২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া যুদ্ধ এখনো চলছে। চলতি বছরের মে মাসের মাঝামাঝি রাশিয়া উত্তর-পূর্ব দিক থেকে ইউক্রেনে আক্রমণ করে। খারকিভ অঞ্চলে আকস্মিক আক্রমণ চালিয়ে তারা কিছু অঞ্চল নিজেদের দখলে নেয়। ওই আক্রমণের সময় রাশিয়া-ইউক্রেন সীমান্ত থেকে পাঁচ কিমি দূরে ভোভচানস্ক শহরের চারপাশে প্রচণ্ড লড়াই শুরু হয়। এরপর রাশিয়া হয়তো আরও সামনের দিকে এগোতে পারে এবং সম্ভবত ইউক্রেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর খারকিভও দখল করতে পারে, যেখানে যুদ্ধের আগে ১৪ লাখ মানুষের বসবাস ছিল। ইউক্রেনের কাছে পর্যাপ্ত গোলাবারুদ নেই। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় এক মাস দেরি হওয়ায় পশ্চিমা সামরিক সহায়তা আসতে বেশ সময় নেয়। মনে হচ্ছে রাশিয়া তার অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছে এবং তারা যুদ্ধের পরবর্তী পর্যায়ে একটি সফল গ্রীষ্মকালীন আক্রমণ চালাতে পারে। কিন্তু গত ৬ আগস্ট ইউক্রেনের কয়েকটি সেনা ইউনিট বিস্ময়করভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে রাশিয়ার কুরস্ক ওব্লাস্টে ঢুকে পড়ে। কুরস্ক আক্রমণের এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য এখনো রহস্যঘেরা এবং এ নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে। তবে এটি ইতিমধ্যে স্পষ্ট, ইউক্রেনের রাশিয়া আক্রমণের সিদ্ধান্ত পুতিনের সীমানা ও পশ্চিমাদের ক্রমবর্ধমান ভয়কে উপহাসে পরিণত করতে সফল হয়েছে।
ইউক্রেনের সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য সম্ভবত দেশের দক্ষিণ ও পূর্বে সামরিক চাপ কমিয়ে আনা, যেখানে গত কয়েক মাসে রাশিয়া ধীরে ধীরে কিন্তু স্থিরভাবে অগ্রসর হচ্ছে। কিছুটা সুরক্ষিত সীমান্তে আক্রমণ ও রাশিয়ার ভূখণ্ড দখল করে ইউক্রেনের সেনারা মনে করছেন, তারা যুদ্ধের সম্মুখ সারির সেনাদের তুলে নিতে ক্রেমলিনকে চাপ দিতে পারে, যেগুলো স্বয়ং রাশিয়ার সুরক্ষা দিতে পুনরায় মোতায়েন করা হয়েছিল।
এটা দীর্ঘদিন ধরেই স্পষ্ট, ইউক্রেন বাস্তবে অনেক বড় ও ধনী রাশিয়ান ফেডারেশনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জয়ের আশা করতে পারে না। কিয়েভের সামরিক সাফল্য নির্ভর করছে যুদ্ধের গতিশীলতা ও কৌশলের ওপর, যা একদিকে ইউক্রেনের কমান্ডারদের আপেক্ষিক তৎপরতা কাজে লাগাতে দেয়; অন্যদিকে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর অনেক জটিল সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় সুযোগ নিতে সাহায্য করে। কুরস্ক ওব্লাস্টের আক্রমণে ইউক্রেন ঠিক এটাই অর্জন করেছে। মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে রাশিয়ার দুয়ারে যুদ্ধ নিয়ে এসে ইউক্রেন তাদের শত্রুদের মনোবলের ওপর একটি শক্তিশালী আঘাত হানার সুযোগ পেয়েছে। এতে তাদের মধ্যে এই আশা জাগিয়েছে যে, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি এখনো গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সাফল্য অর্জন করতে পারে।
সর্বোপরি রাশিয়ার ওপর ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর বর্তমান আক্রমণটি সবচেয়ে বড়। যদি রাশিয়া সম্ভাব্য পারমাণবিক হামলার আশঙ্কা বেড়ে যাওয়া নিয়ে জোরেশোরে প্রস্তুতি নিত, তাহলে এটি তার জন্য বিবিধ হুমকির বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ এক পদক্ষেপ হয়ে দাঁড়াত। বাস্তবে পুতিন আক্রমণকে কমিয়ে আনার চেষ্টা করে নিজের প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন; অথচ তিনি এমন ভাব ধরেছিলেন, সবকিছু এখনো তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী চলছে। ইউক্রেনের আক্রমণ শুরু হওয়ার পর প্রথম গণবিবৃতিতে পুতিন একটু নরমভাবে এটি বড় আকারের উসকানি হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। ক্রেমলিন কুরস্ক ওব্লাস্টে এক জরুরি অবস্থা জারি করে, যা পরে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে রূপ দেওয়া হয়। এই সংযত আইনশৃঙ্খলার ভাষা ও ন্যাটোর সঙ্গে অস্তিত্বের লড়াইয়ে স্বাভাবিকভাবে উত্তপ্ত শব্দ বিনিময়ের মধ্যে পার্থক্যটা খুব কমই পরিস্থিতি জটিল করতে পারে।
প্রতিপক্ষের ওপর চাপ তৈরি করতে রাশিয়ার বড় ধরনের আক্রমণ চালানো জরুরি হলেও, এ জন্য তারা সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় পর্যাপ্ত রিজার্ভ বা সেনাবাহিনীকে আনতে পারছে না। এটি আপাতদৃষ্টিতে রাশিয়ার এক ধরনের অক্ষমতা। অন্যদিকে পশ্চিমের দেশগুলো থেকে ইউক্রেনে নতুন সামরিক সরবরাহ আসতে শুরু করেছে, যা তাদের প্রতিরক্ষায় সাহায্য করবে। ইউক্রেনের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের রিসার্চ ফেলো মাইকোলা বিয়েলেসকভ বলেছেন যে, মার্কিন কংগ্রেস এপ্রিলে ইউক্রেনের জন্য ছয় হাজার ১০০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা প্যাকেজ পাস করার পরই রাশিয়া আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে।
কিন্তু এই সুযোগের জানালা বন্ধ হতে শুরু করেছে। এই নতুন সামরিক সহায়তা প্যাকেজের ফলে ভূমিতে রাশিয়ার শক্তি হ্রাস পাবে। এ কারণেই অনেক স্থান থেকে ইউক্রেনকে সরে যেতে হলেও সেই ব্যবধান এখন কমে আসছে। তবে মে মাসের শেষের দিকে, খারকিভ অঞ্চলে রাশিয়ার আক্রমণের গতি কমে যায়। কিন্তু রাশিয়ার আক্রমণের গতি ধীর হয়ে গেলেও এবং ইউক্রেনীয় বাহিনী পুনরায় সংগঠিত হয়ে তাদের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হলেও তার অর্থ এই নয় যে, রাশিয়া হেরে যাচ্ছে।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুরোদমে আক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে অনেক কিছুই পরিকল্পনামাফিক এগোয়নি। তবে ইউক্রেনের প্রতি পশ্চিমের সমর্থনকে ছাড়িয়ে যাওয়ার ব্যাপারে মস্কোর সংকল্প আগের মতোই শক্তিশালী রয়েছে। ইউক্রেনের জন্য মার্কিন কংগ্রেসে নতুন সামরিক সহায়তা প্যাকেজ গৃহীত হওয়ার পরে রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী দিমিত্রি মেদভেদেভ লিখেছেন, ‘আমরা অবশ্যই জিতব, ৬১ বিলিয়ন রক্তাক্ত মার্কিন ডলার বিনিয়োগ সত্ত্বেও জিতব। শক্তি এবং সত্য আমাদের পক্ষে।’
পুতিন উসকানি পেতে পারেন এই ভয়ে, পশ্চিমা বিশ্ব দুই বছরেরও বেশি সময় ধীরগতিতে ইউক্রেনে সামরিক সহায়তা দিয়েছে। যেহেতু ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী এখন পুতিনের সীমানা অতিক্রম করে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা ছাড়াই রাশিয়া আক্রমণ করেছে, সুতরাং কিয়েভের আত্মরক্ষার ক্ষমতায় সীমাবদ্ধতা বা যুদ্ধজয়ে ইউক্রেনের প্রয়োজনীয় অস্ত্রগুলোর ব্যাপারে অস্বীকার করার আর কোনো অজুহাত নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী এবারের ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ। এই যুদ্ধ প্রয়োজন বা পূর্বাভাসের চেয়েও অনেক বেশি সময় ধরে চলছে। এ যেন এক রহস্যঘেরা বিতর্কে রূপ নিয়েছে। যার শেষ পরিণতি কী হবে এ মুহূর্তে তা বলা মুশকিল।
লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক
