যে অনুদান নির্ধারিত ছিল অসহায়-প্রতিবন্ধীদের জন্য, সেই অনুদান দেওয়া হয়েছে নিজের পছন্দের সচ্ছল-বিত্তবান ঘনিষ্ঠ অনুসারীদের। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী মো. মহিববুর রহমানের বিরুদ্ধে ‘স্বেচ্ছাধীন তহবিল’ নিয়ে স্বেচ্ছাচারের এমন অভিযোগ উঠেছে।
সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী একাদশ এবং দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে দুই মেয়াদে পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী) আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) হয়েছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রথমবার এমপি থাকাকালে এবং দ্বিতীয়বার প্রতিমন্ত্রী
থাকাকালে তার স্বেচ্ছাধীন তহবিলের বরাদ্দের অনুদান দিয়েছেন নিজ নির্বাচনী এলাকার পছন্দের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী এবং অনুসারীদের। এই দুই মেয়াদে এক পরিবারের সদস্যদের একাধিকবারও ওই তহবিলের অনুদান দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সেবা অধিশাখার ২০১৯ সালের ২২ আগস্টের এক চিঠিতে বলা হয়েছে, নিঃস্ব ও শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার জন্য এই স্বেচ্ছাধীন তহবিল। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই তহবিলের অর্থ অনুদান পেয়েছেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী মহিবের আস্থাভাজন দলীয় নেতাকর্মীরা। অনুদানের তালিকায় দুস্থ-অসহায় কিংবা প্রতিবন্ধীদের নাম জায়গা পায়নি বলে অভিযোগ ‘সুবিধাবঞ্চিত’ মানুষদের।
এমনই একজন ‘সুবিধাবঞ্চিত’ শারীরিক প্রতিবন্ধী জাকির হোসেন (৫০)। ভিক্ষাবৃত্তি করে চলে তার জীবন-জীবিকা। রাঙ্গাবালী উপজেলার ছোটবাইশদিয়া ইউনিয়নের গহিনখালী আশ্রয়কেন্দ্রের নিচে স্ত্রীসহ অস্থায়ীভাবে বসবাস করেন। প্রতিবন্ধী হিসেবে এমপি-প্রতিমন্ত্রীর স্বেচ্ছাধীন তহবিলের কোনো টাকা পেয়েছেন কি না জানতে চাইলে জাকির হোসেন বলেন, ‘আমরা এসব টাকাপয়সা পাই না। এসব টাকা পান বড় লোকরা।’ তাহলে মহিবের স্বেচ্ছাধীন তহবিলের অর্থ পেয়েছেন কারা? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ২০২৪ সালের ৯ জুন স্বাক্ষরিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সেবা অধিশাখার একটি বরাদ্দের সরকারি মঞ্জুরি চিঠি হাতে আসে এই প্রতিবেদকের। ওই চিঠি থেকে জানা যায়, প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বকালে মহিব তার স্বেচ্ছাধীন তহবিল থেকে নিজ নির্বাচনী এলাকা কলাপাড়া ও রাঙ্গাবালীর ১২৩ জন ব্যক্তির অনুকূলে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা অনুদান দিয়েছেন। তারা কেউ প্রতিবন্ধী-অসহায়, কেউ বন্যাদুর্গত এবং কেউ আবার নদীভাঙনকবলিত এলাকার মানুষ হিসেবে এই অনুদান পেয়েছেন বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেওয়া এই বরাদ্দের তালিকা ঘেঁটে দেখা যায়, সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী তার রাজনৈতিক অনুসারী, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এবং ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সাংবাদিকের নামে এই অনুদান দিয়েছেন। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই সচ্ছল, বিত্তবান ও সম্পদশালী। প্রত্যেকে এই তহবিল থেকে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা করে অনুদান পেয়েছেন। এ বিষয়টি নিয়ে ফেসবুকে নানা আলোচনা-সমালোচনা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে, স্বেচ্ছাধীন তহবিলের ওই তালিকায় রাঙ্গাবালী উপজেলার ১৩টি নাম খুঁজে পাওয়া গেছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠনের নেতা, তাদের পরিবারের সদস্য ও চারজন সাংবাদিকের নামও রয়েছে। তালিকায় নাম থাকা এই সাংবাদিকরা সাবেক প্রতিমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত। নিঃস্ব, অসহায় ও প্রতিবন্ধীদের নামের বদলে সচ্ছল-বিত্তবান হয়েও প্রতিমন্ত্রীর স্বেচ্ছাধীন তহবিলের অনুদান পাওয়া কয়েকজনের রাজনৈতিক পরিচয় জানা গেছে। তারা হলেন উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগ সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম, সদ্য অপসারণ হওয়া উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ফেরদৌসী পারভীনের ছেলে রাঙ্গাবালী সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সাকিবুল হাসান সৌরভ, তার বড় বোন রোমানা মান্না, উপজেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি মাহমুদ হাসান টিটু, উপজেলা শ্রমিক লীগ সভাপতি রওশন আহম্মেদ মৃধার স্ত্রী আঁখিমণি, ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় উপ-গণশিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক অহিদুল ইসলাম এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যাবিষয়ক সম্পাদক দিলীপ কুমার দাস। সচ্ছল হয়েও অসহায়-প্রতিবন্ধীদের জন্য বরাদ্দ সরকারি টাকা গ্রহণের বিষয়ে জানতে চাইলে দিলীপ কুমার দাস বলেন, ‘আমাকে এ বিষয় অবগত না করে কামরুজ্জামান শিবলী (রাঙ্গাবালীর ছোটবাইশদিয়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক) নামটা দিয়েছে। টাকা পেয়েই আমি সেই টাকা গরিব-দুস্থদের দিয়ে দিয়েছি। এভাবে নাম দিয়ে আমাকে সামাজিকভাবে ছোট করা ঠিক হয়নি।’
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, শুধু প্রতিমন্ত্রী থাকা অবস্থাতেই নয়, প্রথমবার এমপি হয়েও মহিববুর রহমান স্বেচ্ছাধীন তহবিলের বরাদ্দ নিয়ে নয়ছয় করেছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একই পরিবারের সদস্যরাও ঘুরে-ফিরে এই বরাদ্দ পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগেরই অসচ্ছল নেতাকর্মীদের ভাষ্য, এই বরাদ্দ শুধু মহিববুর রহমানের পছন্দের লোকজনের জন্য ছিল। তার বিরুদ্ধে এমন স্বেচ্ছাচারের আরও অভিযোগ রয়েছে। টিআর-কাবিখা থেকে শুরু করে সবকিছুই ছিল মহিববুর রহমানের সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে।
এ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, ‘স্বেচ্ছাধীন তহবিলের অনুদানের তালিকা সাবেক প্রতিমন্ত্রী মহিববুর রহমান নিজেই করেছেন। বিতরণের দায়িত্ব আমাদের। আমরা শুধু বিতরণ করেছি। গত ২ জুলাই তার উপস্থিতিতে অনুদানের টাকা তালিকা অনুযায়ী সবার মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। প্রতিবছর একবার এই বরাদ্দ দেওয়া হয়।’
এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে মো. মহিববুর রহমানের মোবাইল ফোনে কল করলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।
