১৯ কারখানায় উৎপাদন বন্ধ, ওষুধ সংকটের শঙ্কা

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৬:৪০ এএম

তৈরি পোশাক শিল্পের পাশাপাশি দেশের ওষুধ শিল্পে শ্রমিকদের চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এ অসন্তোষের কারণে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ঢাকার সাভার ও আশুলিয়া এবং গাজীপুর ও এর আশপাশের এলাকাসহ দেশের ১৯টি বড় ওষুধ কারখানায় উৎপাদনসহ প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে মালিকপক্ষ। এমন পরিস্থিতিতে হুমকির মুখে পড়ছে দেশের ওষুধ শিল্প এবং দেশে ওষুধের সংকট দেখা দিতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের কর্তারা। গতকাল রাতে ওষুধ শিল্প সমিতির এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।

এদিকে চাকরি ফিরে পাওয়ার দাবিতে গাজীপুরের বেশ কয়েকটি স্থানে গতকাল বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেন পোশাক কারখানার চাকরিচ্যুত শ্রমিকরা। সকাল থেকে তারা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। এ ছাড়া কালিয়াকৈরে বেতন বৃদ্ধি, যথাসময়ে বেতন প্রদানসহ ২০ দফা দাবিতে কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ করেছে ট্রান্সকম বেভারেজ লিমিটেডের শ্রমিকরা। অন্যদিকে সাভার-আশুলিয়ায় শ্রমিক অসন্তোষ এবং অস্থিরতা ঠেকাতে যৌথ অভিযান শুরু করেছে সেনাবাহিনী ও পুলিশ। তবে গতকাল ওই এলাকায় কোনো শ্রমিক অসন্তোষের খবর পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া গাজীপুরের বিভিন্ন পোশাক কারখানায় নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা ও ভাঙচুরের প্রতিবাদে বিএনপি এবং অঙ্গ সংগঠনের নেতারা মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীরা। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। গতকাল রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে এ অনুরোধ জানায় ব্যবসায়ীদের একটি প্রতিনিধিদল। শ্রমিকদের বিক্ষোভের জেরে শতাধিক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হওয়ার প্রেক্ষাপটে বৈঠকটি হয়।

রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় গতকাল ওষুধ শিল্প সমিতি কার্যালয়ে জরুরি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে মূল বক্তব্য তুলে ধরেন বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির সভাপতি এবং ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল মুক্তাদির।

এ সময় জানানো হয়, শ্রমিকদের অসন্তোষের কারণে হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের কারখানায় চারশর বেশি কর্মী জিম্মি অবস্থায় রয়েছেন। এই কারখানার ওষুধ উৎপাদন বন্ধ তিন দিন ধরে। এক সপ্তাহ ধরে বন্ধ স্কয়ার ফার্মার গাজীপুরের কারখানায় ওষুধ উৎপাদন।

সংবাদ সম্মেলনে ওষুধ শিল্প মালিকরা বলেন, ওষুধ শিল্পে ৫০ বছর ধরে কোনো শ্রমিক উত্তেজনা বা আন্দোলন হয়নি। কিন্তু সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে ওষুধ কারখানায় শ্রমিকরা বিভিন্ন দাবি ও আইনবহির্ভূত আন্দোলন ও ভাঙচুর করছেন। তারা কারখানায় কর্মকর্তাদের ঢুকতে বাধা দিচ্ছেন। এতে ওষুধ তৈরি ব্যাহত হচ্ছে। ফলে অচিরে দেশে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শিল্প মালিকরা আরও বলেন, শ্রমিকদের দাবি মেনে নেওয়ার পর দু-এক দিন কাজ করেছেন। আবার তারা ভিন্ন অযৌক্তিক দাবি উত্থাপন করছেন। একটি কারখানায় বেতন বাড়ানো হলেও অন্যরা আবার সক্রিয় হয়ে উঠছেন। এভাবে ওষুধ শিল্পে চরম অস্থিরতা দেখা দেওয়ায় গত কয়েক দিনে মালিকরা ১৯টি ওষুধ তৈরির কারখানা বন্ধ করে দিয়েছেন।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হালিমুজ্জামান বলেন, তাদের কারখানায় চারশর বেশি লোককে গতকাল সকাল থেকে জিম্মি করে রাখা হয়েছে। তাদের মধ্যে দুজন অন্তঃসত্ত্বা নারীও রয়েছেন। দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকায় অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।

সমিতির সভাপতি আবদুল মোক্তাদির বলেন, ওষুধ শিল্পে অস্থিরতা নিরসনে তারা প্রধান উপদেষ্টা এবং স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছেন। কিন্তু আশানুরূপ কোনো ফল দেখতে পাচ্ছেন না। এ শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হলে দেশের চাহিদার পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানিও বাধাগ্রস্ত হবে।

এই শিল্প ধ্বংস করতে ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলে মনে করেন ওষুধ শিল্প মালিকরা। তারা বলেন, এই শিল্পে কর্মরতদের কারখানাভেদে বেতনকাঠামো ভিন্ন রয়েছে। তবে দীর্ঘদিনে এ ধরনের পরিস্থিতিতে তারা পড়েননি।

গাজীপুরে চাকরির দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের ফের বিক্ষোভ : গতকাল সকাল সাড়ে ৮টার দিকে গাজীপুর মহানগরীর ভোগড়া বাইপাস, ছয়দানা, হাজীর পুকুর, মালেকের বাড়ি, সাইনবোর্ড এলাকায় ইস্ট ওয়েস্ট ও প্রীতি গার্মেন্টসসহ বেশ কয়েকটি গার্মেন্টসের চাকরিচ্যুত শ্রমিকরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করেন। খবর পেয়ে শিল্প-পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে শ্রমিকরা পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এতে শিল্প-পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার মোশারফ হোসেনসহ পাঁচজন আহত হন। পরে সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

টঙ্গীতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন চাকরিপ্রত্যাশী একদল নারী-পুরুষ। গতকাল সকাল সাড়ে ৯টা থেকে তারা টঙ্গীর সাতাইশ এলাকায় বিক্ষোভ করেন। একপর্যায়ে সড়কসংলগ্ন দুটি পোশাক কারখানায় ভাঙচুরের চেষ্টাও চালান। এতে ঘণ্টাখানেকের জন্য মহাসড়কে যানচলাচল বন্ধ থাকে।

২০ দফা দাবিতে শ্রমিক বিক্ষোভ : ভারতীয় কর্মকর্তাদের প্রত্যাহার, সরকার ঘোষিত নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী বেতন বৃদ্ধি, যথাসময়ে বেতন প্রদানসহ ২০ দফা দাবিতে কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ করেছেন কোমলপানীয় তৈরি প্রতিষ্ঠান ট্রান্সকম বেভারেজ লিমিটেডের শ্রমিকরা। সকালে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার মৌচাক এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের সামনে ওই প্রতিষ্ঠানের মূল ফটকে এ কর্মসূচি পালন করেন।

সাভার-আশুলিয়ায় যৌথ অভিযান শুরু : শিল্পাঞ্চল সাভার-আশুলিয়ায় শ্রমিক অসন্তোষ ও অস্থিরতা ঠেকাতে যৌথ অভিযান শুরু করেছে সেনাবাহিনী ও পুলিশ। তবে গতকাল দুপুর পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি এবং কোনো শ্রমিক অসন্তোষেরও খবর পাওয়া যায়নি। বেশ কয়েকটি কারখানায় আবার কাজ শুরু হয়েছে এবং কিছু কারখানা নতুন করে বন্ধ ঘোষণা করায় শ্রমিকরা এলেও আবার বাড়ি ফিরে যান।

সরেজমিনে আশুলিয়ার শিমুলতলা এলাকার দি ড্রেস অ্যান্ড দি আইডিয়াস পোশাক কারখানার ফটকে বন্ধের নোটিস টানানো দেখা গেছে। তবে সকাল থেকেই কারখানাটি খুলে দেওয়ার দাবিতে অর্ধশতাধিক শ্রমিক কারখানার মূল ফটক ও বিপরীত পাশে একটি বিপণিবিতানের সামনে অবস্থান নেন। এ ছাড়া ওই এলাকায় নাবা নিট কম্পোজিট লিমিটেড কারখানাটিও বন্ধ রয়েছে।

এর আগে সকাল ৮টার দিকে একদল শ্রমিক আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় একটি কারখানার সামনে জড়ো হওয়ার চেষ্টা করেন। সে সময় সেনাবাহিনীর একটি টহল দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে সড়ক ছেড়ে দিতে বলে। পরে জনভোগান্তি সৃষ্টি না করে কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেওয়ার পাশাপাশি শ্রমিকদের সড়কে অবস্থান না করা এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি হয়Ñ এমন কোনো কাজ না করতে অনুরোধ করে।

আশুলিয়ায় শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারোয়ার আলম বলেন, সাভার-আশুলিয়ায় প্রায় সব কারখানার পরিস্থিতি স্বাভাবিক। শ্রমিকরা নির্দিষ্ট সময়ে কাজে যোগ দিয়েছেন। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।

প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়েছেন গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়া প্রতিনিধি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত