থানা মেরামতের কাজ কতদূর

আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২৪, ০২:২৬ এএম

আগুনে পুড়ে ছাই গোটা থানা। চেয়ার-টেবিল, কম্পিউটার থেকে শুরু করে বাদ যায়নি পুলিশের ব্যক্তিগত জিনিসপত্রও। থানা প্রাঙ্গণে কঙ্কাল হয়ে আছে গাড়ির চ্যাসিস-ইঞ্জিন। দেয়ালগুলো কালশিটে দাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দিনের পর দিন। কিন্তু থাকলে কী হবে। অপরাধীদের অপরাধ থেমে নেই। আর সে কারণেই প্রতিকার চাইতে থানামুখো মানুষের সংখ্যাও আটকে নেই কোথাও।

সংশ্লিষ্টদের মতে, জনবহুল এ নগরে থানা হচ্ছে প্রতিদিন ব্যবহার করতে হয় এমন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। প্রাত্যহিক ব্যবহার্য জিনিস নষ্ট হলে দ্রুত সারিয়ে তুলতে যেমন বাড়তি গুরুত্ব দিতে হয়, থানা সারিয়ে তোলার জন্যও তেমনি এক্সট্রা কেয়ার দরকার। সীমিত পরিসরে শুরু হলেও তাতে গতি আনা দরকার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জননিরাপত্তায় থানা চালু রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। থানাগুলো সংস্কার বা মেরামত করে পুলিশকে মাঠে ফেরাতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত থানাগুলো দ্রুত মেরামতের কাজ শুরু করতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যদি সহযোগিতা প্রয়োজন হয় তাহলে তার ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের সবার নিরাপত্তার জন্য থানা সঠিকভাবে সচল রাখা ও ভালোভাবে পুলিশিংয়ের কোনো বিকল্প নেই।’

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) মহানগরীর থানাগুলোর ক্ষতির তালিকা করেছে। ডিএমপি তাদের মতো করে থানাগুলোকে সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছে।  থানাগুলোও নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আর্থিক খরচ জোগানের মাধ্যমে মেরামতের চেষ্টা করছে।

এক প্রশ্নে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) ইনামুল হক সাগর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘থানা ভবন, ফাইলপত্র, আসবাবের পাশাপাশি থানাগুলোর গাড়িও পুড়ে ছাই হয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে আমরা কাজ করছি। থানায় যতটুকু রিসোর্স আছে, সমন্বয় করে তার সর্বোচ্চ ব্যবহারের চেষ্টা চলছে।’ গতকাল সোমবার রাজধানীর বাড্ডা থানায় সরেজমিনে দেখা যায়, ডিউটি অফিসার একটি কম্পিউটার দিয়ে কাজ করছেন। সাইবার ইউনিট রুমে কাজ করছেন আরও দুজন। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম স্থানীয়দের নিয়ে বৈঠক করছেন। বৈঠকের একফাঁকে দেশ রূপান্তরের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ডিএমপি থেকে থানার ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি তদারকি করা হচ্ছে। তবে থানার কার্যক্রম আগের মতো শুরু হয়েছে। টহল কার্যক্রমও চলছে বলে জানান ওসি।

রামপুরা থানায় গিয়ে জানা যায়, তাদের চারটি গাড়ি পুড়েছে। এতে টহল ডিউটিতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে। তবে সেটা তারা পুষিয়ে নিচ্ছেন রাজারবাগ পুলিশ লাইনস থেকে গাড়ি এনে। সংকটে রাজারবাগ থেকেই গাড়ি দেওয়া হয় টহলের জন্য। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রামপুরা থানার এক এসআই বলেন, ‘আমাদের থানায় তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি। তবে যেটুকু হয়েছে তা সংস্কারের কাজ চলছে। এখানে তেমন কোনো সমস্যা নেই।’

রাজধানীর থানাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে যাত্রাবাড়ী, ভাটারা ও মোহাম্মদপুরের। এসব থানার কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। তবে পুরোপুরি কার্যকর করতে আরও সময় লাগবে। পুলিশ সদস্যরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছেন। এসব থানার পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেও বোঝা গেছে তাদের মনে কোনো উদ্যম নেই।

যাত্রাবাড়ী থানার ওসি মাইনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই থানার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে ডেমরা থানা থেকে। ওই থানায় বসে যাত্রাবাড়ীর কার্যক্রম তদারকি করা হচ্ছে। যাত্রাবাড়ী থানা মেরামতের কাজ চলছে। থানা পুরোপুরি ঠিক করতে আরও চার থেকে পাঁচ দিন সময় লাগবে। থানায় বসে কাজ শুরু করতে পারলেই আমরা ভালোভাবে থানার কার্যক্রম শুরু করতে পারব।’

৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরই রাজধানীসহ সারা দেশে চার শতাধিক থানায় হামলা-ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ-লুটপাটের ঘটনা ঘটে। থানার ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র পোড়ানো হয়। লুট হয় অস্ত্র। থানায় রাখা প্রশ্নপত্র পোড়ানোর কারণে বাতিল করা হয়ে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা। মোটকথা, থানায় হামলায় ভেঙে পড়ে দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থা। এসব হামলায় ৪২ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন। আহত হয়েছেন কয়েকশ। কয়েক দিন কর্মবিরতির পর পুলিশ সদস্যরা থানায় ফিরলেও কার্যক্রম এখনো স্বাভাবিক হয়নি। এ অবস্থায় বিভিন্ন সংকটের মধ্যেও স্বল্পপরিসরে সেবা দিচ্ছেন তারা।

ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) মো. ওবায়দুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত থানাগুলোর পুলিশিং কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হতে আরও কিছু সময় লাগবে। অফিশিয়াল কাজ শুরু হলেও টহল ও ওয়ারেন্টসংশ্লিষ্ট কাজ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। টহলে বা গ্রেপ্তার করতে গিয়ে আবার হামলার শিকার হতে হবে কি না, এমন ভাবনাও বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে পুলিশ সদস্যদের।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত