসায় মারাত্মক রকমের ধস নেমেছে, যা বর্তমানের মূল্যস্ফীতিই এর প্রমাণ। ফলে দেশের মানুষের কষ্ট বহুগুণে বেড়েছে। এজন্য ২০২৪ সালে তরুণদের হাত ধরে আসার স্বাধীন বাংলাদেশ বিনির্মাণে দলীয়করণ বাদ দিয়ে ব্যবসায়ীদের স্বার্থে এফবিসিসিআইকে সংস্কার করা অতি জরুরি।
গতকাল বুধবার স্থানীয় একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত এক ব্যবসায়িক সম্মেলনে এ দাবি জানান ব্যবসায়ীরা। এ সময় দ্রুত সময়ের মধ্যে সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টা নিয়োগের দাবিও জানান তারা।
ব্যবসায়ীরা আরও বলেন, জবাবদিহি না থাকায় পুরো ব্যাংকিং খাত আজ ধসে পড়েছে। ব্যবসায়ীদের আস্থার বেসরকারি ইসলামী ব্যাংক রাতের আঁধারে দখল করে এক এস আলম ৫০ হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছেন। তাছাড়া দেশের আইন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব হওয়ায় কিছু সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী কালো টাকার পাহাড় গড়েছেন। তারা ব্যবসার আড়ালে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছেন। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, দেশ এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এজন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. ইউনূসের ওপর আস্থা রেখে সরকারকে সহযোগিতা করা হবে একমাত্র উত্তরণের উপায়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ড. ইউনূসের প্রতি দেশের তরুণদের আস্থা রয়েছে। আমরাও তাদের আস্থাকে সম্মান দিতে চাই। এজন্য ব্যবসায়ীরা এ সরকারকে সহযোগিতা করবে, যাতে দেশের ব্যবসার মারাত্মক যে ক্ষতি হয়েছে তা থেকে দ্রুত উত্তরণ ঘটানো যায়।
দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্বাচন দিয়ে গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, আমরা বিশ^াস করি ড. ইউনূস ও ছাত্র-জনতা মিলে দেশকে সংস্কার করবেন। যাতে নতুন গণতান্ত্রিক সরকার গঠন করা যায়।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি আশরাফ আহমেদ বলেন, দেশে এখনো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। ব্যবসার পরিবেশও পরিপূর্ণ সৃষ্টি হয়ে ওঠেনি। দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা করতে আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি ও ব্যবসার পরিবেশ দ্রুত ঠিক করা দরকার।
ব্যবসায়ী নেতা রাশেদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, ট্যাক্স ফাইল দেখে অসাধু ব্যবসায়ীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। তাছাড়া গত এক দশকে এনবিআরকে যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তার অপব্যবহার করেছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা। কিন্তু এ অবস্থার অবসান ঘটাতে হবে। এটি হলে কর্মকর্তারা বেআইনিভাবে ডিবির হারুনের মতো কোনো অর্থ দাবি করতে পারবেন না। কোনো গার্মেন্টস আগুনে পুড়লেও ডিবির হারুনকে অন্তত এক কোটি টাকা ঘুষ দিতে হতো।
এফবিসিসিআইর সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আবুল কাশেম হায়দার বলেন, গত ১০ বছরে ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিত্ব করেনি এফবিসিসিআইর বর্তমান কমিটি। তারা দলীয়করণ করতেই ব্যস্ত ছিল। তাই বর্তমান কমিটির ওপর অনাস্থা আনতে হবে এবং এদের সবাইকে পদত্যাগ করতে হবে।
এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ বলেন, আমরা বিদেশে যে দেশগুলোতে রপ্তানি করি সেসব দেশ আতঙ্কিত। দুবার কারফিউ হয়েছে, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ হয়েছে, তাই তারা আতঙ্কিত। তারা আমাকে জিজ্ঞেস করেÑ তোমাদের নির্বাচন কবে? আমি বলেছি তোমরা তোমাদের পণ্য ঠিকভাবে পাবে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তোমাদের পণ্য সঠিকভাবে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করবে।
বিজিএমই’র সাবেক সভাপতি কাজী মনিরুজ্জামান বলেন, তরুণ সমাজ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আমাদের স্বাধীন মুক্ত দেশ উপহার দিয়েছে। কিন্তু এর আগে পরিস্থিতি এমন ছিল যে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে দিনে পণ্য কিনে রাতে চুরি করে দেশকে ডুবিয়েছেন। ব্যবসার আড়ালে টাকা পাচার করেছেন। এসব বন্ধে যে সব শিক্ষার্থী রাজপথে রক্ত দিয়েছেন তাদের স্মরণীয় করে রাখতে রাষ্ট্রীয়ভাবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ করতে হবে।
এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি ও ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স, বাংলাদেশ (আইসিসি)-এর সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, আমি বিএনপি ও আওয়ামী লীগ দুই আমলেই এফবিসিসিআইর সভাপতি ছিলাম। কাউকে বলিনি অমুক বিএনপি, আওয়ামী লীগ বা জামায়াত করেন। সবাইকে নিয়ে সমস্যা সমাধানে কাজ করতে হবে। খাতভিত্তিক সমস্যা সমাধানের জন্য সরকারকে চাপ প্রয়োগ করাই সংগঠনের কাজ।
