ঢাবির টিএসসি

ভিড় আছে, ‘স্লোগান’ নেই

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২৪, ০৯:৩৮ পিএম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণকেন্দ্র ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি)। যেখানে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত কিংবা মধ্যরাত পর্যন্ত শিক্ষার্থীসহ সব ধরনের মানুষের আনাগোনা লেগেই থাকে। বিশেষ করে ছাত্র সংগঠনগুলো নেতাকর্মীদের নিয়মিত আড্ডাস্থল এই টিএসসি। ছাত্র সংগঠনগুলোর কেন্দ্রীয় নেতারা এই টিএসসি প্রাঙ্গণে আসলেই শতশত কর্মীদের তাদের ঘিরে রাখতে দেখা যায়।

 

সঙ্গে ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতার নাম ধরে চলে মুহুর্মুহু স্লোগান। কিন্তু বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে সরকার পতনের পর সেই দৃশ্যপট পাল্টেছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়করা ঠিকই টিএসসিতে আসছেন কিন্তু তাদের নাম ধরে হচ্ছে না মিছিল কিংবা স্লোগান। অথচ ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে সদ্য ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকারের ছাত্র-সংগঠন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতারা যখন টিএসসি প্রাঙ্গণে আসতেন, তখন স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত থাকতো টিএসসি। এমনকি নেতাদের সঙ্গে ছবি তোলার জন্য কর্মীরা হুমড়ি খেয়ে পড়তো। যতক্ষণ নেতারা থাকতেন ততক্ষণ তাদের ঘিরে ভিড় করতো কর্মীরা।

সেই চিরচেনা টিএসসিতে এখনও ভিড় আছে কিন্তু নেই কোনো স্লোগান কিংবা মিছিল। সম্প্রতি ভারি বৃষ্টি ও ভারতের উজানের ঢলে দেশের ১৩টি জেলা বন্যাকবলিত হয়েছে। ভয়াবহ বন্যায় বিপর্যস্ত জেলাগুলোর মানুষরা বাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে স্থান নিয়েছেন। নিজের বাড়িঘর হারানো মানুষদের সহযোগিতা করতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা ‘গণ ত্রাণ সংগ্রহ’ কার্যক্রম শুরু করেছে। যার ভেন্যু নির্ধারণ করা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি। যেখানে গত তিনদিন ধরে নগদ অর্থ, শুকনো খাবার ও কাপড় সংগ্রহ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এই কার্যক্রমে সকল ধর্ম-বর্ণ ও সব শ্রেণীর মানুষ নিজের সাধ্যমতে বন্যার্তদের জন্য সহযোগিতা করছে। যার তদারকি করছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়করা।

গত তিনদিন ধরে টিএসসি চিত্র পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, সকাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থীরা টিএসিতে জড়ো হন। সেখানে শিক্ষার্থীরা ত্রাণ নিয়ে আসা মানুষদের কাছ থেকে ত্রাণ সামগ্রী সংগ্রহ করে নির্ধারিত স্থানে রাখেন। সময় যতই গড়ায় টিএসসি প্রাঙ্গণে ভিড় বাড়তে থাকে সব ধরণের মানুষের। প্রত্যেকেই নিজের সাধ্যমতে অর্থ কিংবা শ্রম দিয়ে সহযোগিতা করছেন।

টিএসসির ত্রাণ কার্যক্রম তদারকি করতে হঠাৎ করেই সেখানে উপস্থিত হচ্ছেন কেন্দ্রীয় সমন্বয়কের অন্যতম সারজিস আলম ও হাসনাত আব্দুল্লাহ। তারা এসেই কাজের খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং নিজেও কাজ করার চেষ্টা করছেন। তাদের ঘিরে উৎসুক জনতা ভিড় করছেন ছবিও তুলছেন। কিন্তু হচ্ছে না কোনো স্লোগান। অথচ অতীতে এমন চিত্র কল্পনাই করা যেত না। বিষয়টি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন শিক্ষার্থীসহ ত্রাণ দিতে আসা মানুষরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাহাত ইসলাম নামের এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা হলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতারা এখানে আসলেই স্লোগানে দাঁড়িয়ে থাকা যেত না। পুরো টিএসসি তারা দখল করে রাখতো। এখন সেই চিত্র নেই। এখনকার নেতারা ছাত্র-জনতার নেতা। তাদের আলাদা প্রটোকল, স্লোগানের প্রয়োজন পড়ে না। তারা এমনিতেই জাতীর হিরো। পোশাকে-ব্যবহারে তাদের মনে হয়না তারা আমাদের থেকে আলাদা। বরং মনে হয় তারা আমাদের জন্যই সংগ্রাম করছে।’

টিএসসি প্রাঙ্গণে দীর্ঘদিন চা-বিস্কুট বিক্রি করে এমন একজনের সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পরে এই বন্যা মানুষকে আরও বেশি একত্রিত করেছে। তার প্রমাণ এই টিএসসি। যেখানে নেই কোনো রাজনৈতিক স্লোগান আছে শুধু মানবতার জয়গান। আগে নেতারা আসা অর্থই স্লোগান আর আতঙ্ক। এখন সেই আতঙ্ক নেই বরং ভালোবাসা রং প্রস্ফুটিত হচ্ছে। বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার নেওয়ার জন্য নয় দেওয়ার জন্য আসছেন।’

এদিকে ছাত্র-জনতা আন্দোলনে শেখ হাসিনার পদত্যাগ করে দেশত্যাগের পরেই দেশ সংস্কারের অঙ্গীকার করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়করা। তারই প্রাথমিক অংশ হিসেবে নিজের ছবি দিয়ে পোস্টার বানিয়ে প্রচারণা না করতে তারা অনুরোধ করেছেন।


     

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত