‘আয়নাঘর’ নিয়ে সমালোচিত জিয়াউল ৮ দিনের রিমান্ডে

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২৪, ০৬:৫৫ এএম

ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সাবেক মহাপরিচালক ও সম্প্রতি সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানকে নিউ মার্কেট থানার একটি হত্যা মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আট দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। গতকাল শুক্রবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরফাতুল রাকিব রিমান্ডে নেওয়ার এ আদেশ দেন। এদিন বিকেলে আলোচিত সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানকে আদালতে হাজির করে নিউ মার্কেট থানা পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হত্যা মামলায় ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত আট দিন রিমান্ড মঞ্জুর করে। এর আগে গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকা থেকে জিয়াউল আহসানকে গ্রেপ্তারের কথা জানায় পুলিশ। এরপর তাকে নেওয়া হয় ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) মিন্টো রোডের কার্যালয়ে, সেখান থেকে আদালতে।

আওয়ামী লীগ সরকারে পতনের পর সেনাবাহিনীর উচ্চপর্যায়ে রদবদলের ধারাবাহিকতায় গত ৬ আগস্ট চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় জিয়াউল আহসানকে। নিউ মার্কেট থানার যে মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে, তার বাদী মোসাম্মৎ আয়েশা বেগম নামে এক নারী। তিনি মুন্সীগঞ্জের লৌহজং থানার বিক্রমপুর গ্রামের বাসিন্দা। গত ১৬ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতার ঘটনা ঘটে। ওইদিন বিকেল পৌনে ৬টার দিকে নিউ মার্কেট এলাকার মিরপুর রোডের টিসার্স ট্রেনিং কলেজের সামনে রক্তাক্ত অবস্থায় তার ছেলে মোহাম্মদ শাহজাহান আলী পড়েছিলেন। স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে প্রথমে ধানমন্ডির পপুলার হাসপাতালে নেন। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে সন্ধ্যা ৭টার দিকে চিকিৎসকরা শাহজাহানকে মৃত ঘোষণা করেন। শাহজাহান নিউ মার্কেট এলাকার বনানী সিনেমা হলের পাশের ফুটপাতে টুকিটাকি জিনিসপত্র বিক্রি করতেন (হকার)। তার মৃত্যুর ঘটনায় মা আয়েশা বেগমের করা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীদের সঙ্গে জামায়াত-শিবির ও বিএনপির কর্মীরা তার ছেলেকে এলোপাতাড়িভাবে কুপিয়ে আঘাত করে হত্যা করে। এই মামলায় এর আগে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানকে।

জিয়াউল আহসান সেনাবাহিনীর পাশাপাাশি র‌্যাব, এনএসআই এবং টেলিযোগাযোগ নজরদারির জাতীয় সংস্থা এনটিএমসিতে দায়িত্ব পালন করেছেন। কর্মজীবনের বিগত এক দশকের বেশি সময়ে গুম, খুন ও ব্যক্তিগত ফোনকলে আড়িপাতাসহ বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য তিনি সমালোচিত হয়েছেন। জিয়াউল আহসান ১৯৯১ সালের ২১ জুন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে পদাতিক কর্মকর্তা হিসেবে কমিশন লাভ করেন। তিনি সেনাবাহিনীর একজন প্রশিক্ষিত কমান্ডো ও স্কাই ডাইভার।

আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার এক বছরের মাথায় ২০০৯ সালে মেজর পদে থাকাকালে জিয়াউলকে র‌্যাব-২-এর সহঅধিনায়ক করা হয়। লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে ওই বছরের ২৭ আগস্ট র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালকের দায়িত্ব পান তিনি। তিন বছরের ব্যবধানে ২০১৩ সালে তিনি পদোন্নতি পেয়ে কর্নেল হন এবং একই সময়ে তাকে র‌্যারের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। আড়াই বছর পর ২০১৬ সালের এপ্রিলে পদোন্নতি পেয়ে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হলে তাকে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থায় পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০১৮ সালের ২১ জুলাই মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতির পর জিয়াউল আহসানকে এনটিএমসির মহাপরিচালক করা হয়। এই পদে থাকা অবস্থায় গত ৬ আগস্ট তিনি চাকরিচ্যুত হন।

ফোনকলে আড়িপাতার জন্য ছিলেন সমালোচিত : এনটিএমসিতে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই জিয়াউল আহসান সরকার ও বিরোধীদলীয় জ্যেষ্ঠ এবং জনপ্রিয় নেতাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ব্যক্তিগত ফোন আলাপ রেকর্ড করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এনটিএমসিতে কর্মরত ছিলেন এমন এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘জিয়াউল আহসান স্যার অনেকের ব্যক্তিগত ফোনালাপ রেকর্ড করতেন। বিশেষ করে বিএনপি নেতাদের কল রেকর্ড করে সেগুলো শুনতেন।’

গুম-খুনে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ : আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াতের শতাধিক নেতাকর্মী গুম-খুনের শিকার হন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ তালিকায় ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম, সাজেদুল ইসলামসহ একাধিক নেতাও ছিলেন। গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের সঙ্গে জিয়াউল আহসান সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন বলে আলোচনা রয়েছে। বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর গুমের ঘটনার সঙ্গে জিয়াউল আহসান সরাসরি জড়িত ছিলেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের সাত খুনেও ছিল সম্পৃক্ততা : ২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জে আলোচিত সাত খুনের ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছিল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে। তখন তিনি র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ছিলেন। সেই সময় হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি তাকে জিজ্ঞাসাবাদও করে।

‘আয়নাঘর’ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ : ফোন কলে আড়িপাতা, সেগুলো রেকর্ড করা এবং ছড়িয়ে দেওয়াসহ গুম হওয়া ব্যক্তিদের আটকে রাখার স্থান হিসেবে পরিচিতি পাওয়া ‘আয়নাঘরের’ কুশীলব বলা হয় সাবেক এ প্রভাবশালী সেনা কর্মকর্তাকে। তবে আদালতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে নিজেই আয়নাঘরে বন্দি ছিলেন বলে অভিযোগ করেন জিয়াউল আহসান। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরাফাতুল রাকিবের আদালতে রিমান্ড শুনানিতে তিনি কিছু কথা বলার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করেন। আদালত অনুমতি দেওয়ার পর তিনি বলেন, গত ৭ আগস্ট রাতে তাকে বাসা থেকে একটি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা নিয়ে আসে। তারপর বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত গত আট দিন ‘আয়নাঘরে’ বন্দি ছিলেন। তিনি কোনো গুম বা খুনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন বলেও দাবি করেন।

কেউ যেন জিয়াউল হওয়ার সাহস আর না পায় : কমিশন গঠন করে বহুল আলোচিত জিয়াউল আহসানের বিচারের দাবি জানিয়েছেন মায়ের ডাক নামে একটি সংগঠনের সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এটা নিশ্চিত করা হোক, যেন নতুন করে আর কেউ গুম-খুনের শিকার না হন। এমন দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা হোক, যাতে নতুন করে কেউ যেন জিয়াউল আহসান হওয়ার সাহস না পায়।’ জিয়াউল আহসানকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানার পর এক প্রতিক্রিয়ায় এসব কথা বলেন সানজিদা ইসলাম।

মায়ের ডাকের সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম দেশে ২০০৯ সাল থেকে বিভিন্ন সময় গুম হওয়াদের সন্ধান ও জড়িতদের শাস্তির দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত