স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনের বিষয়ে সরকারের প্রাথমিক ভাবনার কথা জানিয়ে অন্তর্র্বর্তী সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘গণমাধ্যমের জন্য হুমকি হতে পারে এমন বিতর্কিত ও সমালোচিত আইন ‘পুনর্বিবেচনা’ করা হবে।
গতকাল রবিবার তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে প্রথমবার দপ্তরে গিয়ে কর্মকর্তা এবং সংবাদকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে গণমাধ্যমে স্বাধীনতা ‘ফিরিয়ে আনতে’ এক গুচ্ছ সংস্কারের কথা বলেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম এ সমন্বয়ক।
মতবিনিময়ের শুরুতেই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নিহত ছাত্র, জনতা এবং সাংবাদিকদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
নাহিদ বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন সময়ে শুনেছি মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বাধা দেওয়া হয়েছে। ফ্রিডম অব প্রেস যদি না থাকে, ফ্রিডম অব স্পিচ কিন্তু ঠিক হয় না। সেই জায়গায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় আমাদের কাজ করতে হবে।’
গণমাধ্যমকে চাপমুক্ত রাখতে কোনো নীতিমালা বা স্থায়ী কোনো সমাধান হচ্ছে কি না, জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা ইতিমধ্যেই আমি বলেছি। সেই বিষয়ে বিদ্যমান যে আইন এবং বিধিনিষেধগুলো আছে সেগুলোতে যদি সংস্কার আনার প্রয়োজন মনে করা হয়, সেগুলো আপনাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে আমরা উদ্যোগ নেব।’
এ সময় সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট নিয়ে উপদেষ্টা বলেন, ‘এটি পুনর্বিবেচনা করা হবে। নির্দিষ্ট কিছু বিধিমালা নিয়ে অভিযোগ আছে। সেগুলো নিয়ে আমরা কথা বলব এবং এ বিষয়ে একটা সমাধানে আসব।’
কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ইন্টারনেট বন্ধ রাখা প্রসঙ্গে নাহিদ বলেন, ‘কী হচ্ছিল কিছুই জানা যাচ্ছিল না তখন। তথ্যের কোনো প্রবাহ ছিল না। অন্যদিকে ইলেকট্রনিক মিডিয়া কিন্তু সম্পূর্ণ সরকারের করায়ত্তে ছিল। আমাদের কোনো বক্তব্য সে সময় প্রচার করা হতো না। এটা আমি ব্যক্তিগত অভিমত থেকে বলছি, আমাদের বিভ্রান্তিকর বক্তব্য যেটা আমরা বলিনি বা মিসকোট করে প্রচার করা হতো। তারপরও সেই সময় আমরা দেখেছি যে, কিছু প্রিন্ট মিডিয়া আমাদের সাপোর্ট দিয়েছে। আরও অনেক মিডিয়া আমাদের অনেকভাবে সাপোর্ট দিয়েছে। রিপোর্টাররা আমাদের সহযোগিতা করেছেন। হয়তো হাউজ বা মালিকের কারণে অনেক কিছু করতে পারেননি। আমরা চাই না এগুলো পুনরায় ফিরে আসুক।’ এ সময় উপদেষ্টা জানান, সাংবাদিকদের মধ্যে তিনি কোনো ধরনের দলীয়করণ দেখতে চান না।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ছাত্রদের আন্দোলনে অনেক ফুটেজ, অনেক তথ্য গণমাধ্যমের কাছে আছে। হয়তো আপনারা সেসব সেই সময়ে প্রকাশ করতে পারেননি। এ সময়ে কিন্তু এগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, তদন্ত চলবে, এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিকভাবে, দেশীয়ভাবে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। এটা ন্যাশনাল মেমোরিরও একটা বিষয়। সে ক্ষেত্রে তথ্য-উপাত্তগুলো আপনারা যদি আমাদের কাছে সরবরাহ করেন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দেন, সেটি আমাদের জন্য ভালো হবে।’
গণমাধ্যম সূচকে উন্নতির দিকে নজর দেওয়া হবে জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যম সূচকে আমরা অত্যন্ত নিচের দিকে ছিলাম। দক্ষিণ এশিয়ায় আফগানিস্তানের পর আমাদের সূচক ছিল, এ বিষয়গুলো আমাদের অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে অনুধাবন করতে হবে।’
এ ছাড়া আন্দোলনে হতাহত সাংবাদিক ও তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোরও তাগিদ দিয়েছেন এই উপদেষ্টা। তিনি বলেছেন, ‘নির্দোষ, নিরপরাধরা যাতে কোনো হয়রানির শিকার না হয়, সেটি দেখতে উপদেষ্টাদের নির্দেশনা দেওয়া আছে। মামলা হলে সুস্পষ্ট তদন্তের ভিত্তিতে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সাংবাদিকদের বেতন কাঠামো নিয়ে নীতিমালা প্রয়োজন বলে মনে করেন নাহিদ। তিনি বলেন, ‘সাংবাদিকদের বেতন কাঠামো নিয়ে অনেক অসন্তোষ রয়েছে। আমরা যদি মেধাবীদের উৎসাহিত করতে না পারি তাহলে সাংবাদিকতা এগোবে না। যারা রিপোর্টার এবং জুনিয়র লেভেলে কাজ করে, তাদের বেতন অত্যন্ত কম, অনেক ক্ষেত্রে বেতন কাঠামো মানাও হয় না।’
সাগর-রুনি হত্যাকান্ড নিয়ে প্রহসন : সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরোয়ার ও মেহেরুন রুনির হত্যাকাণ্ড নিয়ে ‘প্রহসন করা হয়েছে’ বলে মন্তব্য করে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘বারবার এ মামলার প্রতিবেদন পেছানো হয়েছে। সাগর-রনি হত্যাকাণ্ডসহ এ ধরনের যত হত্যাকাণ্ড হয়েছে, সাংবাদিকদের ওপর যত নিপীড়ন হয়েছে, এ বিষয়গুলোর তদন্ত করতে হবে এবং সরকারের জায়গা থেকে মন্ত্রণালয়ের জায়গা থেকে এ নিয়ে ভূমিকা পালন করব।’
