ইংরেজি একটা প্রবাদ আছে, ‘সাকসেস হ্যাজ মেনি ফাদারস’; অর্থাৎ সাফল্যের কৃতিত্বের দাবিদার অনেকেই। মাঠে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাফল্যে বোর্ড সভাপতি থেকে শুরু করে বিদেশি কোচ এবং পরামর্শকসহ অনেকেই ভাগ বসিয়েছেন, আর ব্যর্থতার বোঝা শুধুই ক্রিকেটারদের ঘাড়ে চাপানো হয়েছে। রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তানকে ১০ উইকেটে হারানোর কৃতিত্বে উড়ে এসে জুড়ে বসারা ভাগ বসানোর আগেই মুশফিকুর রহিম স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন প্রস্তুতি পর্বে দেশের কোচদের অবদান। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে কিছুদিন আগেই পরিচালক হিসেবে আসা নাজমুল আবেদীন ফাহিমও কাল সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে তুলে ধরেছেন দেশের কোচদের কৃতিত্ব। সাবেক ক্রিকেটার ফারুক আহমেদ বিসিবির শীর্ষ পদে আসায় প্রত্যাশা বেড়েছে স্থানীয় কোচদের মাঝেও, তাদের আশা নামসর্বস্ব বিদেশিদের বদলে জাতীয় দলে সুযোগ মিলবে দেশের কোচদের।
রাওয়ালপিন্ডি টেস্টে ১৯১ রান করে ম্যাচসেরা পুরস্কার জেতা মুশফিকুর রহিম পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘সবশেষ টেস্টের পর প্রায় দুই থেকে আড়াই মাসের একটা ফাঁকা সময়টায় আমরা বিশেষ একটা ক্যাম্প করি বাংলাদেশ টাইগার্সের সঙ্গে। স্থানীয় সব কোচ আর সহায়ক কর্মীরা সেখানে ছিলেন। সেই ক্যাম্পটা আমাদের খুব সাহায্য করেছে টেস্টের জন্য তৈরি হতে, বিশেষ করে টেস্ট দলের খেলোয়াড়দের। কারণ অন্যরা তখন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ব্যস্ত ছিল। সেখানকার আবহাওয়া অনেকটা এখানকার মতোই ছিল, সেটা আমাদের সাহায্য করেছে। সেই অভিজ্ঞতা এখানে কাজে দিয়েছে। আমি আমার স্থানীয় কোচ এবং সহায়ক কর্মীদের কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ।’
মুশফিকের এ কথার তাৎপর্য অনেক। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শেষে প্রধান কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে এবং তার সহকারীরা চলে গিয়েছিলেন ছুটিতে। এরপর নানান কারণে দেশে ফেরা পেছায় তার, অবশেষে আগস্টের ২ তারিখে কোচ যখন বাংলাদেশে ফিরেছেন, তখন ছাত্র-জনতার আন্দোলনে দেশ উত্তাল। এ সময় বিদেশি কোচরা নিরাপত্তাজনিত শঙ্কায় মাঠে এসে দলকে অনুশীলনই করাতে পারেননি। এরপর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে ‘এ’ দলের পাকিস্তান যাত্রা পেছাল, তাদের সঙ্গে মুশফিকও গেলেন ১০ আগস্ট। জাতীয় দল লাহোরে যখন অনুশীলন করছে, মুশফিক তখন ইসলামাবাদে চার দিনের ম্যাচ খেলছেন। বলা যায়, ম্যাচের আগের একটা-দুটো দিন ছাড়া হাথুরুসিংহে, নিক পোথাস বা ডেভিড হেম্প, কারও সঙ্গেই অনুশীলনে নিজেকে ঝালিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাননি মুশফিক; বরং পাকিস্তান সফরের আগে বাংলাদেশ টাইগার্সের ক্যাম্পে সোহেল ইসলাম, তারেক আজিজ খানদের সাহচর্যেই নিজেকে তৈরি করেছেন চট্টগ্রামে। মুশফিকের এই স্বীকৃতি ভালো লেগেছে সোহেলের, তবে এখনই আনন্দে আতিশয্যে ভেসে যেতে রাজি নন এই কোচ, ‘(আমি) সন্তুষ্ট তো বটেই, সন্তুষ্ট হওয়ার মতো ব্যাপার না! আসলে একটা টেস্ট দিয়ে অনেক কিছু কাভার করা যায় না, ছেলেদের কতটা উন্নতি হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে যদি ভালো খেলি তাহলে বোঝা যাবে আমরা কতটা কীভাবে কাজ করেছি। সে জন্য আমি আসলে কোনো কিছুই এই মুহূর্তে বলতে চাচ্ছি না। আমরা আশা করছি, ছেলেরা এই ধারাবাহিকতাটা ধরে রাখতে পারবে। আরও দুই-একটা টেস্ট খেলি, এরপর বলা যাবে।’
দেশের কোচদের অবদান তুলে না ধরার পেছনে গণমাধ্যমের একটা ভূমিকা দেখেন বিসিবিতে সদ্যই পরিচালক হিসেবে আসা ফাহিম, ‘আমার মনে হয়, এখানে গণমাধ্যমেরও একটা দায় আছে। কারণ গণমাধ্যম সেটা সেভাবে উল্লেখ করে না। হয়তো আমরা, মানে বোর্ড থেকেও সেটা সেভাবে অ্যাপ্রিশিয়েট করি না। তবে আমাদের স্থানীয় কোচদের অবদান কোথায় কতটুকু আছে, সেটা গণমাধ্যমেও কিন্তু খুব একটা হাইলাইট হয় না। একটা দল, একটা বিশাল কর্মযজ্ঞ, এখানে প্রতিটি কাজ সুচারুভাবে সম্পন্ন করলে ভালো করার একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়। আমাদের স্থানীয় কোচরা নিঃসন্দেহে ভালো কাজ করছেন, এরা লম্বা সময় ধরে যে ট্রেনিং ক্যাম্পটা করেছে তার একটা প্রভাব এখানে নিশ্চয়ই আছে।’
বিসিবির সভাপতি হওয়ার আগে থেকে চন্ডিকা হাথুরুসিংহের ব্যাপারে নিজের অবস্থান স্পষ্টভাবে জানিয়ে আসছিলেন ফারুক আহমেদ। দেশের কোচদের ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। দেশের ক্রিকেটের শীর্ষ ব্যক্তির এমন মনোভাব আর মুশফিকের উদাত্ত প্রশংসা আশাবাদী করে তুলবে স্থানীয় কোচদের, এমনটাই বলেছেন বাংলাদেশ টাইগার্স ক্যাম্প পরিচালনা করা প্রধান কোচ সোহেল ইসলাম, ‘হ্যাঁ, এটা তো আমাদের জন্য একটা বড় প্লাস পয়েন্ট, কোনো সন্দেহ নেই। ফারুক ভাই নিজে ক্রিকেট খেলোয়াড় ছিলেন, উনি অনেক ভালো ক্রিকেট বোঝেন, আসলে কোথায় কী করতে হবে, কী করলে আরও ভালো পারফরম্যান্স হবে; শুধু বাংলাদেশ জাতীয় দলের কথা বলছি না, সার্বিকভাবে বলছি...এটা মনে হয় উনি ভালো বুঝবেন।’
ক্রিকেটার এবং বিদেশ থেকে আসা কোচদের অনেকেই সংবাদ সম্মেলনে বারবারই প্রক্রিয়া এবং টেস্ট সংস্কৃতির কথা বলে ব্যর্থতা আড়াল করার চেষ্টা করেন। পাকিস্তান সফরের আগে বিসিবি অন্তত সেই প্রস্তুতির প্রক্রিয়াটা শুরু করেছিল, যার ফল পাওয়া গেছে রাওয়ালপিন্ডিতে। তাহলে এত দিন কি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি ছাড়াই খেলতে নেমে যেতেন ক্রিকেটাররা? এমন প্রশ্নে সোহেলের উত্তর, ‘অতীতে এ রকম প্রস্তুতি নেওয়া যেত না। কারণ সময়টা একটা ব্যাপার। নিজেরা কীভাবে খেলব এই সিরিজে খেলার আগে তার প্রস্তুতি নেওয়ার সময়টা ছিল। আসলে শুধু এই একটা টেস্ট নিয়েই তো প্রস্তুতি না। আমাদের এই পঞ্জিকাবর্ষে ৮টা (এখন ৭টা) টেস্ট আছে, সেটা মাথায় রেখেই এই ক্যাম্পটা করা। একেকটা খেলার জন্য একেক রকম প্রস্তুতির দরকার হয়, এইবার ওই সময়টা ছিল, সব মিলিয়ে ভালো।’
বাংলাদেশের কোচ হিসেবে কয়েক মেয়াদে যারা ছিলেন, তারা বেশিরভাগই সিরিজের আগে বাংলাদেশে এসে দিন কতক অনুশীলন করিয়ে সিরিজ শেষে আবার ছুটিতে চলে যেতেন। এই চর্চাটা সবচেয়ে বেশি করেছেন হাথুরুসিংহে, সরাসরি সাবেক বিসিবি প্রেসিডেন্ট নাজমুল হাসান পাপনের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে সংস্থার বিধিবিধানকে পাশ কাটিয়ে করতেন অনেক কিছুই। রাওয়ালপিন্ডি টেস্টের পর মুশফিকের কথায় একটা ব্যাপার অন্তত দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট, ক্রিকেটারদের ওপর যে ছড়িটা ঘোরান হাথুরুসিংহে, সেটা জাদুর নয় বরং কর্র্তৃত্বের। এতে করে যে ফল আসে না, সেটা দুটো বিশ্বকাপেই বোঝা গেছে।
