নির্ভয়ে হাতে হাত মুখে বিজয়ের মন্ত্র

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৭:৩২ এএম

৫ আগস্ট থেকে ৫ সেপ্টেম্বর। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের এক মাস। একেবারেই ভিন্নরকম আবহ। সহস্রাধিক প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত নতুন স্বাধীনতার মাসপূর্তি। হাতে হাত রেখে যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা সংস্কার ও সরকার পতন আন্দোলনের বীজ বপন হয়েছিল, সে বিশ্ববিদ্যালয়েই আবারও ঝড় ওঠে সেøাগানের। তবে সেটি এবার বিজয়ের সেøাগান।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করে ভারতে চলে যান বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের টানা প্রায় সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। ৫ আগস্টের ওই ঘটনার তিন দিন পর শপথগ্রহণের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার।

গতকাল বৃহস্পতিবার মাসপূর্তি হওয়া ছাত্র-জনতার সেই বিজয় শিক্ষার্থীরা উদযাপন করেছেন ভিন্ন আঙ্গিকে। নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের, শহীদদের রক্ত বৃথা যেতে না দেওয়ার সেøাগানে উদ্দীপ্ত হয়ে। শিক্ষার্থীরা যার নাম দিয়েছেন ‘শহীদি মার্চ’। আন্দোলনের দিনগুলোর মতো এদিনও ছাত্র-জনতা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, কারিগরি, মাদ্রাসা ও স্কুলের শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণ করেন এই মিছিলে। তাদের বেশিরভাগের হাতে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা দেখা গেছে।

মার্চে অংশ নেওয়া সবার মুখেই ছিল নতুন বাংলাদেশের জয়গান। ব্যানার, ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ডে ছিল নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা। তাদের মূল সেøাগান ছিল ‘আমাদের শহীদেরা, আমাদের শক্তি’, ‘আবু সাঈদ-মুগ্ধ, শেষ হয়নি যুদ্ধ’ ইত্যাদি। মিছিলের মাঝে মাঝে শেখ হাসিনার বিচার চেয়েও সেøাগান দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। শেখ হাসিনা সরকারের গণহত্যায় শহীদদের পাশাপাশি ফিলিস্তিনের শহীদদেরও স্মরণ করেছেন ছাত্র-জনতা। শিক্ষার্থীদের সারির মাঝখানে বাংলাদেশ ও ফিলিস্তিনের বড় পতাকা স্থান করে নিয়েছে। ‘শহীদদের হত্যার বিচার চাই’, ‘আত্মকর্মসংস্থানমূলক শিক্ষাব্যবস্থা চাই’সহ নতুন সরকারের কাছে বিভিন্ন প্রত্যাশাও জানিয়েছেন কেউ কেউ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী নুর হোসাইন সাজ্জাদ বিজয়ের এক মাসকে মূল্যায়ন করেছেন ঠিক এভাবে ‘স্বৈরাচার হাসিনার পালানোর এক মাস। দেশে গণতন্ত্র ফেরার এক মাস। নির্বিচারে মানুষ হত্যা-গুম-লুটপাট বন্ধের এক মাস। টাকা পাচার বন্ধের এক মাস। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে হলে নির্যাতন বন্ধের এক মাস। নির্ভয়ে কথা বলার এক মাস। একতার-ঐক্যের এক মাস। প্রতিবাদ-প্রতিরোধের এক মাস। এই বাংলাদেশ আমার, কারও বাপের না চিৎকার করে বলার এক মাস।’

শুধু সাজ্জাদ নন, ‘শহীদি মার্চে’ অংশ নেওয়া প্রায় সবারই অনুভূতি ছিল এমনিই। তারা বলছেন, হাজারো ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা পেয়েছেন। বিদায় করেছেন স্বৈরাচারী শেখ হাসিনাকে। যে হাসিনা মানুষের মুখ বন্ধ করে রেখেছিলেন, আমাদের অধিকার ক্ষুণœ করেছিলেন, নির্বিচারে জেল-জুলুম, গুম-খুন করেছিলেন, ফ্যাসিবাদের পতনের মাধ্যমে হাসিনা সরকারের সেই দুঃশাসনের অবসান ঘটে নতুন সূর্যের উদয় হয়েছে।

ছাত্র-জনতাকে নির্বিচারে হত্যার জন্য দায়ী শেখ হাসিনাকে অবিলম্বে দেশে ফিরিয়ে এনে ফাঁসির দাবি জানান তারা।

‘শহীদি মার্চে’ অংশ নেন সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. সাদিক হোসেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সবচেয়ে বড় ছিল। আমরা এখন নির্ভয়ে কথা বলতে পারছি। গুম, খুনের কোনো ভয় নেই। যাদের জন্য এই মতপ্রকাশ করতে পারছি, তাদের স্মরণে এখানে এসেছি। আমরা তাদের কখনোই ভুলব না। আর যাতে এই স্বাধীনতা না হারায় সেজন্য আমরা সজাগ থাকব।’

জামেয়া মাদানিয়া বারিধারা মাদ্রাসার শিক্ষার্থী শহীদুল্লাহ মাহমুদ বলেন, ‘শেখ হাসিনার বিচার করা হোক। যারা এই আন্দোলনে শহীদ হয়েছেন, তাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হোক। নতুন এই বাংলাদেশে আমরা আর কোনো বৈষম্য চাই না। সবার সমান অধিকার নিশ্চিত হোক।’

মিছিলে যোগ দেওয়া ছাত্র-জনতা বলছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকারকে ইতিমধ্যে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। সরকারকে আইনি জটিলতায় ফেলতে ১০ আগস্ট নীরবে ফুলকোর্ট সভা ডাকেন তখনকার প্রধান বিচারপতি। তবে শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পদত্যাগ করেন তিনিসহ ৫ বিচারপতি। ১৫ আগস্ট প্রতি বিপ্লবের হুঁশিয়ারিও রুখে দেন শিক্ষার্থীরা। আর সর্বশেষ ২৫ আগস্ট চাকরি সরকারি করার দাবিতে অবস্থান কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান আনসার বাহিনীর সদস্যরা। এতে এক সমন্বয়কসহ আহত হন অনেক শিক্ষার্থী। এই বাস্তবতায় রাষ্ট্রকাঠামো ঢেলে সাজানোর কোনো বিকল্প দেখছেন না ছাত্র-জনতা। যৌক্তিক সংস্কারের জন্য সরকারকে যৌক্তিক সময় দেওয়ার মত তাদের।

বন্ধুদের সঙ্গে ‘শহীদি মার্চে’ অংশ নেওয়া ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী রাকিব হোসেন বলেন, ‘আজকে স্বাধীনতার এক মাস হয়ে গেলেও ভারতে বসে শেখ হাসিনা আমাদের দেশকে অস্থিতিশীল করতে পাঁয়তারা করে যাচ্ছে। ভারতও আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। আমরা ভারতকে হুঁশিয়ারি করে দিয়ে বলতে চাই, আপনারা যদি আমাদের দেশের আরেকজন মানুষ হত্যা করেন, ছাত্র-জনতা আপনাদের হিসাব নেবে।’

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাফসান আহমেদ বলেন, ‘আমরা আজ বিজয়ের মিছিলে অংশ নিলেও আমাদের বিজয়ের পূর্ণতা পাইনি। আমাদের যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। এখনো নানা ষড়যন্ত্র চলমান। রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য এ সরকার দায়িত্ব নিলেও সেটি পালন করতে নানাভাবে বাধা দেওয়া হচ্ছে। আমরা শিক্ষার্থীরা বলতে চাই, এ সরকারকে সংস্কারের জন্য যৌক্তিক সময় দিতে হবে, আমরা সরকারের পাশে আছি।’

নতুন সরকারের কাছে দাবি কী জানতে চাইলে ঢাকা সিটি কলেজের শিক্ষার্থী ফারিয়া তাবাসসুম বলেন, ‘আমরা ২৪-এর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা চাই, আহত এবং অঙ্গহানি হওয়া সবার রাষ্ট্রীয়ভাবে চিকিৎসা চাই এবং আজীবনের জন্য তাদের ভাতা দিতে হবে। এ ছাড়া ভারতীয় “র”মুক্ত বাংলাদেশ চাই, সীমান্তে হত্যা বন্ধ চাই এবং ৫৪টি নদীর পানি চাই। খুনি হাসিনাসহ হত্যায় জড়িতদের দ্রুত সময়ের মধ্যে বিচার চাই।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আহমেদ হোসেন বলেন, ‘বিগত ১৬ বছরে দলের সংবিধানকে দেশের “সংবিধান” হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আওয়ামী লীগ একটি “ধর্মে” পরিণত হয়েছিল। সবকিছুকে আওয়ামীকরণ করা হয়েছিল। এখন এর থেকে বের হওয়ার জন্য সবাইকে এক হতে হবে। আর কখনো ফ্যাসিজম যেন ফিরতে না পারে, সেজন্য সবাইকে এক হতে হবে। এটা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ।’

সমন্বয়ক আবদুল কাদের দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশকে “স্বাধীন” করার জন্য এই আন্দোলনে আমাদের ভাইয়েরা শহীদ হয়েছেন। দেশে কোনো বৈষম্য থাকবে না, এমন স্বপ্ন নিয়ে, এমন প্রত্যাশা নিয়ে আমাদের ভাইয়েরা নিজের বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছেন। হত্যাকা-ের সঙ্গে যারা জড়িত ছিল, তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। আমরা আমাদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করিনি। আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। দেশকে পুনর্গঠনের যে লড়াই, সেটি আমাদের চালিয়ে যেতে হবে।’

বিজয় মিছিল না করে ‘শহীদি মার্চের’ সিদ্ধান্ত কেন জানতে চাইলে আরেক সমন্বয়ক সারজিস আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রক্তের দাগ এখনো শুকায়নি। এখনো আমাদের ভাইয়েরা ক্ষত চিহ্ন নিয়ে কাতরাচ্ছেন। অনেকে আমাদের বিজয় মিছিল করতে বলছেন। কিন্তু যত দিন না নতুন বাংলাদেশ হচ্ছে, মানুষ অধিকার পাচ্ছেন, তত দিন বিজয় মিছিল করা সম্ভব নয়।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত