গত ৫ আগস্ট, দুপুর ২টা, ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ করছে। বন্ধু রাকিব এলে তাকে নিয়ে রাজধানীর মিরপুর ১৪ নম্বর মোড়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ঝালমুড়ি খাচ্ছিলেন সাগর মিয়া (১৮)। হঠাৎ আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার দিকে গুলি নিক্ষেপ করতে দেখা গেল। পুলিশের পেছন থেকে লুঙ্গি পরা কয়েকজন রাইফেল দিয়ে গুলি করছিল। তাদের মাথায় হেলমেট, কয়েকজনের পরনে লুঙ্গি। ছাত্র-জনতার দিকে এলোপাতাড়ি গুলি করছিল তারা। এ দৃশ্য দেখতে দেখতে হঠাৎ পেটে ও হাতে গুলিবিদ্ধ হন সাগর।
সাগর মিয়া ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ১০১ নম্বর ওয়ার্ডের ১১ নম্বর বেডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তার পেটে অস্ত্রোপচার (অপারেশন) করে গুলি বের করা হয়েছে। পেটের নিচ থেকে বুক পর্যন্ত সেলাই করা। বাম হাত সাদা কাপড় দিয়ে ব্যান্ডেজ করা। ডান দিকে কাত হতে পারলেও বাম দিকে কাত হতে পারছেন না। চিকিৎসক বলছেন, সাগর আগের চেয়ে অনেকটা সুস্থ, তার দুটি অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। তাকে দীর্ঘ সময় বিশ্রামে থাকতে হবে।
জীবনের তাগিদে অল্প বয়সেই পরিবারের হাল ধরতে হয়েছে সাগরকে। তিনি প্রোটেকশন ওয়ান প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করেন। এ কোম্পানির হয়ে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথের নিরাপত্তাকর্মীর দায়িত্ব পালন করছিলেন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার সময় দায়িত্বরত ছিলেন। তার বুথের পাশেই একটি ঝালমুড়ির দোকান থেকে দুই বন্ধু মুড়ি কিনে খাচ্ছিলেন। এমন সময় সংঘর্ষ শুরু হয়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সাগরের গায়ে দুটি গুলি লাগে।
গুলিবিদ্ধ সাগর ঢামেক হাসপাতালের বেডে শুয়ে দেশ রূপান্তরকে বলছিলেন, ‘গত ৫ আগস্ট দুপুরে হঠাৎ মিরপুর ১৪ নম্বর এলাকায় পুলিশের পেছন থেকে কিছু লোক রাইফেল দিয়ে গুলি করছিল। তাদের মধ্যে অনেকের মাথায় হেলমেট ছিল, তারা লুঙ্গি পরা, তাদের সবার মুখই বাঁধা ছিল। দেখে মনে হয়েছে, তারা ছাত্রলীগ বা যুবলীগের নেতাকর্মী। আমি আমাদের এটিএম বুথের সামনে বসেই ঝালমুড়ি খাচ্ছিলাম। হঠাৎ আমার গায়ে গুলি লাগে। পরে কে বা কারা আমাকে হাসপাতালে নিয়ে আসে। তখন আমার জ্ঞান ছিল না। পরে জ্ঞান ফিরলে দেখি আমি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে। আমাকে সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেলে নেওয়ার জন্য সবাই রেডি হচ্ছে। ঢামেকে অপারেশনের মাধ্যমে আমার পেট থেকে গুলি বের করা হয়। আর হাতের অবস্থা খুব খারাপ। হাত নাড়াতে পারছি না।’
সাগরের বাবা জসিম উদ্দিন পেশায় রিকশাচালক। মা রুমা আক্তার গার্মেন্ট শ্রমিক। তার রয়েছে ১৫ বছর বয়সী ছোট বোন ফারজানা আক্তার। ভাইবোনের মধ্যে সাগর বড়। বাবা-মায়ের উপার্জনে সংসার চলছিল না, তাই অল্প বয়সেই পরিবারের হাল ধরতে নিরাপত্তাকর্মীর কাজ শুরু করছিলেন তিনি। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, আজ গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালের বেডের পাশে দিন কাটাচ্ছে তার পুরো পরিবার। ছেলের সেবা করার জন্য মায়ের দীর্ঘ ছুটির কারণে চাকরি চলে গেছে। বাবা জসিম উদ্দিনও বৃদ্ধ, আগের মতো রিকশা নিয়ে বের হতে পারেন না। ছোট বোনের জন্য তার চিন্তার শেষ নেই।
