“এই নির্বাচন স্বচ্ছ হবে। আগামী নির্বাচনে জনগণ নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারবে। এবার ভোট কারচুপি করতে পারবে না বলে বিএনপি অংশগ্রহণ করতে ভয় পাচ্ছে।” দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে-পরে আওয়ামী লীগের পক্ষে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও বিরোধী দলের ফেসবুক পেজে এ ধরনের নানা মন্তব্য করা হয়েছে।
এসব ফেসবুক প্রোফাইল ভুয়া বা ফেক। আর এসব ফেসবুক প্রোফাইল পরিচালিত হয়েছে বট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। এমন ১ হাজার ৩৬৯টি ফেসবুক প্রোফাইলের একটি বট নেটওয়ার্কের সন্ধান মিলেছে গবেষণায়।
তথ্যব্যবস্থায় প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান ডিজিটালি রাইটের তথ্য যাচাইয়ের উদ্যোগে ডিসমিসল্যাব গবেষণাটি করেছে। গবেষণা প্রতিবেদনটি আজ বৃহস্পতিবার প্রকাশ করার কথা।
গবেষণায় দেখা গেছে, ফেসবুক প্রোফাইলগুলো থেকে আওয়ামী লীগের পক্ষে ১৯৭টি পোস্টে সমন্বিতভাবে ২১ হাজারের বেশি মন্তব্য করা হয়েছে। তারা বিভিন্ন পোস্টে একই মন্তব্য করেছে। একই মন্তব্য বিভিন্ন প্রোফাইল থেকে পোস্ট করা হয়েছে।
বট অ্যাকাউন্ট ও এর করা মন্তব্যের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ, এই গবেষণা করা হয়েছে মোট ১৯৭টি পোস্টে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে।
বট নেটওয়ার্ক মূলত একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, যেখানে বিশেষ সফটওয়্যারের (বট) মাধ্যমে কাজ করা হয়। বট নেটওয়ার্কের কার্যক্রম পুরোপুরি না হলেও অন্তত আংশিকভাবে কম্পিউটারভিত্তিক বা স্বয়ংক্রিয়। তারা একটি তালিকা থেকে নির্দিষ্ট ‘কি-ওয়ার্ড’ বা শব্দ ধরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পোস্ট বাছাই করে। আরেকটি তালিকা থেকে বেছে নিয়ে মন্তব্য পোস্ট করে। এই প্রক্রিয়ায় কোথায় কী মন্তব্য পোস্ট করা হচ্ছে, সেখানে মানুষের নজরদারি নেই বললেই চলে।
গবেষণায় দেখা যায়, বট নেটওয়ার্কটি সক্রিয় হয় গত ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগে। গত জুন পর্যন্ত বট নেটওয়ার্কটি ঘুরেফিরে ৪৭৪টি একই ধরনের রাজনৈতিক মন্তব্য করেছে।
মন্তব্যগুলো নির্বাচনের আগে তৈরি করা। কিন্তু বট নেটওয়ার্কটি নির্বাচনের পরও একই মন্তব্য পোস্ট করে গেছে। বট নেটওয়ার্কটি লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে দেশের প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যম ও তৎকালীন বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ফেসবুক পেজকে।
গবেষণায় ভুয়া প্রোফাইলগুলোর মধ্যে একধরনের সংযোগ থাকার চিত্র পাওয়া যায় দুটি নির্দিষ্ট পেজে লাইক দেওয়ার প্রবণতা থেকে।
প্রোফাইল ‘লকড’ নেই, এমন ১ হাজার ১২৪টি অ্যাকাউন্টের ৭০ শতাংশের ক্ষেত্রে দেখা যায়, সেগুলো ‘বাংলার খবর’ ও ‘আওয়ামী লীগ মিডিয়া সেল’ পেজ দুটির কোনো একটিকে বা দুটিকেই অনুসরণ (ফলো) করে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এর পর থেকে আওয়ামী লীগ মিডিয়া সেল পেজটি আর পাওয়া যাচ্ছে না।
২১ জুন ‘কালার প্রিন্টারে ছাপানো প্রতিটি পৃষ্ঠায় থাকে অদৃশ্য কোড?’ শিরোনামে একটি খবর প্রকাশিত হয় অনলাইন গণমাধ্যম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ও এর ফেসবুক পেজে। উভয় ক্ষেত্রে পোস্টের নিচে একটি মন্তব্য ছিল, ‘এবারের নির্বাচন স্বচ্ছ হবে। আগামী নির্বাচনে জনগণ স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবে। আর এবার ভোট চুরি করতে পারবে না বলেই বিএনপি নির্বাচনে আসতে ভয় পাচ্ছে আর এত কাহিনি করছে’।
নির্বাচনের প্রায় ছয় মাস পরে এসেও ‘ব্যবহারকারীরা’ এই পোস্টের নিচে বিএনপির সমালোচনা, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সফল ও সুষ্ঠুভাবে হওয়ার আশাবাদ, ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের দাবিসহ নানা রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে একের পর এক মন্তব্য করে।
গবেষণায় দেখা যায়, বট নেটওয়ার্কটি সাধারণত রাজনৈতিক পোস্টেই মন্তব্য করে। ফেসবুক পোস্টে নির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক ‘কি-ওয়ার্ড’ বা শব্দ পেলে তারা সেই পোস্টে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু কখনো কখনো তাদের ভুল হয়। যেমনটি হয়েছে ‘ইসি’ (নির্বাচন কমিশন) শব্দের ক্ষেত্রে। কালার প্রিন্টার-সংক্রান্ত খবরটির সারাংশে ‘মেশিন আইডেনটিফিকেশন কোড (এমআইসি) ’-এর উল্লেখ ছিল। সেখানে ‘ইসি’ শব্দাংশ দেখেই বট নেটওয়ার্কটি শ খানেক মন্তব্য করে।
ফেসবুকের একটি প্রোফাইল আসল নাকি নকল, তা যাচাইয়ের জন্য সাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বট প্রোফাইলে অতিরিক্ত গোপনীয়তা অবলম্বন করা হয়। নিজের সম্পর্কে (অ্যাবাউট সেকশন) পর্যাপ্ত তথ্য দেওয়া হয় না। প্রোফাইলে পোস্টসংখ্যা হয় খুব কম, নয়তো খুব বেশি। প্রোফাইল ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করা হয়। বন্ধুসংখ্যা সচরাচর কম হয়।
ডিসমিসল্যাব ১ হাজার ৩৬৯টি প্রোফাইলের প্রাইভেসি সেটিংস, বন্ধুসংখ্যা, পোস্ট করার প্রবণতা, পরিচিতি তথ্য ও প্রোফাইল ছবি পর্যালোচনা করেছে। দেখা গেছে যে বেশির ভাগের প্রোফাইল ‘লকড’ বা ‘প্রাইভেট’ করা। সেগুলো সক্রিয় হয়েছে নির্বাচনের আগে। প্রোফাইল ছবি নেই অথবা চুরি করা। তাদের বন্ধুসংখ্যা খুব কম বা নেই। বেশির ভাগ অ্যাকাউন্ট দুটি নির্দিষ্ট পেজকে ফলো করে। আর এসব বৈশিষ্ট্য রাজনৈতিক বটের প্রচলিত সংজ্ঞার সঙ্গে মিলে যায়।
গবেষণার ১ হাজার ৩৬৯টি প্রোফাইলের ৭৭ শতাংশ নারীদের নামে। এই নামেও রয়েছে অদ্ভুত মিল। নারীদের প্রোফাইলের ২৪ শতাংশের নাম ‘আক্তার’ দিয়ে শেষ হয়েছে। যেমন দিয়া আক্তার, রিয়া আক্তার, লিজা আক্তার, লিমা আক্তার, লিসা আক্তার ইত্যাদি।
পুরুষদের প্রোফাইলগুলোর একটি বড় অংশের শেষ নাম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে ‘আহমেদ’। যেমন নাঈম আহমেদ, নাদিম আহমেদ, কামিল আহমেদ, মাহিন আহমেদ, সামির আহমেদ ইত্যাদি।
নারী-পুরুষ উভয় ধরনের প্রোফাইলের ৯০ শতাংশ নামই দুই শব্দের। কিছু ক্ষেত্রে একটি নামকেই ভেঙে দুই শব্দ করা হয়েছে। যেমন রি পা, মি না, লি জা, যু থি, লাম ইয়া, মু না, নে হা, জোস না ইত্যাদি।
তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় ৭ জানুয়ারি। আর ফেক প্রোফাইলগুলো সক্রিয় হয়েছে মূলত গত বছরের জুন থেকে নভেম্বরের মধ্যে। ফেক প্রোফাইলগুলোর অর্ধেকই সক্রিয় হয়ে ওঠে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর মাসের মধ্যে। শুধু নভেম্বরের ২৩ থেকে ৩০ তারিখের মধ্যে প্রথমবারের মতো পোস্ট করে ৩৪৪টি অ্যাকাউন্ট। এর আগে ২ থেকে ১২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ২৪০টি প্রোফাইল সক্রিয় হয়।
গবেষণায় রাজনৈতিক মন্তব্য পাওয়া গেছে ২১ হাজার ২২১টি। কিন্তু এগুলোর মধ্যে স্বতন্ত্র বা ইউনিক মন্তব্য ছিল মাত্র ৪৭৪টি। অর্থাৎ বটগুলো বিভিন্ন পোস্টে ঘুরে ফিরে এই ৪৭৪টি মন্তব্যই করেছে। বটগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সংযোগ স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
বট নেটওয়ার্কটি মূলত ৪২টি ফেসবুক পেজকে লক্ষ্যবস্তু বানায়, যেগুলো মূলত বিভিন্ন গণমাধ্যম ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের। এর মধ্যে ৬৮ শতাংশ পেজ প্রথম সারির ও পরিচিত গণমাধ্যমের। এককভাবে ৩১ শতাংশ পেজ হলো বিএনপির বা বিএনপি-সংশ্লিষ্ট। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণসংহতি আন্দোলনের পেজকেও লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়।
বট নেটওয়ার্কটি তার লক্ষ্যবস্তু পেজে যেখানেই ‘ইসি’ শব্দাংশ পেয়েছে, সেটি প্রাসঙ্গিক হোক আর না হোক, সেখানেই সমন্বিতভাবে রাজনৈতিক মন্তব্য করেছে। গবেষণায় বলা হয়, এটি ইঙ্গিত করে যে নেটওয়ার্কটি কোন পোস্টে মন্তব্য করবে, সেটি বাছাইয়ের জন্য কি-ওয়ার্ড-নির্ভর একটি স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।
দুই এডিজিসহ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ৭ নতুন কর্মকর্তা
থানা থেকে লুট হওয়া ৩৩০৪ অস্ত্র উদ্ধার
১৫ বছরে গুম ছয় শতাধিক 