আড়ি পাতা প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২৪, ০৬:০৬ এএম

নাগরিকদের ভিন্নমত প্রকাশ ও তাদের অধিকার দমনের জন্য গত কয়েক বছরে দেশে কী কী ধরনের সফটওয়্যার ও প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, তার একটি শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি উঠেছে। গতকাল শনিবার রাজধানীতে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত নাগরিক সংলাপে এ দাবি জানান বক্তারা। 

সংলাপে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার কথা বলে এসব দামি সফটওয়্যার কেনা হলেও তা মূলত ব্যবহার হয়েছে রাজনৈতিক কারণে ও ভিন্নমত দমানোর জন্য।

‘বাংলাদেশ ২.০ সিভিল রিফর্ম গ্রুপ’ আয়োজিত এই সংলাপে বক্তারা আরও বলেন, গত ১০ বছরে আড়ি পাতার জন্য কয়েক হাজার কোটি টাকার অত্যাধুনিক সফটওয়্যার ও প্রযুক্তি কেনা হয়েছে ইসরায়েল এবং বিভিন্ন দেশ থেকে। এ দেশের সাধারণ মানুষের অর্থে কেনা এই সফটওয়্যার কোন বিবেচনায়, কী পদ্ধতিতে এবং কী কাজে ব্যবহার করা হয়েছে, তা জানার অধিকার আছে নাগরিকদের। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এনটিএমসি (ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার) ও ডিওটির (টেলিযোগাযোগ অধিদপ্তর) মতো সরকারি যেসব অঙ্গপ্রতিষ্ঠান গত কয়েক বছর এই আড়ি পাতার সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের সংস্কার করা বা নতুন লোক বসিয়ে কোনো সমাধান হবে না। এই দুই প্রতিষ্ঠানকে বিলুপ্ত করতে হবে এখনই। জাতীয় নিরাপত্তার জন্য আড়ি পাতার প্রয়োজনীতা থাকলে সেটির জন্য আলাদা কমিশন করে নতুন বিধিবিধান তৈরি করতে হবে।’

মানবাধিকারকর্মী ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, ‘আদালতের ঘাড়ে বন্দুক ব্যবহার করে গত কয়েক বছর অনেক মানবাধিকার হরণের ঘটনাও ঘটেছে।’ অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকারের সময় আগের মতো অপ্রাসঙ্গিক ও দুর্বল মামলা এবং রিমান্ডে বিভিন্ন আসামির বক্তব্য মিডিয়ায় প্রকাশের প্রতিবাদ জানান তিনি। এ ছাড়া গত কয়েক বছর বিভিন্ন ব্যক্তির কল রেকর্ড ফাঁসের ঘটনায় মিডিয়ার নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সারা হোসেন।

বেসিসের সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুরের সঞ্চালনায় ‘আড়ি পাতা, গোপনীয়তার অধিকার ও বাকস্বাধীনতা’ শীর্ষক এই নাগরিক সংলাপে উপস্থিত ছিলেন রাজনীতিবিদ, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।

আলোচকরা বলেন, দেশের সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদে প্রতিটি নাগরিকের গোপনীয়তার অধিকার সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে। তা সত্ত্বেও সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক টেলিযোগাযোগ আইনের কিছু ধারা ব্যবহার করে বেশ কয়েক বছর টেলিকম নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে নিয়মিতভাবে সাধারণ নাগরিকদের ফোন ট্যাপ করা হচ্ছে। এটি করা হচ্ছে কোনো ধরনের বিধি না মেনেই কিছু ব্যক্তি বিশেষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী। সবচেয়ে আশঙ্কার ব্যাপার হচ্ছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার এমন প্রযুক্তি কিনেছে, যাতে টেলিফোন নেটওয়ার্ক অ্যাকসেস ছাড়াই স্মার্টফোন ডিভাইসে আড়ি পাতা যায় এবং ব্যক্তিগত কল, মেসেজ, ছবি, ভিডিও সব রেকর্ড করা যায়। এটি একেবারেই বেআইনি ও ভয়ানক মানবাধিকার লঙ্ঘন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তথ্যপ্রযুক্তিবিদ মইনুল হোসেন বলেন, ‘দেশের কোনো আইন যদি আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড বা মানের না হয়, তাহলে তার পরিবর্তন করতে হবে।’

আলোচনায় অংশ নিয়ে আলজাজিরা খ্যাত অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সামি বলেন, ‘শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরে সরকারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও কাছের মানুষের ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল তথ্য, কল রেকর্ডের সন্ধান পাওয়া গেছে, যা এনটিএমসি ও অন্যান্য এজেন্সির মাধ্যমে জোগাড় এবং সংরক্ষণ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এগুলো দিয়ে তাদের নিয়মিতভাবে ব্ল্যাকমেল করা হতো বিশেষ প্রয়োজনে।’ তিনি আরও বলেন, ‘গোপনীয়তা ভঙ্গকারী রাষ্ট্রের এই এজেন্সিগুলো শুধু সাধারণ নাগরিক ও ভিন্নমতাবলম্বীদের নজরদারি করতেই ব্যবহার হতো না, নিজেদের লোকজনের কার্যক্রমও মনিটর করতে ব্যবহার হতো।’ অবিলম্বে সব ব্যক্তিগত ও গোপনীয় রেকর্ড ধ্বংস করার দাবি জানান এই সাংবাদিক।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডা. জাহেদ উর রহমান, সাংবাদিক গোলাম মোর্তোজা ও আশরাফ কায়সার, রাজনীতিবিদ জোনায়েদ সাকি, এবি পার্টির যুগ্ম সদস্যসচিব আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, সাইবার বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির, মোবাইল ফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ, প্রাইভেসি বিশেষজ্ঞ সাবহানাজ রশিদ দিয়া, আইনজীবী ব্যারিস্টার মিতি সানজানা, তথ্যপ্রযুক্তি সাংবাদিক ও উদ্যোক্তা জাকারিয়া স্বপন, রাষ্ট্রচিন্তার দিদার ভূঁইয়া, উন্নয়ন গবেষক আহমেদ ওমর তৈয়ব প্রমুখ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত