সিএমপির ৬ থানায় ৫৮৯ মামলার নথি পুড়ে ছাই

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২৪, ০৭:২৭ পিএম

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর চট্টগ্রাম নগরীর ৮টি থানা ও ৮ ফাঁড়িতে ব্যাপক তাণ্ডব চালায় দুর্বৃত্তরা। হামলা, ভাঙচুর, অস্ত্র ও মালামাল লুট করে অনেক থানা ও ফাঁড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় তারা। ৮টি থানার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয় কোতোয়ালী, পাহাড়তলী, আকবর শাহ, ইপিজেড, সদরঘাট ও পতেঙ্গা থানায়। এ ৬টি থানায় পুড়ে ছাই হয়ে গেছে ৫৮৯টি মামলার নথি। এর মধ্যে কোতোয়ালীতে ১৮৭, পতেঙ্গা থানায় ১০১, আকবর শাহ থানায় ১০২, পাহাড়তলীতে ৯১, ইপিজেডে ৬৬ এবং সদরঘাট থানায় পুড়ে গেছে ৪২টি মামলার নথিপত্র। বিষয়টি দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছেন নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আবদুল মান্নান মিয়া।

সিএমপি সূত্র জানায়, ৮টি থানার মধ্যে ৬টি থানার দেয়াল ছাড়া অবশিষ্ট আর কিছু নেই। পুড়ে ছাই হয়ে গেছে আসবাবপত্র, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, হাজারের বেশি তদন্তাধীন মামলার নথি, আলামত, এজাহার, চার্জশিট, আসামিদের গ্রেপ্তারি পরোয়ানাসহ গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র। নথি পুড়ে যাওয়া এসব মামলার ভবিষ্যৎ কি হবে তা নিয়ে চিন্তায় পড়েছে নগর পুলিশ প্রশাসন।

সিএমপির কর্মকর্তারা বলছেন, কিছু নথিপত্র হয়তো অনলাইনে পাওয়া গেলেও অধিকাংশ নথি আর পাওয়া যাবে না। ফলে এসব মামলার বিচারিক কার্যক্রম বিঘ্নিত হবে। একই কথা বলেছেন আইন বিশেষজ্ঞরাও।

নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আবদুল মান্নান মিয়া বলেন, ‘কিছু নথি পুলিশের কেন্দ্রীয় ক্রাইম ডেটাবেজ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (সিডিএমএস) থেকে মিলবে বটে। কিন্তু মামলার আলামত, আসামির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও রেজিস্টার, ব্যক্তিগত ল্যাপটপে সংরক্ষণে রাখা গুরুত্বপূর্ণ মামলার নথি তো আর পাওয়া যাবে না। পুড়ে যাওয়া মামলার নথি কীভাবে জোগাড় করা হবে সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে থানায় থানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা পুলিশকে বিপাকে ফেলেছে।’

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, কিছু মামলার নথি সিডিএমএস সার্ভারে থাকলেও ম্যানুয়াল নথিপত্র ও আলামত থাকে থানায়। আর ম্যানুয়াল নথিপত্রের কোনো ব্যাকআপ থাকে না। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ম্যানুয়াল, পরোয়ানা রেজিস্টারও ম্যানুয়াল। এসব তো আর জোগাড় করা যাবে না। ফলে আদালতে ফৌজদারি মামলা পরিচালনায় বিপাকে পড়তে হবে পুলিশকে।

নগর পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, ৫ আগস্ট নগরের ৮টি থানা এবং ৮টি ফাঁড়ি থেকে পাঁচ শতাধিক আগ্নেয়াস্ত্র ও ১২ হাজার রাউন্ড গুলি লুট করে দুর্বৃত্তরা। এর মধ্যে গত বুধবার বিভিন্ন উৎস থেকে লুটের ৩৫টি অস্ত্র ও ২৭৫টি গুলি উদ্ধার করেছে র‌্যাব-৭। লুট হওয়া বাকি অস্ত্র উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অভিযান চালাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন সিএমপির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) কাজী তারেক আজিজ।

সিএমপির এই কর্মকর্তা জানান, দুর্বৃত্তদের তাণ্ডবে নগরের ৮টি থানা ও ৮টি ফাঁড়ির অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ২১ কোটি টাকা। এর মধ্যে কোতোয়ালী থানার ১ কোটি ৫০ লাখ, পাহাড়তলী থানার ১ কোটি ৬০ লাখ, ডবলমুরিং ১ কোটি ২০ লাখ, হালিশহর ১ কোটি ৫০ লাখ, চান্দগাঁও ১ কোটি ২০ লাখ, বন্দর থানার ১ কোটি ৫০ লাখ, পতেঙ্গায় ৮০ লাখ, ইপিজেড থানায় ৭০ লাখ, সদরঘাট ৮০ লাখ ও আকবর শাহ থানায় ৭০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

এ ছাড়া পুলিশ ফাঁড়ির মধ্যে পাথরঘাটায় ৮০ লাখ, সদরঘাটে ১ কোটি, ইপিজেডে ৭০ লাখ, উত্তর হালিশহরে ৬০ লাখ, মোহরায় ৬০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়। এর বাইরে দামপাড়া পুলিশ লাইনসে ৬০ লাখ টাকার ক্ষতি নির্ধারণ করা হয়।

মামলার নথিপত্র পুড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে সিনিয়র আইনজীবী  অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান বলেন, ‘মামলার নথিপত্র ছাড়াও থানায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ডপত্র থাকে। মামলার নথি থানা ছাড়া অন্য কোনো সোর্স থেকে পাওয়ার সুযোগ নেই। মামলার নথি পুড়ে গেলে সংশ্লিষ্ট মামলার আসামিকেও আর ধরা যাবে না। মামলার আলামত পুড়ে গেলে আদালতে বিচারিক কার্যক্রম চালাতে বেগ পেতে হবে। আসামির অপরাধ প্রমাণও করা যাবে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত