বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ‘নিষ্ঠুরতার’ বিচারের জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়াকে (পিটিআই) এক সাক্ষাৎকারে ড. ইউনূস বলেছেন, বাংলাদেশ (সরকার) ফেরত চাইবার আগ পর্যন্ত যদি ভারত তাকে রাখতে চায়, তাহলে তাকে চুপ থাকতে হবে।
গত রবিবার ঢাকায় প্রধান উপদেষ্টার সরকারি বাসভবনে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারটি গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হয়েছে। সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, তাকে (শেখ হাসিনা) ফিরিয়ে আনতে হবে। না হলে বাংলাদেশের মানুষের শান্তি হবে না। যে নৃশংসতা তিনি দেখিয়েছেন, তার সমাধান বিচারের মাধ্যমেই হতে হবে।
ভারতে থেকে শেখ হাসিনার করা বিভিন্ন রাজনৈতিক মন্তব্যের সমালোচনাও করেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘এটি অবন্ধুসুলভ আচরণ, যা দুই দেশেই অস্বস্তি তৈরি করছে। ভারতে তার অবস্থান নিয়ে কেউ স্বস্তিতে নেই।
বিচারের জন্য তাকে আমরা ফিরিয়ে আনতে চাই। তিনি ভারতে আছেন এবং মাঝে-মধ্যেই কথা বলছেন। এটি সমস্যাজনক। তিনি যদি চুপ থাকতেন, তাহলে আমরা তা ভুলে যেতাম। তিনি নিজের জগৎ নিয়ে থাকলে মানুষও তা ভুলে যেত। কিন্তু তিনি ভারতে বসে কথা বলে যাচ্ছেন এবং নির্দেশনা দিচ্ছেন। এটা কেউ পছন্দ করছে না।’
গত মাসে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করা অধ্যাপক ইউনূস পিটিআইকে বলেছেন, বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়। তবে দিল্লিকে ‘আওয়ামী লীগ ছাড়া সব রাজনৈতিক দলকেই ইসলামপন্থি হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা’ এবং ‘শেখ হাসিনা ছাড়া দেশটি আফগানিস্তানে পরিণত হবে’ এমন ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
ড. ইউনূস বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা নিয়েও কথা বলেছেন। হাসিনা সরকারের পতনের পর সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর ও উপাসনালয়ে হামলার বিষয় নিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম যেভাবে সংবাদ প্রচার করেছে, তাকে ‘অতিরিক্ত’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন তিনি। ইউনূস বলেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা সাম্প্রদায়িক থেকে বেশি রাজনৈতিক। কারণ বেশিরভাগ হিন্দু ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ শাসনকে সমর্থন করেছিল। তাই আমি বলব, রাজনৈতিক অভ্যুত্থানের ফলে এটির সৃষ্টি হয়েছে। এখানে সাম্প্রদায়িকের কোনো বিষয় জড়িত নেই।
পিটিআইয়ের সাক্ষাৎকারের সূত্র ধরে দ্য হিন্দু এক প্রতিবেদনে বলেছে, দায়িত্ব নেওয়ার পর ইউনূস এখন পর্যন্ত একবার ফোন করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে। সে সময় হিন্দুদের ওপর হামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন মোদি। তখন ইউনূস জানিয়েছিলেন, হিন্দু এবং অন্যান্য সমস্ত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেবে ঢাকা। সে বিষয়টি উল্লেখ করে সাক্ষাৎকারে ইউনূস বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বলেছি এটা অতিরঞ্জিত। এই ইস্যুটির বিভিন্ন মাত্রা রয়েছে। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের নৃশংসতার পর দেশ যখন অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যায়, তখন যারা তাদের সঙ্গে ছিল তারাও হামলার সম্মুখীন হয়েছেন।’
ড. ইউনূসের ভাষ্য, শেখ হাসিনা ভারতের সামনে একটি বিশেষ ‘আখ্যান’ তৈরি করেছিলেন। সেই আখ্যান থেকে এখনো বের হতে পারেনি ভারত। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যেতে গেলে, ভারতকে সেই আখ্যানের মোহ ছেড়ে বের হতে হবে। তিনি বলেন, আগামীর পথ হলো এই আখ্যান থেকে ভারতের বেরিয়ে আসা। আখ্যানটি হলো সবাই ইসলামপন্থি। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি ইসলামপন্থি এবং বাকি সবাই ইসলামপন্থি। তারা এই দেশকে আফগানিস্তানে পরিণত করবে। আর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ নিরাপদ হাতে থাকবে। এই আখ্যানে ভারত এখনো বিমোহিত। ভারতকে এই আখ্যান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অন্যান্য দেশের মতো, বাংলাদেশও ভারতের আরেকটি প্রতিবেশী। এটা তাদের বুঝতে হবে। শুধু হাসিনাকে ধরে বসে থাকলে চলবে না।
