হঠাৎ হওয়ায় ছিল না পর্যাপ্ত প্রস্তুতি

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৪, ০৬:১৫ এএম

প্রবল বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা ঢলে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল। ওই অঞ্চলের ছয় জেলার পাশাপাশি দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দুই জেলায়ও দেখা দিয়েছে বন্যা। চলমান বন্যায় দেশের ১২ জেলার অর্ধশতের বেশি উপজেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ৪ লাখ ৪০ হাজার ৮৪০টি পরিবার। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ৩৬ লাখ মানুষ। ঘটেছে হতাহতের ঘটনাও। সবমিলিয়ে দেশের জন্য বন্যা বেশ বড় মানবিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগে থেকে এ বিষয়ে সতর্ক করা হলেও পূর্ব প্রস্তুতি না থাকায় হতাহত ও ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে। তবে বন্যা পরিস্থিতির বিষয়ে সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। অন্যদিকে দুর্গতদের উদ্ধারে স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের সদস্যরা কাজ করছেন। এ ছাড়া শিক্ষার্থী, স্থানীয় মানুষ ও নানা সংগঠন স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে বন্যার্তদের পাশে দাঁড়িয়েছে।

ভয়াবহ এ বন্যার জন্য গোমতী নদীর উজানে ভারতের ত্রিপুরায় ডুম্বুর জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের বাঁধ খুলে দেওয়াকে দায়ী করছেন অনেকে। অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামও ভারতকে দোষারোপ করেছেন। তবে ভারত সে অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

দেশের বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, এবারের বন্যার মূল কারণ, টানা অতিভারী বর্ষণ ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকা। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর আগস্ট মাসের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে এবং গত রবিবার বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রও তাদের বিশেষ আউটলুকে চলতি মাসের শেষে দেশের কয়েকটি এলাকায় ভারী বর্ষণ ও তার কারণে বন্যা দেখা দেওয়ার বিষয়ে পূর্বাভাস দিয়েছিল। তবে সেই পূর্বাভাস মেনে আগাম কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেই ক্ষয়ক্ষতি বেশি হওয়ার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে।

এদিকে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের গুগল ইন্টার অ্যাকটিভ মানচিত্রে দেখা গেছে, গাঙ্গেয় অববাহিকার উজানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার রাজ্যের অনেক অঞ্চলেই চলছে বন্যা পরিস্থিতি। আবহাওয়ার আশু উন্নতি না হলেও ওই পানি ভাটিতে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। আরও ভয়াবহ হতে পারে উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বন্যা।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান জানান, মৌসুমি লঘুচাপজনিত ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। এই সময় পূর্ণিমার কারণে আমাদের সাগরেও পানির লেভেল হাই ছিল। পানিও সহজে নামতে পারেনি। উঁচু জোয়ার ও ভারী বৃষ্টিপাত এসবের সম্মিলিত প্রভাবে আমাদের এই আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি তীব্র আকার ধারণ করেছে।

বন্যার পূর্বাভাস সম্পর্কে বলেন, আমাদের ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যমেয়াদি যে পূর্বাভাস দেওয়া হয় সেখানে আকস্মিক বন্যার পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হয় না। এক থেকে তিন দিনের যে পূর্বাভাস দেওয়া হয় সেখানে সঠিক বন্যার প্রকৃত তথ্য দেওয়া সম্ভব হয়। তবে মধ্যমেয়াদি যে পূর্বাভাস ছিল সেখানে ভারী বৃষ্টিপাতের কথা বলা হয়েছে। কিছু পয়েন্টে পানি বৃদ্ধি পেতে পারে এমন পূর্বাভাসও ছিল। তবে বৃষ্টির পরিমাণ যে কয়েকগুণ বেশি ছিল, এটা আমাদের প্রাথমিক ধারণা ছিল না।

তিনি বলেন, হবিগঞ্জ, কুমিল্লা, ফেনী ও চট্টগ্রাম এই জায়গাগুলোতে নদীবাহিত বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এখন পরিস্থিতি খারাপ রয়েছে। আমরা আশা করছি আগামী ২৪ ঘণ্টায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে। কিছু কিছু পয়েন্টে পানি কমতে থাকবে। আগামী ৪৮ ঘণ্টায় অনেক জায়গাতেই পানি কমতে শুরু করবে।

রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান মো. এজাজ বলেন, একদিকে উজান থেকে আসা পানি, অন্যদিকে বৃষ্টিপাত, দুই কারণে আজকের বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বৃষ্টি হবে, পানি আসবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু পানিটা যাবে কোন দিক দিয়ে? বছর বছর ধরে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা নদী-খাল সবই ভরাট করেছে। সরকারের হিসাবে দেশে এসব দখলদারের সংখ্যা এক লাখের ওপরে। কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর ও ফেনীতে ১২ হাজার দখলদার রয়েছে। তারা নদী-খাল সব ভরাট করে দখল করেছে। এই দখলকে জিইয়ে রেখে বন্যা মোকাবিলা করা সম্ভব না। তিনি বলেন, প্রতি বছর আমাদের দেশে বন্যা হয়। ভবিষ্যতে এটি আরও বাড়বে। কিন্তু আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের কোনো জবাবদিহিতা নেই। তাদের কাজ হচ্ছে বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে বলা, আমাদের সব প্রস্তুতি রয়েছে। এই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে এটিকে কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে হবে।

সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সাংবাদিকদের বলেন, ভারতের উজানে এবং দেশের বন্যাকবলিত এলাকায় উভয় স্থানেই মুষলধারে বৃষ্টি হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের বন্যা এড়ানোর উপায় খুঁজতে অফিশিয়াল চ্যানেলে আলোচনা চলছে। বন্যার্তদের পুনর্বাসন না হওয়া পর্যন্ত উপদেষ্টারা আলোচনা চালিয়ে যাবেন। তিনি বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত বন্যা উপদ্রুত মানুষের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা না হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত এটার পুনর্বাসনের পূর্ণ ব্যবস্থা না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত এটা নজরদারিতে থাকবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত