শেষ পর্যন্ত বিতর্কের বোঝা মাথায় নিয়ে বিদায় নিতে হয়েছে আউয়াল কমিশনকে। গত আড়াই বছরে জাতীয় সংসদ, স্থানীয় সরকারসহ দেড় হাজার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব নির্বাচনে কারচুপি এবং বর্জনের ঘটনা ঘটেছে। বেশি বিতর্ক হয়েছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে। নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থা না থাকায় বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল এ নির্বাচনে অংশ নেয়নি।
একদলীয় ডামি ভোটের আয়োজন আর বিতর্কিত মন্তব্য করে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে কমিশনকে। যদিও বিদায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দাবি, নির্বাচন স্থগিত বা বাতিল করার মতো সাংবিধানিক এখতিয়ার কমিশনের ছিল না।
২০২২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি নিয়োগ পায় কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন। কমিশনের অন্য সদস্যরা হলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. আহসান হাবিব খান, বেগম রাশেদা সুলতানা, মো. আলমগীর ও মো. আনিছুর রহমান। সদ্য ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এ কমিশনকে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। ৮ আগস্ট ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হয়। এরপর পদত্যাগ শুরু হয় সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরে। নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগের দাবিও ওঠে। পদত্যাগ না করলে অপসারণ করা হতে পারে সেটি, টের পেয়েই সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন।
মেয়াদ শেষের আগে বিদায় নিয়েছে যেসব কমিশন : আড়াই বছর বাকি থাকতেই বিদায় নিতে হয়েছে হাবিবুল আউয়াল কমিশনকে। তবে এটাই প্রথম নয়। এর আগেও বেশ কয়েকটি নির্বাচন কমিশনকে বিতর্কের মুখে নির্দিষ্ট সময় শেষ হওয়ার আগেই বিদায় নিতে হয়েছে। যেমন : বিচারপতি সুলতান হোসেন খান কমিশন (এক বছর), বিচারপতি এ কে এম সাদেক কমিশন (এক বছর) এবং বিচারপতি এমএ আজিজ কমিশন (দেড় বছর)। এ ছাড়া বিচারপতি মো. আবদুর রউফ ও মোহাম্মদ আবু হেনা কমিশনও একতরফা ডামি ভোটের বিতর্ক : নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ভোট বর্জন করে। বিদেশিদের চাপ, নাশকতায় প্রাণহানি, প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘাতের মধ্যে ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়। অধিকাংশ আসনে তেমন প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি। ছিল না ভোটার উপস্থিতি। তবু নির্বাচন কমিশনের হিসাবে ভোট পড়ার হার ছিল ৪১ দশমিক ৮০ শতাংশ। এটা নিয়েও প্রশ্ন আছে। ভোটে হেরে যাওয়া আওয়ামী লীগের ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অনেকে নিজ নিজ আসনে জাল ভোট এবং শেষবেলায় প্রকাশ্যে ব্যালটে সিল মারার অভিযোগ এনেছেন। একই অভিযোগ আওয়ামী লীগের জোটের শরিক ও মিত্র দলের নেতারাও করেছেন।
বিতর্কিত ছিল ষষ্ঠ উপজেলা নির্বাচন : ভোটার খরা-অনিয়মের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয় ষষ্ঠ উপজেলা নির্বাচন। বিরোধী দলের অনুপস্থিতির মধ্যেও কেন্দ্রে জাল ভোট প্রদান, ব্যালটে প্রকাশ্যে সিল মারা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছিল। ভোট পড়ার হার নিয়ে নানা কথা বলে কমিশনও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বিতর্কিত মন্তব্যে কমিশন সমালোচিত : নির্বাচন নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এসব মন্তব্যে সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন স্বয়ং প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল। তিনি বলেন, লেজিটিমেসির ব্যাপারটা ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু আইনত নির্বাচন সঠিক। লেজিটিমেসি নিয়ে ইসি মাথা ঘামাবে না।
তলোয়ার-রাইফেল বিতর্ক : ববি হাজ্জাজের দল এনডিএমের সঙ্গে সংলাপে বসে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল মন্তব্য করেন, ‘আপনাদের সমন্বিত প্রয়াস থাকবে, কেউ যদি তলোয়ার নিয়ে দাঁড়ায়, আপনাকে রাইফেল বা আরেকটি তলোয়ার নিয়ে দাঁড়াতে হবে। আপনি যদি দৌড় দেন, তাহলে আমি কী করব?’ এ বক্তব্য ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’তে পরিণত হয়। সমালোচনার মুখে সিইসি দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হন।
বাহাউদ্দিনের ‘বুড়ো আঙুল’ : কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য আ ফ ম বাহাউদ্দিনকে কুসিক নির্বাচনী এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেয় নির্বাচন কমিশন। কিন্তু তিনি বুড়ো আঙুল দেখান নির্বাচন কমিশনকে। তিনি ইসির নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে যান। একজন এমপিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না ইসি, ৩০০ এমপিকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে এ প্রশ্ন উঠলে পুরো ইউটার্ন নেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) হাবিবুল আউয়াল। তিনি বলেন, বাহাউদ্দিনকে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেননি, তাকে অনুরোধ করেছেন। ভোটের এলাকায় কারও বাড়ি হলে তার বাড়িতে থাকতে বাধা নেই।
তিনি কি ইন্তেকাল করেছেন : বরিশাল সিটি নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মনোনীত মেয়র পদপ্রার্থী মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীমের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, ‘রক্তাক্ত নয়, হাতপাখার প্রার্থীকে পেছন থেকে ঘুসি মারা হয়েছে। পরে তিনি সাংবাদিকদের পাল্টা প্রশ্ন করেন, হাতপাখার প্রার্থী কি ইন্তেকাল করেছেন? এমন মন্তব্যে বেশ সমালোচনা হয়। ইসলামী আন্দোলন নির্বাচন কমিশন ঘেরাওয়ের কর্মসূচি দেয়। পরে সিইসি এজন্য দুঃখ প্রকাশ করেন।
বিদায়ী ভাষণে কী বলেছেন হাবিবুল আউয়াল : সংবাদ সম্মেলনে পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার আগে কাজী হাবিবুল আউয়াল বাংলাদেশের বিগত নির্বাচনগুলোর ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, দেশের প্রথম সাংবিধানিক সাধারণ নির্বাচন ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই নির্বাচন নিয়েও বিতর্ক ছিল। ১৯৭৯ ও ১৯৮৭ সালের সাধারণ নির্বাচন সামরিক শাসনামলে হয়েছে। ফলাফল নিয়ে বিতর্ক ছিল। ১৯৯১-এর নির্বাচন সম্মত রাজনৈতিক রূপরেখার ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হয়েছিল। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচন সাংবিধানিক নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে, সূক্ষ্ম বা স্থূল কারচুপির অভিযোগ সত্ত্বেও সার্বিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচন সেনাসমর্থিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হয়েছে। সেই নির্বাচনে বিএনপি সংসদে মাত্র ২৭টি এবং আওয়ামী লীগ ২৩০টি আসন পেয়েছিল। নির্বাচন বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল না। নিরাপদ প্রস্থানের বিষয়ে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে সেনাসমর্থিত অসামরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দর-কষাকষির বিষয়টি প্রকাশ্যই ছিল। এ বিষয়ে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ কিছু গোপনও করেনি। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন সংবিধানমতে দলীয় সরকারের অধীনে হয়েছে।
হাবিবুল আউয়াল বলেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপিসহ অনেক দলই অংশগ্রহণ করেনি। ফলে সে নির্বাচনও ২০২৪ সালের মতো ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক ছিল না। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করে। আসন পেয়েছিল মাত্র ছয়টি। আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ২৫৮টি। মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে বর্তমান কমিশনের অধীনে। নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়নি। কমিশন বিএনপিসহ সমমনা দলগুলোকে নির্বাচনে আনতে পারেনি। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা না করার বিষয়টি দলের নিজস্ব সিদ্ধান্তের বিষয়।
নির্বাচন স্থগিত বা বাতিল করার মতো সাংবিধানিক এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের ছিল না মন্তব্য করে বিদায়ী সিইসি বলেন, সে কারণে অনেকেই কমিশনকে দোষারোপ করেছেন। অতীতে কখনোই কোনো কমিশন নির্বাচন বাতিল করে দিয়ে পদত্যাগ করেননি। সম্প্রতি ভেঙে দেওয়া সংসদের ২৯৯টি আসনে প্রার্থীদের মধ্যে ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতা হয়েছে। দলের মধ্যে নয়।
হাবিবুল আউয়াল বলেন, নির্বাচন গ্রহণযোগ্য না হওয়ার সব দোষ বা দায় নির্বাচন কমিশনের ওপর এককভাবে আরোপ করা হয়ে থাকে। একটি কমিশন না হয় অসৎ বা পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে। কিন্তু সব সময় সব কমিশন অসৎ বা পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে না। কমিশন বিভিন্ন কারণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে অক্ষম বা অসমর্থ হতে পারে।
বিদ্যমান ব্যবস্থায়, আমাদের বিশ্বাস, শুধু কমিশনের পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে অবাধ, নিরপেক্ষ, কালো টাকা ও পেশিশক্তি-বিবর্জিত এবং প্রশাসন-পুলিশের প্রভাবমুক্ত নির্বাচন নিশ্চিত করা যাবে না। নির্বাচন পদ্ধতিতে মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন হবে। রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও আচরণে বিশেষত প্রার্থীদের আচরণে পরিবর্তন প্রয়োজন হবে।
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে তিনি বলেন, নির্বাচন মূলত একদলীয় হওয়ার কারণে কারচুপি বা সরকারিভাবে প্রভাবিত করার প্রয়োজনও ছিল না। নির্বাচন দলের ভেতরেই হয়েছে, মধ্যে হয়নি। উইদিন হয়েছে, নট বিটুইন।
বিদায়ী সিইসি বলেন, পদত্যাগের এটিই সঠিক ও যৌক্তিক সময়। বাংলাদেশের ৫৩ বছরের ইতিহাসে কোনো নির্বাচন কমিশন সংবিধান উপেক্ষা করে স্বেচ্ছায় নির্বাচন বাতিল করে দিয়ে পদত্যাগ করেছে এমন উদাহরণ নেই। সরকার বারবার বলছে, ব্যাপক সংস্কারের মাধ্যমে নির্বাচনীব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। নির্বাচন বারবার ব্যর্থ হওয়ার প্রকৃত সত্য ও কারণ এ কথার মধ্যেই নিহিত।
