বন্ধ দপ্তরে লাখ টাকার চা-চিনি!

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২৪, ০৮:০৮ এএম

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)। অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি তলানিতে নামানোর অভিযোগ উঠেছে সদ্য সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) শাহজাহান কবীরের বিরুদ্ধে। ব্রির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ইচ্ছেমতো সরকারি অর্থের অপচয় করে নিজের পকেট ভারী করেছেন শাহজাহান কবীর। বাদ যায়নি চা, চিনি, বিস্কুটের মতো ছোটখাটো কেনাকাটার খাতও। করোনাকালে যখন দাপ্তরিক সব কার্যক্রম বন্ধ ছিল, সেই সময়ও প্রতি মাসে ডিজির অফিসে অতিথি আপ্যায়নে প্রায় এক মণ করে চিনির বিল দেখানো হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে চা-চিনির এ খরচকে ‘হরিলুট’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া স্বেচ্ছাচারিতা, বিএনপি-জামায়াত তকমা দিয়ে বিজ্ঞানীদের হেনস্তা করা, এমনকি বিজ্ঞানীদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগও রয়েছে শাহজাহান কবীরের বিরুদ্ধে। অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে সরকারি অর্থ খরচ, নিয়োগবাণিজ্য, বিধি ভেঙে ইচ্ছেমতো পদোন্নতি, বিভিন্ন কাজে অস্বাভাবিক ব্যয় এবং শ্রমসাধ্য কাজের নামে অর্থ উত্তোলনসহ আরও বিস্তর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ‘বঞ্চিত’ কর্মকর্তাদের ক্ষোভের মুখে মহাপরিচালকের পদ থেকে স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়ার আবেদন করেন শাহজাহান কবীর। তবে তার দাবি, পদত্যাগপত্রে জোর করে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। এখন ডিজির পদে বহাল থাকতে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দপ্তরে শাহজাহান কবীর জোর তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে।

ব্রির ডিজি অফিসে ২০২০ সালের মার্চ মাসের পাঁচ দিনের অতিথি আপ্যায়ন খরচের বিলের পাঁচটি অনুলিপি দেশ রূপান্তরের হাতে এসেছে। ওই মাসের ১, ৫, ১১, ১৬ ও ২২ তারিখে কেনাকাটার ওই হিসাবে দেখা গেছে চা, চিনি, বিস্কুট, কফি, কফি ম্যাট, আনার ও মিনারেল ওয়াটার বাবদ প্রতিদিন ১০ হাজার ৫৫৪ টাকা খরচ করা হয়েছে। এ বাবদ মার্চ মাসে ৫২ হাজার ৭২৫ টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। এ হিসাবে তিন মাসে অন্তত দেড় লাখ টাকা খরচ দেখানো হয়েছে।

যদিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২০ সালের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে মহাপরিচালকের দপ্তরসহ সামগ্রিক কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ ছিল। এ সময়ে ডিজি শাহজাহানের অফিসে কোনো অতিথি যাওয়া তো দূরের কথা কোনো কর্মকর্তাও যাননি। এমনকি শাহজাহান নিজেও অফিসে যাননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিষয়টি তাদের নজরে আসার পর হোস্টেল ম্যানেজারের ইনডেক্স খতিয়ে দেখা হয়। সেখানে তারা দেখতে পান ওই তিন মাসের প্রতি মাসে ডিজির অফিসে চা, চিনি ও ফলমূল বাবদ অর্ধলক্ষাধিক টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত অভিযোগের তদন্ত করে কৃষি মন্ত্রণালয়। ২০২২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা জানায় তদন্ত কমিটি।

কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ‘২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত মহাপরিচালক ও পরিচালক প্রশাসনের রিভলডিং ফান্ডসহ হোস্টেল ফান্ড থেকে আপ্যায়ন বাবদ অস্বাভাবিক ব্যয় করা হয়েছে। অর্থাৎ মহাপরিচালকের দপ্তরে করোনা প্রাদুর্ভাবের সময় চা-চিনির খরচ দেখিয়ে হরিলুট করার অভিযোগটি প্রমাণিত হয়েছে।’

ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘২০১৬-১৭ অর্থবছরে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মূল ফটক নির্মাণ করা হয়। স্থপতি মৃণাল হকের নকশা করা এ ফটক নির্মাণে ব্যয় দেখানো হয় ৫০ লাখ টাকা। কিন্তু মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সেই ফটক ভেঙে আবারও নতুন ফটক নির্মাণ করা হয়। স্থপতি শ্যামল চৌধুরীর নকশা করা এ ফটক নির্মাণে ব্যয় দেখানো হয় ৫৫ লাখ টাকা। মন্ত্রণালয়ের তদন্তে বিষয়টি বেরিয়ে এসেছে। তদন্ত কমিটি মনে করে, অহেতুক রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় করা হয়েছে। এ ছাড়া একটি প্রকল্পের দুজন পরিচালকের জন্য দ্বিতলবিশিষ্ট ভবন তৈরি না করে মহাপরিচালকের জন্য ডুপ্লেক্স বাংলো তৈরি করা হয়েছে। অথচ পুরনো বাংলো সংস্কারে খরচ দেখানো হয়েছে প্রায় ২০ লাখ টাকা। পুরনো বাংলো ভাঙার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ মতামত বা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নেননি শাহজাহান। তদন্ত কমিটি মনে করে, মহাপরিচালকের “এ” শ্রেণির বাংলো ভাঙায় একদিকে সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে, অন্যদিকে দুজন পরিচালকের জন্য কোনো বাসস্থান নির্মাণ করা হয়নি।’

অভিযোগ রয়েছে, কৃষি মন্ত্রণালয়ের শ্রমিক নীতিমালা অনুসরণ না করে ইচ্ছেমতো শ্রমিক নিয়োগ ও পদায়ন করেছেন শাহজাহান কবীর। আর এসব নিয়োগের জন্য নেওয়া হয় মোটা অঙ্কের ঘুষ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ব্রির এক বিজ্ঞানী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ধান গবেষণার মাঠে ময়লাযুক্ত কালো মাটি ফেলে তার খরচ দেখানো হয় ১০ কোটি টাকা। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা একে অস্বাভাবিক এবং অবাস্তব বলছেন। তারা মনে করছেন, মাটি ফেলার নামে হরিলুট করা হয়েছে সরকারি অর্থ। এমন আরও অনেক খাত আছে যেখানে শাহজাহান লুটপাট করেছে। কিন্তু তার প্রমাণ খুঁজে পাওয়া কঠিন।’

এ বিজ্ঞানী আরও বলেন, ‘শাহজাহান ধান গবেষণায় যত অপকর্ম করেছেন, তার বিবরণ দিয়ে শেষ করা যাবে না। ডিজি অফিসে বসে কাজ করেছেন, অথচ কষ্টসাধ্য কাজের জন্য তিনি সরকারি কোষাগার থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়েছেন। এগুলো আরও তদন্ত হওয়া দরকার।’

২০২২ সালে কৃষি মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘কষ্টসাধ্য কাজের জন্য ডিজিসহ চার কর্মকর্তা নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রতি বছর একাধিকবার মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ উত্তোলন করার অভিযোগটি প্রমাণিত হয়েছে। এতে সরকারের প্রায় ৫৮ লাখ টাকা অপচয় হয়েছে। তাছাড়া শ্রমসাধ্য কাজের জন্য ৩৬ জন কর্মচারীকে মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ প্রদান করেছেন, যা আর্থিক বিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ব্রির তিনজন বিজ্ঞানী অভিযোগ করে বলেন, ২০১৩ সালের ২২ জুলাই ধান গবেষণার কয়েকজন বিজ্ঞানীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে শ্রমিকরা। ওই ঘটনায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের তদন্তে ‘মূল পরিকল্পনাকারী ও ইন্ধনদাতা’ হিসেবে তৎকালীন পরিসংখ্যান বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শাহজাহান কবীরকে চিহ্নিত করা হয়। ওই ঘটনার পর প্রাথমিকভাবে তাকে রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয়ে বদলি করা হয়। তবে তিনি নতুন কর্মস্থলে না গিয়ে সদর দপ্তরে অবস্থান করেন এবং কয়েক মাসের মধ্যেই পরিচালক (প্রশাসন ও সাধারণ পরিচর্যা) পদে পদোন্নতি পান। আর পরিচালক হওয়ার পর তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। ২০১৫ সালে তার বিরুদ্ধে জনবল নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় কৃষি মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি ড. শাহজাহান কবীরের ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ড অব্যাহতভাবে পর্যবেক্ষণে রাখা এবং বিতর্কিত এ কর্মকর্তাকে নিয়োগের কোনো পর্যায়েই সম্পৃক্ত না করার সুপারিশ করে। এসব ঘটনার পরও তাকে মহাপরিচালকের চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে বসার পর আগের চেয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন শাহজাহান কবীর। জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার দুর্ব্যবহারের বিষয়টি যেন হয়ে ওঠে নিয়মিত কাজ।

ব্রির আরেক বিজ্ঞানী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেক মেধাবী বিজ্ঞানীকে বিএনপি-জামায়াত ট্যাগ দিয়ে পদোন্নতি দেননি শাহজাহান। তৎকালীন সরকারের হয়ে অতি উৎসাহী ভূমিকা পালন করেন। সরকারের পতন হলে বঞ্চিতরা তার অপসারণ চেয়ে আন্দোলন করেছেন। তার অত্যাচারে যারা চাকরি ছেড়ে গিয়েছিলেন, তারাও সেই আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন।’

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শাহজাহান কবীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, জোর করে তার কাছ থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে যাওয়ার আবেদনে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। এর কয়েক ঘণ্টা পর তিনি চিঠি দিয়ে মন্ত্রণালয়ে বিষয়টি অবহিত করেছেন। তার দাবি, এখনো তিনি ব্রির ডিজি পদে আছেন।

অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ এবং মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে তার সত্যতা মেলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি সবাইকে নিয়ে প্রতিষ্ঠান চালিয়েছি। যারা তখন সুবিধা ভোগ করেছে এখন তারাই আন্দোলন করছে। যারা চাকরি ছেড়ে গিয়েছিল তারাও এ আন্দোলনে যুক্ত হচ্ছে। আমার পদোন্নতি ঠেকানোর জন্য অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছিল। কিন্তু পদোন্নতি ঠেকাতে পারেনি।’ কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের একটি গ্রুপ তার বিরুদ্ধে কাজ করেছে বলেও দাবি করেন শাহজাহান কবীর।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত