বাংলাদেশে ইন্টারনেটের গতি তুলনামূলকভাবে ধীর এবং অস্থিতিশীল। ওকলা স্পিডটেস্ট গ্লোবাল ইনডেক্সের ২০২৪ সালের আগস্টের তথ্যমতে,দেশ মোবাইল ইন্টারনেট গতির দিক থেকে ১০৮টি দেশের মধ্যে ৯০তম স্থানে। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট গতির দিক থেকে ১৫৯টি দেশের মধ্যে ১০০তম স্থানে অবস্থান করছে, যা আগের মাসেও ছিল ১০৮তম। এ ধরনের অবস্থানগত পরিসংখ্যানে বোঝা যায় উন্নত দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ইন্টারনেটের গতি এবং ব্যবহারের মান কতটা নিম্নমানের।
ইন্টারনেট সেবাদাতাদের মনোপলি
বাংলাদেশে ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মনোপলির সুস্পষ্ট প্রভাব রয়েছে। দেশের টেলিকম অপারেটর আর আইএসপিগুলো আন্তর্জাতিক হোলসেল মার্কেট থেকে ইন্টারনেট কিনতে পারেন না, তাদের ইন্টারনেট কিনতে হয় মধ্যস্থ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। দেশের ইন্টারনেট বিক্রয়ের মধ্যস্থ কোম্পানি International Internet Gateway (IIG) I Nationwide Telecommunication Transmission Network (NTTN), যাদের পেরেন্ট কোম্পানি Summit Communications তথা সামিট গ্রুপ। মনোপলির ফলে গ্রাহকদের জন্য উপযুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক দাম এবং উচ্চ মানের সেবা প্রাপ্তি কঠিন হয়ে পড়ে, যা ইন্টারনেটের ধীরগতির অন্যতম কারণ।
স্পেকট্রাম বা বেতার তরঙ্গের সংকট
গ্রাহকের চাহিদার তুলনায় স্পেকট্রামের ব্যবহার কম হয়ে গেলে ইন্টারনেটের গতি ধীর হয়ে যায়। স্পেকট্রাম একটি সীমিত সম্পদ, যা দেশের সব মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটরদের মধ্যে ভাগ করা হয়। বাংলাদেশে স্পেকট্রাম বিতরণ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন প্রশাসনিক এবং আইনি জটিলতা আছে, যা অপারেটরদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে।
লোকাল ক্যাশ সার্ভার ব্যাহত
লোকাল ক্যাশ সার্ভার হলো তথ্য সংরক্ষণ বা ধারণ করার নির্দিষ্ট নেটওয়ার্ক সার্ভার বা সেবা। এতে স্থানীয়ভাবে ব্যবহৃত ওয়েবপেজ ও অন্যান্য ইন্টারনেট কনটেন্ট সেভ করা থাকে। অস্থায়ী স্টোরেজ বা ক্যাশ থেকে আগের ব্যবহৃত তথ্য প্রদানের নির্দেশ দিয়ে ক্যাশ সার্ভার ইন্টারনেট ডেটার গতি বাড়াতে এবং একই সঙ্গে ব্যান্ডউইথের চাহিদা কমাতে ভূমিকা রাখে। লোকাল ক্যাশ সার্ভার ব্যাহত হলে সম্পূর্ণ ট্রাফিক আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, ইন্টারনেটের গতি কমে যায়।
নিম্নমানের যন্ত্রপাতি ও ইনফ্রাস্ট্রাকচারের দুর্বলতা
দেশের বেশিরভাগ ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে, যা দীর্ঘমেয়াদি সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়। এ ছাড়াও অবকাঠামোগত দুর্বলতা যেমন : পুরনো কেবল, ফাইবার অপটিক সিস্টেমের অভাব ইত্যাদি ইন্টারনেটের গতি কমিয়ে দেয়। উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচারের উন্নয়ন ইন্টারনেটের গতি বাড়ানোর জন্য অত্যন্ত জরুরি।
অপর্যাপ্ত মোবাইল টাওয়ার
বাংলাদেশে এখনো অনেক এলাকায় মোবাইল টাওয়ার পর্যাপ্ত সংখ্যায় নেই। বিশেষ করে গ্রামীণ এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে মোবাইল টাওয়ারের সংখ্যা কম হওয়ায় ইন্টারনেটের গতি স্বাভাবিকভাবে কমে যায়। অনেক সময়ই বিদ্যুৎ এবং অন্যান্য অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে টাওয়ার সচল রাখা বা স্থাপনের উদ্যোগ ব্যাহত হয়, যা ইন্টারনেট সেবার মানের ওপর প্রভাব ফেলে।
ইন্টারনেটের গতি বৃদ্ধির উপায়
ইন্টারনেট সেবার ক্ষেত্রে মনোপলি কমানোর জন্য সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রতিযোগিতামূলক বাজার সৃষ্টি হলে সেবার মান উন্নত হবে এবং ইন্টারনেটের গতি বাড়বে। লোকাল ক্যাশ সার্ভারগুলোর মান উন্নত করতে হবে এবং সার্ভার পরিচালনার ক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। ইন্টারনেট সেবার মান উন্নয়নের জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং উন্নত অবকাঠামো অত্যন্ত জরুরি। স্পেকট্রাম ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে এবং অপারেটরদের জন্য পর্যাপ্ত স্পেকট্রাম বরাদ্দ করতে হবে। মোবাইল টাওয়ার স্থাপনের ক্ষেত্রে দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ইন্টারনেটের গতি এবং সেবা নিরবচ্ছিন্ন রাখার জন্য সরকারকে অবশ্যই রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে। সরকারের উদ্যোগ এবং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টায় দেশের ইন্টারনেটের গতি ও সেবার মান উন্নত করা সম্ভব।
