চারদিকে যতদূর চোখ যায়, লোকে-লোকারণ্য। কোনো জনসভা, প্রতিবাদ সমাবেশ কিংবা সাংস্কৃতিক কোনো অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এ মানুষগুলো আসেনি। তারা এসেছিল বন্যাদুর্গতদের সাহায্যের জন্য। সঙ্গে ছিল নগদ টাকা, শুকনো খাবার, জামা-কাপড়, ওষুধসহ বিভিন্ন ধরনের ত্রাণসামগ্রী আর দুর্গতের জন্য অকৃত্রিম ভালোবাসা।
গতকাল শুক্রবার দিনভর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকার চিত্র ছিল এটি। কদিন আগেও যেখানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে উত্তাল ছিল এলাকাটি।
গতকাল সকাল থেকে সারা দিনে এক কোটি টাকারও বেশি নগদ সংগ্রহ করেছেন টিএসসিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের স্বেচ্ছাসেবীরা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
নগদ অর্থের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ জমা পড়েছে বিভিন্ন ধরনের ত্রাণসামগ্রী। মানুষ তাদের ব্যক্তিগত গাড়িতে করে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দিতে এসেছে। কেউবা এসেছে হেঁটে। এসব ত্রাণ জমা করায় টিএসসির ক্রীড়াকক্ষ ও ক্যাফেটারিয়া বিশাল ত্রাণভান্ডারে পরিণত হয়েছে।
ত্রাণ প্যাকেটজাত ও বিতরণের কাজও শুরু হয়েছে ইতিমধ্যে। বিকেলে বিজিবির একটি কাভার্ড ভ্যানভর্তি করে ত্রাণ শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
টিএসসিতে কাজ করছেন সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সহসমন্বয়ক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে স্বেচ্ছাসেবীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করছেন। রাতদিন পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। শুকনো খাবার নিয়ে প্যাকেট তৈরি করা হচ্ছে। আমাদের পরিশ্রমের মাধ্যমে আমরা বন্যাকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারব।’
বিভিন্ন হল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় করে ত্রাণ সংগ্রহে সহযোগিতা করছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ও অ্যাকটিভিস্ট আবু সাদেক। তিনি বলেন, ‘ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ শক্তির মাধ্যমে বন্যাকবলিত মানুষের দ্বারে দ্বারে ছুটে যাচ্ছি। আমরা এ কাজে সফল হব। সর্বস্তরের মানুষ আমাদের সহযোগিতা করছে।’
সার্বিক বিষয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘টিএসসিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানুষ ত্রাণ দিচ্ছে। মানুষ আমাদের বিশ্বাস করেছে, আমরা বিশ্বাসের মর্যাদা রাখব। আমরা সব হিসাব রাখছি। আমরা হারব না। নির্দিষ্ট জায়গায় আমাদের মালামাল পৌঁছানোর জন্য পর্যাপ্ত ট্রাক-গাড়ি প্রয়োজন রয়েছে।’
মহিউদ্দিন আলম নামে এক ব্যবসায়ী তিন পিকআপভর্তি করে ত্রাণসামগ্রী নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘দেশের এই ক্রান্তিকালে ছাত্রসমাজই দেশকে পথ দেখিয়েছে। তাদের হাত ধরেই আমরা যেকোনো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র রুখে দেব। আমরা সবাই এক থাকলে কোনো শত্রুই আমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। সামর্থ্য অনুযায়ী আমি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছি। আমি চাই দেশের প্রতিটি মানুষ এতে অংশগ্রহণ করুক।’
দুপুরে সরেজমিন দেখা যায়, টিএসসির ফটকে বুথ সামলাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। কেউ বোতলজাত পানি ও খাওয়ার স্যালাইন, কেউ মুড়ি-চিড়া, কেউবা বিস্কুট, আবার কেউ খেজুরসহ বিভিন্ন শুকনো খাবার নিয়ে আসছেন। স্বেচ্ছাসেবক ছাত্রছাত্রী সেগুলো হাতে কিংবা কাঁধে করে টিএসসির অভ্যন্তরীণ ক্রীড়াকক্ষ ও ক্যাফেটারিয়ায় জমা রাখছেন। কেউ কেউ নগদ অর্থও দিচ্ছেন। বুথে বসা শিক্ষার্থীরা খাতায় অনুদানের অঙ্ক লিখে টাকা জমা রাখছেন।
বন্যাকবলিত এলাকায় উদ্ধারকাজে অংশ নিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধিরা ২০০টি স্পিডবোটে করে দুর্গত এলাকায় গেছেন বলে জানালেন আন্দোলনের মিডিয়া ও কমিউনিকেশন উইংয়ের সদস্য আবদুল্লাহ সালেহীন। তিনি বলেন, ত্রাণ সংগ্রহের পর গতকাল রাতে টিএসসির অভ্যন্তরীণ ক্রীড়াকক্ষে প্যাকেজিংয়ে অংশ নেন অনেক শিক্ষার্থী। ছাত্রদের পাশাপাশি অংশ নেন ছাত্রীরাও। যেসব ট্রাক গতকাল রাতে দুর্গত এলাকার উদ্দেশে পাঠানো হয়েছে, সেগুলোর প্রতিটিতে ৭০০ থেকে ৮০০ বস্তা করে ত্রাণ পাঠানো হয়েছে। দুর্গত মানুষের জন্য ট্রাকে করে পানি, শুকনা খাবার, ওষুধ, লাইফ জ্যাকেট ও জরুরি পণ্য পাঠানো হয়েছে। ত্রাণ সংগ্রহের স্বচ্ছ হিসাব রাখার ব্যাপারেও আন্দোলনের সমন্বয়করা সচেষ্ট।
দেশের পূর্বাঞ্চলে বন্যা শুরু হওয়ার পর গত বুধবার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবু বাকের মজুমদার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গণত্রাণ সংগ্রহের এ উদ্যোগের ঘোষণা দেন। আন্দোলনের সব সমন্বয়ক ও স্বেচ্ছাসেবককে নিজ নিজ জেলা-উপজেলায় স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও জনসাধারণের সঙ্গে সমন্বয় করে স্বেচ্ছাসেবী দল গঠনের আহ্বান জানান বাকের। কেন্দ্রীয় প্রতিনিধিদল সবার সঙ্গে সমন্বয় করে বন্যাকবলিত মানুষের জন্য দুর্গতদের জন্য রেসকিউ অপারেশন ও ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
