ছাত্রলীগের পঙ্গু সাবেক নেতাকে পিটিয়ে হত্যা

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৬:৫৭ এএম

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ও বিশ্ববিদ্যালয়টির মেডিকেল সেন্টারের কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মাসুদকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। গত শনিবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন বিনোদপুর বাজারে তার ওপর হামলা হয়। পরে তাকে গুরুতর অবস্থায় থানায় নেওয়া হয়। সেখান থেকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে রাত সাড়ে ১২টার দিকে তিনি মারা যান।

নিহত আবদুল্লাহ আল মাসুদ রাজশাহী বিম্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সহসম্পাদক ও কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সদস্য। তিনি নগরীর বুধপাড়ার বাসিন্দা ছিলেন। ২০১৪ সালের ২৯ এপ্রিল সকালে ক্লাসে যাওয়ার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়া হলের সামনে হামলার শিকার হন মাসুদ। এ সময় তার ডান পায়ের নিচের অংশ গোড়ালি থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। বাঁ পা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কেটে দেওয়া হয়েছিল হাতের রগ।

আবদুল্লাহ আল মাসুদের ওপর হামলাকারীদের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে পুলিশ গণমাধ্যমকে বলেছে, গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ওপর হামলার অভিযোগে তার ওপর হামলা হয়। প্রথমে তাকে আহত অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের মতিহার থানায় নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে নেওয়া হয় নগরীর বোয়ালিয়া থানায়।

নগরীর বোয়ালিয়া থানার ওসি এসএম মাসুদ পারভেজ বলেন, ‘গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ওপর হামলার অভিযোগে রাতে বিনোদপুর বাজারে মাসুদের ওপর হামলা হয়। পরে একদল শিক্ষার্থী তাকে প্রথমে মতিহার থানায় নিয়ে যান। কিন্তু মতিহার থানায় ৫ আগস্টের সহিংসতার কোনো মামলা নেই। তাই তাকে বোয়ালিয়া থানায় আনা হয়, যেন তাকে কোনো সহিংসতার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।’

এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘গণপিটুনিতে গুরুতর আহত হয়েছিলেন মাসুদ। তার শারীরিক অবস্থা দেখে সেনাবাহিনীর সহায়তায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার মৃত্যু হয়। এখন পরিবার চাইলে এ ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

জানা গেছে, দীর্ঘদিন বেকার থাকার পর নিজের দুর্দশার কথা জানিয়ে একটি চাকরি চেয়ে ২০২২ সালের শেষদিকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে চিঠি লেখেন আবদুল্লাহ আল মাসুদ। এরপর ওই বছরের ৬ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক-৭ মীর তাফেয়া সিদ্দিকা রাবি উপাচার্যের কাছে পাঠানো চিঠিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকশন অফিসার পদে মাসুদকে নিয়োগ দিতে বলেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালের ২০ ডিসেম্বর তাকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে স্টোর অফিসার পদে নিয়োগ দেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ। নিয়োগপত্র পেয়ে ২২ ডিসেম্বর চাকরিতে যোগ দেন তিনি। সেই থেকে তিনি এ পদেই চাকরি করতেন।

২০১৪ সালের হামলায় পা হারিয়ে মাসুদ একটি প্লাস্টিকের পা লাগিয়ে চলাচল করতেন, তবে ভারী কোনো কাজ করতে পারতেন না। তার অন্য পা শনিবার রাতে ভেঙে দেওয়া হয়। মাসুদকে আহত অবস্থায় বোয়ালিয়া থানায় আনার পর তার কথাবার্তার একটি ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

ওই ভিডিও ক্লিপে বোয়ালিয়া থানা-হাজতে শুয়ে থাকা অবস্থায় মাসুদকে বলতে দেখা যায়, ‘আমি বিনোদপুরে ওষুধ নিতে এসেছিলাম ভাই। আমি ছাত্রলীগ করতাম ওই জন্য ধরেছে। কিন্তু আমার পা ২০১৪ সালে কেটেছে ভাই। রগটগ সব কাটা ভাই। আমি তো অনেক দিন আগে থেকেই ছাত্রলীগ করা বাদ দিয়েছি ভাই।’

এদিকে শনিবার নবজাতক শিশুর ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে মাসুদ লেখেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ। সকল প্রশংসা মহান আল্লাহতায়ালার। গত ৩ সেপ্টেম্বর কন্যাসন্তানের পিতা হয়েছি। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে নেক হায়াত ও সুস্থতা কামনা করি। সব আত্মীয়স্বজন, শুভাকাক্সক্ষী ও বন্ধুবান্ধবের কাছে আমার ও আমার মেয়ের জন্য দোয়া প্রার্থনা করছি।’

মাসুদের মৃত্যুর ঘটনায় ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও ফুটেজে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রাবির সমন্বয়ক সালাহউদ্দিন আম্মারকে দেখা যায়। মাসুদের মৃত্যুর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ধর্ষণের অভিযোগে গণপিটুনিতে আহত দুজনকে নিয়ে আমরা রাজশাহী মেডিকেল কলেজে গিয়েছিলাম। তাদের নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম। তার মধ্যেই আহত অবস্থায় একজনকে আনতে দেখলাম। কিন্তু কারা কাকে এনেছিল, তা চিনতে পারিনি। শুধু শুনলাম ছাত্রলীগের কর্মী ধরা পড়েছে, বিভিন্ন জায়গায় যেরকম ধরা পড়ছে। এরপর কেউ যাতে না মারে, সেজন্য শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে তাকে (মাসুদকে) ভেতরে ঢুকিয়ে দিই। এ ছাড়া আর কিছু জানি না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত